উমরাহ জন্য পুরুষ মাহরাম আবশ্যক কি না?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
আমার একজন বোন উমরাহতে যেতে চান।তিনি বয়স্ক এবং স্বামী মৃত।একজন আত্মীয়র সাথে উমরাহ করতে যেতে চাচ্ছেন , সেক্ষেত্রে কি তার উমরাহ কবুল হবে?উমরাহর ক্ষেত্রে অনেক নারীরা গ্রুপে বা মাহরাম ছাড়া আত্মীয়দের সাথে যায় এটি কতটুকু সঠিক।?
Answer
উমরাহর সফরে মহিলার জন্য মাহরামের প্রয়োজনীয়তা
সংক্ষিপ্ত উত্তর
মাহরাম ছাড়া উমরাহ বা হজের সফরে যাওয়া হানাফি মাযহাব অনুযায়ী জায়েয নয়। তবে উমরাহ "কবুল হবে কি হবে না" — এটা আল্লাহর ইচ্ছাধীন বিষয়; কিন্তু মাহরাম ছাড়া সফর করা সুস্পষ্ট গুনাহ, এবং এ অবস্থায় গেলে উমরাহর সওয়াব ও পূর্ণতা থেকে বঞ্চিত হবেন। বয়স্ক হওয়া বা স্বামী মৃত হওয়া এই বিধান পরিবর্তন করে না।
দলিলসমূহ
১. কুরআনুল কারীম
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ — (সূরা বাকারা: ১৮৭)
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ — (সূরা আহযাব: ৩৩)
এবং সফরের অনুমতি সম্পর্কে:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ — (সূরা তাগাবুন: ১৬)
অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো।
২. হাদীস শরীফ
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ، وَلَا يَدْخُلُ عَلَيْهَا رَجُلٌ إِلَّا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ
"কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না, এবং কোনো (গায়রে মাহরাম) পুরুষ তার কাছে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তার সাথে মাহরাম থাকে।"
— সহীহ বুখারী: ১৮৬২; সহীহ মুসলিম: ১৩৪১
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُسَافِرَ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ لَيْسَ مَعَهَا حَمِيمٌ
"যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য একদিন-রাতের পথ মাহরাম ছাড়া সফর করা হালাল নয়।"
— সহীহ মুসলিম: ১৩৩৯
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ ثَلَاثًا إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
"কোনো নারী তিন দিনের পথ মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।"
— সহীহ বুখারী: ১০৮৭; সহীহ মুসলিম: ১৩৩৮
৩. হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহ
আল্লামা কাসানী (রহ.) «بدائع الصنائع»-এ বলেন:
وَلَا تَخْرُجُ الْمَرْأَةُ إِلَى الْحَجِّ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
ইমাম হাসকাফী (রহ.) «দুররুল মুখতার»-এ লিখেন:
وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تُسَافِرَ سَفَرًا مُبَاحًا وَلَا وَاجِبًا إِلَّا مَعَ زَوْجٍ أَوْ مَحْرَمٍ
ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার» (২/৪৬৪)-এ উল্লেখ করেন:
وَالْمُرَادُ بِالْمَحْرَمِ مَنْ حَرُمَ عَلَيْهَا مُؤَبَّدًا بِقَرَابَةٍ أَوْ رَضَاعٍ أَوْ مُصَاهَرَةٍ
অর্থাৎ মাহরাম হলো সেই ব্যক্তি, যার সাথে বংশ, দুধ-সম্পর্ক বা শ্বশুর-সম্পর্কের কারণে চিরতরে বিবাহ হারাম।
«ফাতাওয়া আলমগিরি» (১/২১৭)-এ আছে:
وَلَا بُدَّ لِلْمَرْأَةِ فِي الْحَجِّ مِنْ مَحْرَمٍ
«আল-হিদায়া»-তে ইমাম মারগীনানী (রহ.) বলেন:
وَالْمَرْأَةُ لَا تَخْرُجُ إِلَّا مَعَ مَحْرَمٍ
মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী» (১/৪৭০)-এ বলেন:
"মহিলার জন্য হজ বা উমরাহর সফরে মাহরাম থাকা শর্ত। মাহরাম ছাড়া সফর করলে গুনাহ হবে, যদিও হজ বা উমরাহ আদায় হয়ে যাবে।"
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে বলেন:
"মাহরাম ছাড়া মহিলার হজ-উমরাহর সফর নাজায়েয।"
আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর
প্রশ্ন ১: বোন বয়স্ক ও স্বামী মৃত — মাহরাম ছাড়া যেতে পারবেন?
