গুনাহগার ব্যাক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহর ফয়সালা, শাস্তি ও পরীক্ষা কীভাবে হয়?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Amra Jodi gunah Kori Allah amader shasti den porikkha nen dukkho kosto den sukh den bipod den Ami onk manush ke dekhechi amon Allah sukh dukkho den porikkha nen bipod den
Kintu ai celetar ai porjonto Kono Allah dukkho kosto dai nai bipod porikkha dai nai karo Sathe wrong korse atar bichar hoi ni shasti Pai ni Ulta unnoti hoi onk celetar
Esob khetre Allah r foysala shasti porikkha bipod sukh dukkho ta Kemon hoi amr ata Janar chilo
Answer
আল্লাহর ফয়সালা, শাস্তি ও পরীক্ষা: একটি ফিকহি ও আকিদাগত বিশ্লেষণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: প্রশ্নকারী একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, দান-সদকা করেন, মানুষের উপকার করেন, বিপদে এগিয়ে যান — কিন্তু একই সাথে হারাম সম্পর্ক, যিনা, অশ্লীল কাজে লিপ্ত, একজন মেয়েকে ব্যবহার করে ছেড়ে দিয়েছেন, তাকে বিয়ে করবেন না জেনেও তার সাথে যিনা করেছেন। তার প্রচুর টাকা, সম্পদ, রিজিক, বড়লোকি — কোনো শাস্তি বা পরীক্ষা আসছে না। অথচ সাধারণ মানুষ গুনাহ করলে আল্লাহ শাস্তি দেন, পরীক্ষা দেন, দুঃখ-কষ্ট দেন। তাহলে আল্লাহর ফয়সালা, শাস্তি ও পরীক্ষা কীভাবে হয়?
ভূমিকা: একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত বিষয়
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ইমান ও আকিদার সাথে সম্পর্কিত। এখানে কয়েকটি মূল বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন:
- আল্লাহর ফয়সালা ও শাস্তির ধরন এক নয় — দুনিয়ার শাস্তি, আখিরাতের শাস্তি, এবং পরীক্ষা — এগুলো ভিন্ন ভিন্ন বিষয়।
- দুনিয়ার সুখ-সম্পদ কখনোই আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয় — বরং অনেক সময় এটি ইস্তিদরাজ (ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া) হতে পারে।
- আল্লাহর হিকমত ও জ্ঞান অসীম — আমাদের সীমিত জ্ঞানে আমরা আল্লাহর ফয়সালার পূর্ণ হিকমত বুঝতে পারি না।
- আখিরাতের হিসাব অবশ্যই হবে — দুনিয়ায় শাস্তি না পেলেও আখিরাতে কোনো পলায়ন নেই।
১. দুনিয়ার সুখ-সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়
কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ ۚ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُم بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ
"অতএব তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাকে বিস্মিত করবে না। আল্লাহ তো চান এগুলো দিয়েই দুনিয়ার জীবনে তাদের শাস্তি দিতে এবং তাদের প্রাণ কুফরি অবস্থায় বেরিয়ে যাক।" — সূরা আত-তাওবা: ৫৫
আল্লাহ আরও বলেন:
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ ۚ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
"আর আপনি তাদের মধ্যে কতককে যে ভোগ-সামগ্রী দিয়েছি সেদিকে আপনার দৃষ্টি প্রসারিত করবেন না; এগুলো দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য মাত্র — এগুলো দ্বারা আমি তাদের পরীক্ষা করি। আর আপনার রবের রিজিকই উত্তম ও স্থায়ী।" — সূরা ত্বা-হা: ১৩১
হাদিসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيُعْطِي الدُّنْيَا مَنْ يُحِبُّ وَمَنْ لَا يُحِبُّ، وَلَا يُعْطِي الدِّينَ إِلَّا مَنْ يُحِبُّ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ দুনিয়া (সম্পদ) তাকে দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন এবং যাকে ভালোবাসেন না; কিন্তু দ্বীন (ইমান-আমল) তিনি কেবল তাকেই দেন যাকে তিনি ভালোবাসেন।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৩৪৯৭; সহীহ ইবনে হিব্বান
অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ
"দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৯৫৬
ব্যাখ্যা: এই হাদিসগুলোর অর্থ হলো — দুনিয়ার সুখ-সম্পদ, টাকা-পয়সা, বড়লোকি — এগুলো আল্লাহর ভালোবাসার প্রমাণ নয়। বরং অনেক সময় আল্লাহ বান্দাকে দুনিয়ার সম্পদ দিয়ে ভুলিয়ে রাখেন, যাতে সে আখিরাতের হিসাব ভুলে যায় এবং ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে যায়। এটাকে ইসলামি পরিভাষায় "ইস্তিদরাজ" (استدراج) বলা হয়।
২. ইস্তিদরাজ (استدراج) — ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া
কুরআনের দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُم مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُونَ وَأُمْلِي لَهُمْ ۚ إِنَّ كَيْدِي مَتِينٌ
"আর যারা আমার আয়াতগুলোকে মিথ্যা বলে, আমি তাদেরকে এমনভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাব যা তারা জানে না। আর আমি তাদেরকে অবকাশ দিই; নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত মজবুত।" — সূরা আল-আ'রাফ: ১৮২-১৮৩
আল্লাহ আরও বলেন:
فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّىٰ إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُم بَغْتَةً فَإِذَا هُم مُّبْلِسُونَ
"অতঃপর যখন তারা সেই উপদেশ ভুলে গেল যা তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল, আমি তাদের জন্য সব কিছুর দরজা খুলে দিলাম। এমনকি যখন তারা তাদের প্রাপ্ত বস্তু নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে পড়ল, আমি তাদেরকে হঠাৎ পাকড়াও করলাম। তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ল।" — সূরা আল-আনআম: ৪৪
