গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণ আছে।এগুলো আমার বিয়ের স্বর্ণ। আমি গত এক বছর আগে মনে মনে নিয়ত করেছি।আমার স্বর্ণগুলো আমি আমার আল্লাহকে দিব। আমার এই স্বর্ণগুলো আমি যতদিন দুনিয়াতে বেঁচে থাকব প্রত্যেকদিন ব্যবহার করব এমন আমি মারা যাওয়ার সাথে সাথে সদকা নিয়তে মসজিদের কোন কাজে দান করব। এবং আমি মারা গেলে যেন আমার স্বর্ণগুলো মসজিদের কাজে ব্যবহার করে সেজন্য আমার স্বামীকে দায়িত্ব দিয়েছি।
এখন আমার প্রশ্ন হল আমি দুনিয়াতে থাকা অবস্থায় যদি খুব বেশি কোন জরুরত হয় আমার বা টাকার প্রয়োজন হয় আমি কি আমার কিছু স্বর্ণ বিক্রি করতে পারবো?
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনি আপনার স্বর্ণগুলো বিক্রি করতে পারবেন। তবে এর বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।
১. প্রশ্নের সারমর্ম
আপনার কাছে সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণ আছে। এক বছর আগে আপনি মনে মনে নিয়ত করেছেন যে—
১. এই স্বর্ণগুলো আল্লাহর জন্য দেবেন; ২. জীবিত থাকাকালীন প্রতিদিন ব্যবহার করবেন; ৩. মৃত্যুর সাথে সাথে সদকা নিয়তে মসজিদের কাজে দান করবেন; ৪. মৃত্যুর পর স্বর্ণগুলো মসজিদের কাজে ব্যবহারের দায়িত্ব স্বামীকে দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন: জীবিত অবস্থায় খুব বেশি প্রয়োজন হলে বা টাকার দরকার হলে কিছু স্বর্ণ বিক্রি করা যাবে কি?
২. মূল ফিকহি বিষয়: মান্নত (নযর) ও অসিয়তের পার্থক্য
(ক) মান্নত বা নযর কী?
কোনো ব্যক্তি যদি বলে, “আমি আল্লাহর জন্য অমুক কাজ করব” বা “আমার এই সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করব”, তবে তা মান্নত (নযর) হিসেবে গণ্য হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ
“আর তারা যেন তাদের মান্নত পূর্ণ করে।”
(সূরা আল-হজ, ২২:২৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ نَذَرَ أَنْ يُطِيعَ اللَّهَ فَلْيُطِعْهُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মান্নত করে, সে যেন তাঁর আনুগত্য করে।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৯৬)
(খ) মান্নত কি সম্পদের মালিকানা বদলে দেয়?
না। শুধু মনে মনে নিয়ত করলে বা মুখে বললেও—যতক্ষণ পর্যন্ত সেই সম্পদ প্রকৃতপক্ষে দান না করা হয় বা কোনো নির্দিষ্ট খাতে ওয়াকফ না করা হয়—ততক্ষণ পর্যন্ত মালিকানা আপনারই থাকে।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
মান্নত শুধু একটি ইবাদতের দায়িত্ব সৃষ্টি করে; তা সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর করে না।
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল আয়মান ওয়ান নুযুর)
(গ) আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য
আপনি মনে মনে নিয়ত করেছেন যে মৃত্যুর পর স্বর্ণগুলো মসজিদের কাজে দান করবেন। এটি মূলত অসিয়ত (ওয়াসিয়্যাত)-এর অন্তর্ভুক্ত, কারণ আপনি মৃত্যুর সাথে সাথে তা কার্যকর হওয়ার কথা বলেছেন।
অসিয়তের বিধান:
- অসিয়ত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়।
- জীবিত অবস্থায় অসিয়তকৃত সম্পদ আপনার মালিকানাতেই থাকে।
- আপনি জীবিত থাকাকালীন তা ব্যবহার, বিক্রি বা অন্য কোনো বৈধ কাজে লাগাতে পারবেন।
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:
الوصية لا توجب الملك في الحال، بل بعد الموت
“অসিয়ত বর্তমান সময়ে মালিকানা সৃষ্টি করে না; বরং মৃত্যুর পর করে।”
(ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ওয়াসায়া)
৩. মান্নত ও অসিয়তের সংমিশ্রণে আপনার করণীয়
আপনার বক্তব্যে দুটি দিক আছে:
- জীবিত থাকাকালীন: প্রতিদিন ব্যবহার করবেন।
- মৃত্যুর পর: সদকা নিয়তে মসজিদের কাজে দান করবেন।
এতে বোঝা যায়, আপনি জীবিত থাকাকালীন স্বর্ণের মালিকানা আপনারই থাকবে এবং মৃত্যুর পর তা মসজিদের কাজে লাগানো হবে। এটি একটি অসিয়ত।
অসিয়তের সীমা
হাদিসে এসেছে:
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ، فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং উত্তরাধিকারের জন্য কোনো অসিয়ত নেই।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১২১; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮৭০)
তবে আপনি যদি গায়রে ওয়ারিস (উত্তরাধিকারী নয় এমন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান) তথা মসজিদের জন্য অসিয়ত করেন, তবে এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত বৈধ। এর বেশি করতে হলে উত্তরাধিকারীদের সম্মতি লাগবে।
