পরিবারের অগোচরে পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেয়ার শর্তে রাজি হওয়া
Family Life · Hanafi
Question
পিতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী। মাতা গৃহিনী।
পিতার উপার্জন (কিছু কমবেশি হতে পারে):
পেনশন ষোলো হাজার টাকা (মাসিক),
ইমামতি তিন হাজার টাকা (মাসিক),
জমি ত্রিশ হাজার টাকা (বাৎসরিক),
মাহফিলে বক্তা হিসেবে অল্প কিছু উপার্জন রয়েছে তবে পরিমান জানিনা। পিতার জমির পরিমান সোয়া এক কানির বেশি তবে দের কানির কম। পিতার মতে তার সমস্ত কিছু মিলিয়ে মোট সম্পত্তি/ সম্পদের পরিমান আনুমানিক দুই কোটি হবে।
পিতা, মাতা ও আমার নামে ব্যাংকে আলাদা করে টাকা জমা ও বিনিয়োগ করা আছে যেখান থেকে লাভ হিসেবে দেয়া হয়। এই টাকা ব্যাংকে জমাই থাকে। এই টাকা থেকেই বাৎসরিক যাকাত দেয়া হয়। মা এর দশ লক্ষ, আমার আনুমানিক তেইশ লক্ষ, পিতার আনুমানিক আমাদের দুজনের সমপরিমান।
মা এর ঔষধের খরচ বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। পিতার দুই থেকে তিন হাজার টাকা হতে পারে।
আমি মহিলা আলিয়া মাদ্রাসার প্রভাষক। পরিবারের চাপে চাকরিটি করছি। পিতামাতার মতে এই চাকরিটি তাদের ও আমার বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন। যেহেতু বৃদ্ধ বয়সে তাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব আমার। আমার বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো পাত্র যদি বলে চাকরি ছাড়তে হবে সেখানে আমার পিতামাতা রাজি হন না। কোনো পাত্র যদি আমার কাছে চাকরি ছেড়ে দেয়ার বিষয় বলে আমি আমার পিতামাতাকে চাকরি ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি না জানিয়ে পাত্রের এই শর্তে রাজি হতে পারবো? বাকি সব বিষয় পিতামাতা জানবে, পারিবারিক বিয়ে। আমি এবং পিতা দুজন মিলে বর্তমানে মা এর ঔষধের টাকা দেই। কখনও পিতা ঔষধ কিনে, কখনও আমি কিনি। আমি চাকরি ছেড়ে দিলে কি পিতামাতার উপরে অবিচার করা হবে? পিতা যদি কখনও মা এর চিকিৎসায় অবহেলা করে? সম্ভাবনা আছে। অথবা তাদের বৃদ্ধাবস্থায় যদি আমি তাদের পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারি? চাকরি ছেড়ে দেয়ার বেপারে তারা কখনো রাজি না।
আমি কি পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেয়ার শর্তে রাজি হবো পিতামাতাকে না জানিয়ে? পাত্রের সব দিক ভালো মনে হচ্ছে, ধার্মিক মনে হচ্ছে।
Answer
পরিবারের অগোচরে পাত্রের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার শর্তে রাজি হওয়া
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন মুসলিম মহিলা আলিয়া মাদ্রাসার প্রভাষক। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। পিতা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী, মাতা গৃহিনী। মাতার চিকিৎসা ব্যয় মাসিক প্রায় পাঁচ হাজার টাকা, যা বর্তমানে তিনি ও তাঁর পিতা মিলে বহন করেন। পিতামাতা তাঁর চাকরি ছাড়ার ব্যাপারে কখনোই রাজি নন, কারণ তাঁদের মতে এই চাকরিই তাঁদের ও তাঁর বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন। এখন কোনো পাত্র যদি বিয়ের শর্ত হিসেবে চাকরি ছাড়ার দাবি করে, তবে পিতামাতাকে না জানিয়ে সেই শর্তে রাজি হওয়া কি বৈধ হবে?
