বিধবাদের সুদ খাওয়া জায়েজ কি? যদি তার কোনো ছেলে সন্তান না থাকে আর না কোনো অভিভাবক থাকে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, বিধবার জন্য সুদ খাওয়া কোনো অবস্থাতেই জায়েজ নয়। ছেলে-সন্তান না থাকা, অভিভাবক না থাকা, অভাব-অনটন—এসব কোনো কারণেই সুদ হালাল হয় না। সুদ কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্টভাবে হারাম (মহাপাপ)। তবে অভাবী বিধবা নারীর জন্য ইসলামি শরিয়তের নির্দেশিত বৈধ উপায়ে সাহায্য ও সহযোগিতার বিধান রয়েছে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. সুদ চিরস্থায়ীভাবে হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)। অন্য হাদিসে এসেছে, সুদ হলো সাতটি ধ্বংসকারী কবিরা গুনাহের একটি (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬)।
২. অভাব-অনটন সুদকে হালাল করে না
শরিয়তের একটি মূলনীতি হলো—
الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ "প্রয়োজন নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে"—তবে তা কেবল শরিয়ত-স্বীকৃত প্রকৃত নিরুপায় অবস্থায় এবং শরিয়ত-নির্ধারিত সীমার ভেতরে।
সুদ এ মূলনীতির আওতায় পড়ে না। কারণ—
- সুদ কেবল "নিষিদ্ধ" নয়; এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য (সূরা বাকারা: ২৭৯)।
- অভাব মেটানোর জন্য শরিয়ত অসংখ্য বৈধ পথ রেখেছে—যাকাত, সদকা, দান, ঋণে সহযোগিতা, রাষ্ট্রীয়/সামাজিক সহায়তা ইত্যাদি। তাই সুদের মতো হারাম পথে যাওয়ার কোনো ওজর থাকে না।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ সুদের হারামতা ও তার ভয়াবহতা আলোচনা করতে গিয়ে স্পষ্ট করেছেন, এটি এমন কবিরা গুনাহ যা কোনো প্রয়োজনে হালাল হয় না (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু, অধ্যায়: রিবা)।
৩. বিধবার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান
- বিধবা যদি অভাবী হন, তবে তিনি যাকাত গ্রহণের হকদার। রাসূল ﷺ বলেছেন, অভাবী নারীর জন্য যাকাত গ্রহণে কোনো দোষ নেই; বরং এতে সওয়াব রয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৬২-এর অধ্যায়সমূহ)।
- আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের দায়িত্ব হলো তার ভরণপোষণে এগিয়ে আসা। রাসূল ﷺ বলেছেন, "সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে" (সহিহ বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ)।
- প্রয়োজনে বিনা সুদে ঋণ (কারজে হাসানা) নেওয়া জায়েজ, এবং তা পরিশোধে সাধ্যমতো চেষ্টা করা কর্তব্য।
- শরিয়তসম্মত ব্যবসা, কৃষি, হস্তশিল্প, চাকরি ইত্যাদির মাধ্যমে উপার্জনের ব্যবস্থা করা উচিত।
৪. কেউ যদি ইতিমধ্যে সুদ নিয়ে ফেলে
তাকে অবশ্যই তাওবা করতে হবে, ভবিষ্যতে সুদ পরিহার করতে হবে। সুদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ তার মালিকানায় থাকে না; তা সদকা করে দেওয়া বা মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া কর্তব্য (যদি মালিক চেনা যায়)। তবে এ সদকা তার পাপ মোচন করবে না—তাওবা জরুরি।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |---|---| | সুদ খাওয়া | হারাম, মহাপাপ | | বিধবা হওয়া | সুদ হালাল হওয়ার কারণ নয় | | সন্তান/অভিভাবক না থাকা | সুদ হালাল হওয়ার কারণ নয় | | অভাব-অনটন | সুদ হালাল হওয়ার কারণ নয় | | অভাবী বিধবার করণীয় | যাকাত/সদকা গ্রহণ, বিনা সুদে ঋণ, বৈধ উপার্জন | | সমাজের দায়িত্ব | তার ভরণপোষণে সহযোগিতা করা |
মূল রেফারেন্স: সূরা বাকারা ২৭৫-২৭৯; সহিহ বুখারি ২৭৬৬; সহিহ মুসলিম ১৫৯৮; রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুল বুয়ু—বাবুর রিবা; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল কারাহিয়াত; ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী); ফাতাওয়া উসমানি (তাকি উসমানি), কিতাবুর রিবা।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।