রাদ্দুল মুহতার-এ আছে:
تجوز الوصية لغير الوارث في ثلث المال بلا إجازة الورثة
“উত্তরাধিকারী ছাড়া অন্যের জন্য এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত বৈধ, উত্তরাধিকারীদের অনুমতি ছাড়াই।”
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ওয়াসায়া, ৬/৬৪৯)
আপনার স্বর্ণ যদি আপনার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে পড়ে, তবে তা অসিয়ত হিসেবে কার্যকর হবে। আর যদি এক-তৃতীয়াংশের বেশি হয়, তবে উত্তরাধিকারীদের সম্মতি প্রয়োজন।
৪. জীবিত অবস্থায় স্বর্ণ বিক্রির বিধান
যেহেতু মান্নত বা অসিয়তের কারণে স্বর্ণের মালিকানা আপনার কাছ থেকেই যায়নি, তাই—
✅ আপনি জীবিত অবস্থায় প্রয়োজন হলে স্বর্ণ বিক্রি করতে পারবেন।
তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে:
(ক) যদি মান্নত স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা থাকে
যদি আপনি বলতেন, “আমি এই নির্দিষ্ট স্বর্ণগুলো এখনই আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিলাম” বা “এগুলো ওয়াকফ করলাম”—তাহলে মালিকানা চলে যেত এবং বিক্রি করা যেত না।
কিন্তু আপনি বলেছেন, “মৃত্যুর সাথে সাথে সদকা নিয়তে দান করব”—এটি ভবিষ্যতের সাথে সম্পৃক্ত, তাই এখনো মালিকানা আপনারই।
(খ) যদি মান্নত পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়
যদি আপনি মান্নত করেন যে “আমি এই স্বর্ণ মসজিদে দান করব” এবং তা শর্তহীন ও তাৎক্ষণিক হয়, তবে তা আদায় করা ওয়াজিব। সেক্ষেত্রে বিক্রি করা ঠিক হবে না।
কিন্তু আপনার বক্তব্যে “মৃত্যুর পর” শর্ত যুক্ত আছে, তাই এটি অসিয়ত হিসেবে গণ্য এবং জীবিত অবস্থায় বাধ্যতামূলক নয়।
(গ) প্রয়োজন না থাকলে বিক্রি না করাই উত্তম
যদিও বিক্রি করা জায়েজ, তবে যেহেতু আপনি আল্লাহর জন্য দান করার নিয়ত করেছেন, তাই বিনা প্রয়োজনে বিক্রি না করাই উত্তম। এতে আপনার নিয়ত ও সওয়াবের ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে।
৫. বিশেষ পরামর্শ
১. নিয়ত ও মান্নত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করুন।
ভবিষ্যতে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি এড়াতে লিখিত অসিয়ত রাখা ভালো।
২. এক-তৃতীয়াংশের হিসাব করে নিন।
আপনার মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে স্বর্ণের মূল্য পড়ে কি না, তা হিসাব করুন। প্রয়োজনে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
৩. স্বামীকে জানিয়ে দিন।
আপনি স্বামীকে দায়িত্ব দিয়েছেন—তাকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যেন মৃত্যুর পর তা সঠিকভাবে কার্যকর হয়।
৪. প্রয়োজনে বিক্রি করলে পরে তা পুনরায় আদায়ের নিয়ত করুন।
যদি জীবিত অবস্থায় স্বর্ণ বিক্রি করেন, তবে ভবিষ্যতে সামর্থ্য হলে মসজিদের কাজে দান করার নিয়ত রাখতে পারেন।
৬. সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | মনে মনে নিয়ত করলে মালিকানা যায় কি? | না | | জীবিত অবস্থায় স্বর্ণ বিক্রি করা যাবে কি? | হ্যাঁ, যাবে | | মৃত্যুর পর মসজিদে দান | অসিয়ত হিসেবে কার্যকর, এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত | | এক-তৃতীয়াংশের বেশি হলে | উত্তরাধিকারীদের সম্মতি লাগবে | | প্রয়োজন ছাড়া বিক্রি | জায়েজ, তবে উত্তম নয় |
চূড়ান্ত উত্তর: আপনি জীবিত অবস্থায় খুব বেশি প্রয়োজন হলে বা টাকার দরকার হলে আপনার স্বর্ণ বিক্রি করতে পারবেন। কারণ মান্নত বা অসিয়তের কারণে জীবিত অবস্থায় স্বর্ণের মালিকানা আপনার কাছ থেকে চলে যায়নি। তবে বিনা প্রয়োজনে বিক্রি না করাই আপনার নিয়ত ও সওয়াবের জন্য উত্তম।
৭. আরবি দলিলসহ সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
السؤال: امرأة نذرت في قلبها أن تتصدق بذهبها بعد موتها للمسجد، فهل يجوز لها بيعه في حياتها عند الحاجة؟
الجواب: نعم، يجوز لها بيعه عند الحاجة؛ لأن النذر والوصية لا ينقلان الملك في الحال، بل الملك باقٍ لها في حياتها. والوصية إنما تنفذ بعد الموت في ثلث المال.
(الهداية، كتاب الوصايا؛ رد المحتار، كتاب الوصايا، ٦/٦٤٩؛ الفتاوى الهندية، كتاب الوصايا)
উপসংহার: আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—হ্যাঁ, আপনি জীবিত অবস্থায় প্রয়োজন হলে স্বর্ণ বিক্রি করতে পারবেন। তবে উত্তম হলো বিনা প্রয়োজনে বিক্রি না করা এবং মৃত্যুর পর মসজিদের কাজে দানের নিয়ত বহাল রাখা।
والله أعلم بالصواب
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين