গোনাহ সম্পর্কে জানা এবং এতে আমার করণীয় কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5781
Questioner: Mirab Bezad
Question Asked: 22 Sep 2026, 12:31 AM
Reviewed & Published: 22 Sep 2026, 06:00 AM
Views: 35
Tokens: 8,486
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এক বোনের ক্ষেত্রে আসা দ্বীনদার একটি বিবাহ প্রস্তাব ঐ বোনের অনেক চেষ্টার পরও বোনটির পরিবার প্রত্যাখান করেছিলেন। কিন্তু কিছু দিন পর বোনটির পরিবার আবার তাদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন কিন্তু তারা কয়েকদিন সময় নিয়ে জানিয়েছিলেন তাদের সব কিছু অন্যত্র পাত্রীপক্ষের সাথে ফাইনাল করা হয়েছে। এরপর কোনদিন বোনটির পরিবার বা তাদের পরিবার কারোই সাথে তাদের যোগাযোগ নেই।কিন্তু ঐ পাত্রটি প্রতিনিয়ত বোনটির স্টোরি সিন করে, বোনটি খুব বিভ্রান্তিতে ভোগে, যেহেতু বোনটি খুব চেয়েছিলেন একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী আর বোনটির জন্য আসা এই একটাই দ্বীনদার প্রস্তাব ছিল । পারিবারিক ভাবে যখন বিবাহের আলোচনা হচ্ছিল এবং আলোচনার ফলাফল নেগেটিভ দেখা দিচ্ছিল তখন বোনটি তাকে জানিয়ে ছিল,শরীয় ওজর ব্যতীত এভাবে নারী-পুরুষের একে অপরের স্টোরি সিন করা উচিত নয়,আপনি আপনার কাছ থেকে নাম্বার ডিলিট করে দিন।” তাই খুব কান্না করে,যারা প্রত্যাখান করে অন্যত্র বিয়ে ফাইনাল জানিয়েছিল সে পাত্র কেন তার স্টোরি দেখে।কিন্তু ঐ পাত্র ডিলিট করে দিয়ে জানিয়ে এই কাজ অবহত রেখেছে।ঐ বোনটি আনলাইনে বিশেষ করে টেলিগ্রামে কোন দাওয়াতি কাজও করেন না যে তার স্টোরি দেখতে হবে।সে শুধু আরবি ভাষায় নিজের কিছু চিন্তা ভাবনা ভিন্ন ভিন্ন আরবি ফন্টে লিখে শেয়ার করে। এবার প্রশ্ন হলো শরীয় ওজর ছাড়া একজন বিবাহিত পুরুষের কি একজন পরনারীর স্টোরি দেখা জায়েজ?এবং যার সাথে বিবাহ প্রত্যাখান হয়েছিল এমন কারোর স্টোরি? বোনটি খুব কষ্ট পায় এমন আচরণে, এতে কি ঐ পাত্রটির গোনাহ হবে?

Answer

প্রশ্নোত্তর: পরনারীর স্টোরি দেখা ও তার শরয়ী বিধান

ভূমিকা

প্রশ্নটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ। এতে কয়েকটি দিক রয়েছে: ১. একজন বিবাহিত পুরুষের পরনারীর স্টোরি/স্ট্যাটাস দেখা ২. যার সাথে বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এমন নারীর স্টোরি দেখা ৩. এতে পাত্রের গুনাহ হবে কি না ৪. বোনটির করণীয় কী


১. পরনারীর দিকে দেখা ও তার বিধান

কুরআনের দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ

"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবগত।" — সূরা আন-নূর: ৩০

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ...

"আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে..." — সূরা আন-নূর: ৩১

হাদীসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ

"হে আলী! তুমি এক দৃষ্টির পর আরেক দৃষ্টি দিও না। কারণ প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য (ক্ষমাযোগ্য), কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি তোমার জন্য নয়।" — সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৯, সুনানে তিরমিযী: ২৭৭৭

الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ

"দুই চোখও যিনা করে, আর তাদের যিনা হলো (হারামের দিকে) দেখা।" — সহীহ বুখারী: ৬২৪৩

হানাফী ফিকহের দলিল

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) লিখেন:

وَيَحْرُمُ عَلَى الرَّجُلِ النَّظَرُ إِلَى وَجْهِ الْمَرْأَةِ الْأَجْنَبِيَّةِ وَكَذَا إِلَى سَائِرِ بَدَنِهَا، لَا لِشَهْوَةٍ وَلَا لِغَيْرِ شَهْوَةٍ، إِلَّا لِحَاجَةٍ

"পুরুষের জন্য পরনারীর মুখমণ্ডল ও সমস্ত শরীরের দিকে দেখা হারাম — চাহিদাসহ হোক বা চাহিদা ছাড়া — তবে শরয়ী প্রয়োজন ব্যতীত।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে:

النَّظَرُ إِلَى الْأَجْنَبِيَّةِ حَرَامٌ إِلَّا لِضَرُورَةٍ

"পরনারীর দিকে দেখা হারাম, তবে প্রয়োজন ব্যতীত।" — ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮

অনলাইনে দেখা সম্পর্কে

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) বলেন:

অনলাইনে পরনারীর ছবি, ভিডিও বা স্ট্যাটাস দেখা ঠিক তেমনি হারাম, যেমন সরাসরি দেখা হারাম। বরং অনলাইনে দেখা আরও বিপজ্জনক, কারণ এতে বারবার দেখা যায়, কল্পনা বাড়ে এবং ফিতনার আশঙ্কা প্রবল। — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ৩, পৃ. ৪২১ (অনুরূপ)