ইসলামী দৃষ্টিকোণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ
১. পিতামাতার সেবা করা ফরজে আইন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "প্রভুর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" — (তিরমিযী: ১৮৯৯)
বিশেষত যখন পিতা-মাতা বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং সন্তান একমাত্র — তখন তাদের সেবা করা ফরজে আইন (ব্যক্তিগতভাবে অবশ্য পালনীয়) হিসেবে গণ্য হয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
وَيَجِبُ عَلَى الْوَلَدِ خِدْمَةُ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْحَاجَةِ وَالضَّعْفِ "পিতা-মাতার প্রয়োজন ও দুর্বলতার সময় সন্তানের উপর তাদের সেবা করা ওয়াজিব।" — (রাদ্দুল মুহতার: ৬/১৪৭, কিতাবুল হাজার)
২. পিতামাতার অনুমতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে
ফিকহের একটি মূলনীতি হলো:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির বদলে ক্ষতি করা যাবে না।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
আপনার চাকরি ছেড়ে দেওয়া মানে:
- পিতামাতার চিকিৎসা ব্যয় বহনে ঘাটতি সৃষ্টি হওয়া
- তাদের বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া
- নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হওয়া
এমতাবস্থায় পিতামাতাকে না জানিয়ে এমন শর্তে রাজি হওয়া — যা সরাসরি তাদের ক্ষতির কারণ হবে — শরীয়তসম্মত নয়।
৩. বিয়ের শর্ত হিসেবে চাকরি ছাড়ার দাবি
ইসলামে বিয়ের শর্ত কয়েক প্রকার:
ক. বৈধ শর্ত: যেমন — স্ত্রীকে শরীয়তসম্মত অধিকার দেওয়া, মোহর নির্ধারণ ইত্যাদি।
খ. অবৈধ শর্ত: যা শরীয়তবিরোধী বা কারো হক নষ্ট করে।
আপনার ক্ষেত্রে পাত্রের শর্তটি — "চাকরি ছাড়তে হবে" — যদিও সরাসরি হারাম নয়, তবে এটি পিতামাতার হক ও আপনার নিজের বৈধ অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। বিশেষত যখন:
- পিতামাতা এতে রাজি নন
- এটি তাদের চিকিৎসা ও ভরণপোষণে প্রভাব ফেলবে
- আপনি একমাত্র সন্তান
তাহলে এই শর্তে রাজি হওয়া মাকরূহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হিসেবে গণ্য হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নিকট বিয়ের এমন শর্ত যা স্ত্রীর বৈধ অধিকার বা তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে — তা বাতিল বলে গণ্য।
৪. পিতামাতাকে না জানিয়ে রাজি হওয়া — গোপনীয়তার বিধান
ইসলামে পিতা-মাতার সাথে পরামর্শ না করে এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া — যা তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে — আকদে বিল-ওয়ালিদাইন (পিতা-মাতার অবাধ্যতা) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا "তাদের (পিতা-মাতার) সাথে 'উফ'ও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
যদি "উফ" বলা নিষিদ্ধ হয়, তবে তাদের অজান্তে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করে — তা কতটা গুরুতর হবে?
সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
সরাসরি উত্তর:
না, আপনি পিতামাতাকে না জানিয়ে পাত্রের "চাকরি ছাড়ার" শর্তে রাজি হতে পারবেন না। কারণ:
- পিতামাতার সেবা ফরজে আইন — বিশেষত যখন তারা বৃদ্ধ, অসুস্থ ও আপনার উপর নির্ভরশীল।
- চাকরি ছাড়লে তাদের চিকিৎসা ও ভরণপোষণে ঘাটতি সৃষ্টি হবে — যা তাদের হক নষ্ট করার শামিল।
- পিতামাতা স্পষ্টভাবে রাজি নন — তাদের সন্তুষ্টি ব্যতীত এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ।
- গোপনীয়তা — পিতামাতাকে না জানিয়ে এমন শর্তে রাজি হওয়া তাদের সাথে প্রতারণা ও অবাধ্যতার শামিল।
করণীয়:
- পাত্রকে স্পষ্টভাবে জানান: আপনার পিতামাতার অবস্থা, তাদের চিকিৎসা ব্যয়, এবং আপনি একমাত্র সন্তান — এসব বিবেচনায় চাকরি ছাড়া সম্ভব নয়।
- পিতামাতার সাথে পরামর্শ করুন: পাত্রের প্রস্তাব সম্পর্কে তাদের জানান এবং তাদের মতামত নিন।
- বিকল্প সমাধান খুঁজুন: পাত্র যদি ধার্মিক ও ভালো হন, তবে তিনি আপনার পরিস্থিতি বুঝবেন। চাকরি ছাড়ার পরিবর্তে অন্য কোনো সমঝোতা সম্ভব কিনা ভাবুন।
- ইস্তেখারা করুন: সিদ্ধান্তের আগে সালাতুল ইস্তেখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করুন।
- বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন: স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতি বা আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
বিশেষ সতর্কতা:
যদি পাত্র ধার্মিক হন এবং আল্লাহর ভয় রাখেন, তবে তিনি কখনোই আপনাকে পিতামাতার অবাধ্য হতে বা তাদের হক নষ্ট করতে বলবেন না। বরং তিনি আপনার পরিস্থিতি বুঝে সমাধান বের করবেন। যদি তিনি জোর দেন — তবে তা তাঁর "ধার্মিকতা" সম্পর্কে পুনর্বিবেচনার বিষয়।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।