হাদিসের দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দেন; এমনকি যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে রক্ষা করেন না।" — সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৮৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ، ثُمَّ قَرَأَ: وَكَذَٰلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَىٰ وَهِيَ ظَالِمَةٌ ۚ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দেন; এমনকি যখন তিনি তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে রক্ষা করেন না।" তারপর তিনি এই আয়াত পড়লেন: "আর এমনই আপনার রবের পাকড়াও, যখন তিনি জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন যখন তারা জালিম হয়। নিশ্চয়ই তার পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, কঠিন।" — সূরা হুদ: ১০২; সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৮৬
ব্যাখ্যা: এই আয়াত ও হাদিসগুলো স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ তা'আলা জালিম ও গুনাহগারকে সাথে সাথে শাস্তি নাও দিতে পারেন। বরং তিনি অবকাশ দেন, সম্পদ ও সুখ-সুবিধা বাড়িয়ে দেন — যাতে সে আরও গুনাহে লিপ্ত হয় এবং তার শাস্তি আরও কঠিন হয়। এটাই হলো ইস্তিদরাজ। তাই এই ব্যক্তির সম্পদ, টাকা, বড়লোকি — এগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং এগুলো তার জন্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের ফাঁদ হতে পারে।
৩. আল্লাহর শাস্তি ও পরীক্ষার বিভিন্ন ধরন
(ক) দুনিয়ার শাস্তি — সাথে সাথে বা দেরিতে
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَمَا أَصَابَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَن كَثِيرٍ
"আর তোমাদের যে কোনো বিপদ আসে তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের কারণেই; আর আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।" — সূরা আশ-শূরা: ৩০
আল্লাহ আরও বলেন:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
"মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে; যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কিছু ফল আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।" — সূরা আর-রূম: ৪১
(খ) দুনিয়ার পরীক্ষা — মুমিনের জন্য প্রায়শ্চিত্ত ও মর্যাদা বৃদ্ধি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
"মুসলিমকে যে কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা বিষণ্নতা স্পর্শ করে — এমনকি একটি কাঁটা ফুটলেও — আল্লাহ এর দ্বারা তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।" — সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৫৬৪১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৭৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন:
إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ، وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
"নিশ্চয়ই বড় প্রতিদান বড় পরীক্ষার সাথে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা দেন। যে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য সন্তুষ্টি; আর যে অসন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য অসন্তুষ্টি।" — সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৩৯৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৪০৩১
ব্যাখ্যা: মুমিনের উপর আসা বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট — এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা এবং গুনাহের কাফফারা। কিন্তু গুনাহগার ও জালিমের উপর আসা সুখ-সম্পদ — এগুলো ইস্তিদরাজ (ধীরে ধীরে ধ্বংসের ফাঁদ) হতে পারে।
(গ) আখিরাতের শাস্তি — চূড়ান্ত ও অনিবার্য
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِن تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا
"নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না। আর যদি কোনো সৎকর্ম হয়, তিনি তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান দেন।" — সূরা আন-নিসা: ৪০
আল্লাহ আরও বলেন:
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ
"আর আমি কিয়ামতের দিন ন্যায়ের পাল্লা স্থাপন করব; তখন কোনো প্রাণীকে কোনোভাবেই জুলুম করা হবে না। আর যদি সরিষার দানার সমানও (কর্ম) হয়, আমি তা উপস্থিত করব। আর হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আমি যথেষ্ট।" — সূরা আল-আম্বিয়া: ৪৭
ব্যাখ্যা: দুনিয়ায় শাস্তি না পেলেও আখিরাতে প্রতিটি ছোট-বড় কাজের হিসাব হবে। সেখানে কোনো পলায়ন নেই, কোনো সুপারিশ কাজে আসবে না (আল্লাহর অনুমতি ছাড়া), এবং কোনো টাকা-সম্পদ কাজে আসবে না।
তার নামাজ, দান-সদকা ও উপকার — এগুলো কি তার গুনাহ মোচন করবে?
উত্তর: না, কেবল নামাজ-রোজা-দান-সদকা করলেই যদি সে যিনা, হারাম সম্পর্ক, অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকে এবং তওবা না করে, তাহলে তার এই ইবাদতগুলো তার কবুল হবে না। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের (পরহেজগারদের) পক্ষ থেকেই কবুল করেন।" — সূরা আল-মায়িদা: ২৭