২. বিবাহ প্রত্যাখ্যানকারী পাত্রীর স্টোরি দেখা

বিশেষভাবে হারাম হওয়ার কারণ

যখন কোনো নারীর সাথে বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন তার প্রতি পাত্রের মনে নানা ধরনের কু-ভাবনা, আফসোস, কিংবা শয়তানের ওয়াসওয়াসা আসতে পারে। তাই এমন নারীর স্টোরি দেখা আরও বেশি হারাম ও বিপজ্জনক।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

وَكُلُّ مَا يُفْضِي إِلَى الْحَرَامِ فَهُوَ حَرَامٌ

"যে বিষয় হারামের দিকে নিয়ে যায়, তা-ও হারাম।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৫০ (কায়েদা: الوسائل لها أحكام المقاصد)

শরহু মা'আনিল আছার-এ ইমাম তাহাবী (রহ.) বর্ণনা করেন:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ — "প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।" — সহীহ বুখারী: ১০, সহীহ মুসলিম: ৪০

এখানে পাত্রের বারবার স্টোরি দেখা বোনটির মানসিক কষ্টের কারণ হচ্ছে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।


৩. পাত্রের গুনাহ হবে কি?

হ্যাঁ, গুনাহ হবে — কয়েকটি দিক থেকে:

ক. দৃষ্টির গুনাহ: পরনারীর স্টোরি দেখা সরাসরি দৃষ্টির যিনার অন্তর্ভুক্ত।

খ. কষ্ট দেওয়ার গুনাহ: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

"ক্ষতি করো না এবং ক্ষতিগ্রস্তও করো না।" — সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১, মুসনাদে আহমাদ: ২৮৬৫

বোনটি কষ্ট পাচ্ছেন — এটি পাত্রের জন্য গুনাহের কারণ।

গ. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ: বোনটি তাকে নাম্বার ডিলিট করতে বলেছিলেন, সে ডিলিট করে জানিয়েছিল — কিন্তু পরে আবার স্টোরি দেখা অব্যাহত রেখেছে। এটি মিথ্যা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত।

ঘ. বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও: সে বিবাহিত, তার উচিত নিজের স্ত্রীর প্রতি মনোযোগ দেওয়া। পরনারীর স্টোরি দেখা তার স্ত্রীর হকও নষ্ট করে।

ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন:

النَّظَرُ بِالشَّهْوَةِ زِنَا الْعَيْنِ، وَهُوَ أَصْلُ كَثِيرٍ مِنَ الْفَسَادِ

"শাহওয়াতের সাথে দেখা চোখের যিনা, আর এটি অনেক ফাসাদের মূল।" — ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, খণ্ড ৩, পৃ. ২৫


৪. বোনটির করণীয়

ক. নিজের পক্ষ থেকে সতর্কতা

১. বোনটি পাত্রকে ব্লক করে দেবেন — যাতে সে আর স্টোরি দেখতে না পারে। এটি তার জন্য জায়েয, বরং কর্তব্য।

২. প্রাইভেসি সেটিংস কঠোর করুন — স্টোরি শুধু মাহরামদের জন্য দৃশ্যমান করুন।

৩. আরবি লেখা শেয়ার করা — এতে দোষ নেই, তবে যদি জানা যায় যে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি তা দেখে কষ্ট পায় বা ফিতনায় পড়ে, তবে প্রাইভেসি বাড়ানো উত্তম।

খ. মানসিক শান্তি

বোনটি যেন আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। আল্লাহ বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" — সূরা আত-তালাক: ২

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ

"হয়তো তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" — সূরা আল-বাকারা: ২১৬

গ. দুআ

বোনটি এই দুআ বেশি পড়বেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ أَنْ تَغْفِرَ لِي ذُنُوبِي وَأَنْ تَرْزُقَنِي زَوْجًا صَالِحًا

"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি — আপনি এক, অমুখাপেক্ষী, যিনি জন্ম দেননি এবং জন্মগ্রহণ করেননি, যার সমতুল্য কেউ নেই — আমার গুনাহ ক্ষমা করুন এবং আমাকে সৎ স্বামী দান করুন।"


৫. পাত্রের করণীয় (যদি সে জানতে পারে)

১. তাওবা করবে — দৃষ্টির গুনাহ থেকে। ২. বোনকে ব্লক করবে — যাতে আর দেখতে না হয়। ৩. নিজের স্ত্রীর প্রতি মনোযোগ দেবে — এটাই তার কর্তব্য। ৪. বোনের কষ্টের জন্য ক্ষমা চাইবে — যদি সম্ভব হয়, পরোক্ষভাবে।


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | পরনারীর স্টোরি দেখা | হারাম (সূরা নূর: ৩০, রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৬৭) | | বিবাহ প্রত্যাখ্যানকারীর স্টোরি দেখা | আরও বেশি হারাম (ফিতনার আশঙ্কা) | | বিবাহিত পুরুষের জন্য | কঠোরভাবে নিষিদ্ধ | | বোনের কষ্ট পাওয়া | পাত্রের গুনাহ হবে (লَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ) | | বোনের করণীয় | ব্লক করা, প্রাইভেসি বাড়ানো, দুআ করা | | পাত্রের করণীয় | তাওবা, ব্লক, স্ত্রীর প্রতি মনোযোগ |

উপসংহার: বোনটির প্রতি অন্যায় হয়েছে, তবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। পাত্রটি গুনাহ করছে — তার তাওবা করা উচিত। বোনটি ব্লক করে দিক এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুক। আল্লাহ তাকে উত্তম দ্বীনদার জীবনসঙ্গী দান করুন। আমীন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.