উত্তর: না। বয়স বা বৈধব্যের কারণে বিধান শিথিল হয় না। হাদীসে "যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিনে ঈমান রাখে" — এই সাধারণ ঘোষণা বয়স-নির্বিশেষে সকল নারীর জন্য প্রযোজ্য।
প্রশ্ন ২: আত্মীয়ের সাথে গেলে উমরাহ কবুল হবে?
উত্তর: দু'টি দিক:
-
ইবাদতের বৈধতা: যদি মাহরাম ব্যতীত গায়রে মাহরাম আত্মীয়ের সাথে যায়, তবে সফরটি নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। উমরাহর আনুষ্ঠানিকতা আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে তাওবা করতে হবে।
-
কবুল হওয়া: কবুল-অকবুল আল্লাহর এখতিয়ার। তবে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, নাজায়েয সফরের কারণে উমরাহর সওয়াব কমে যায় বা বরকত থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রশ্ন ৩: নারীরা গ্রুপে বা মাহরাম ছাড়া আত্মীয়দের সাথে যায় — কতটুকু সঠিক?
উত্তর: এটি শরীয়তসম্মত নয়। কারণ:
- গ্রুপ (মহিলাদের দল): শুধু মহিলাদের দল মাহরামের বিকল্প নয়। ইমাম নববী (রহ.) «শরহে মুসলিম»-এ স্পষ্ট বলেছেন, মহিলাদের দল মাহরামের বিধান রহিত করে না।
- গায়রে মাহরাম আত্মীয় (যেমন: চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই, ভগ্নিপতি): এরা মাহরাম নয়, বরং গায়রে মাহরাম। এদের সাথে সফর করা জায়েয নয়।
- মাহরাম কারা: পিতা, দাদা, ছেলে, নাতি, ভাই, চাচা, মামা, শ্বশুর, দুধ-সম্পর্কীয় মাহরাম — এরা।
সমাধান ও পরামর্শ
-
মাহরাম ব্যবস্থা করুন: বোনের কোনো মাহরাম (যেমন ভাই, ছেলে, চাচা, মামা) থাকলে তার সাথে উমরাহর ব্যবস্থা করুন।
-
মাহরাম না থাকলে: মাহরাম ছাড়া যাবেন না। বরং ঘরে থেকে দুআ, ইস্তিগফার, দান-সদকা করুন। আল্লাহ তাআলা নিয়তের ভিত্তিতে সওয়াব দান করবেন — হাদীসে আছে:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ — (সহীহ বুখারী: ১)
-
মাহরাম ছাড়া গেলে: অবশ্যই তাওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সফর থেকে বিরত থাকুন।
-
মহিলাদের জামাতবদ্ধ সফর: অনেক দেশে প্রচলিত হলেও এটি ফিকহসম্মত নয়। মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | মাহরাম ছাড়া উমরাহ সফর | নাজায়েয, গুনাহ | | বয়স্ক/বিধবা হওয়া | বিধান শিথিল করে না | | মহিলাদের গ্রুপ | মাহরামের বিকল্প নয় | | গায়রে মাহরাম আত্মীয় | মাহরাম নয়, সাথে যাওয়া জায়েয নয় | | মাহরাম থাকলে | উমরাহ জায়েয ও সওয়াবের কাজ |
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শরীয়তের বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।