"নেশাগ্রস্ত ও দুর্বল অবস্থায় তালাক পতিত হবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
তালাক সম্পর্কিত মাসআলা: নেশাগ্রস্ত ও দুর্বল অবস্থায় তালাক
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে—যদি স্বামী নেশাগ্রস্ত (মাদক/নেশাদ্রব্যের প্রভাবে) অবস্থায় থাকে এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল থাকে, আর সেই অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়, তাহলে কি তালাক পতিত হবে? আর যদি পতিত হয়, তাহলে সে স্ত্রীকে কীভাবে ফিরিয়ে রাখতে পারবে?
ফিকহি বিশ্লেষণ (হানাফি মাযহাব অনুযায়ী)
১. নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তালাকের হুকুম
হানাফি মাযহাবের সুস্পষ্ট ও প্রসিদ্ধ মত হলো—নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক পতিত হয়
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنتُمْ سُكَارَىٰ حَتَّىٰ تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বলছ তা বুঝতে পারো।" — (সূরা আন-নিসা: ৪৩)
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
"প্রত্যেক নেশাদায়ক বস্তু হারাম।" — (সহিহ বুখারি: ৫৫৮৬, সহিহ মুসলিম: ২০০৩)
হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)-এ উল্লেখ আছে: "সাকরান (নেশাগ্রস্ত) ব্যক্তির তালাক পতিত হবে, (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তালাক)
- ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে: "নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির তালাক ও ইলার পতিত হয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাক)
- আল-হিদায়া-তে ইমাম মারগিনানি রহ. বলেন: "সাকরানের তালাক পতিত হয়, কারণ সে নিজেই নেশার মাধ্যমে নিজের বিবেক নষ্ট করেছে।"
২. মানসিক ও শারীরিক দুর্বলতার প্রভাব
যদি মানসিক অসুস্থতা পাগলামি (জুনুন) পর্যন্ত পৌঁছে যায়:** সম্পূর্ণ পাগল (মাজনুন) হয় এবং তালাকের সময় কী বলছে তা না বোঝে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
দলিল:
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَبْلُغَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ
"তিন ব্যক্তির আমলনামা থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, শিশু যতক্ষণ না বালেগ হয়, এবং পাগল যতক্ষণ না সুস্থ হয়।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৪৪০৩, সুনানে তিরমিজি: ১৪২৩)
ইবনে আবিদিন রহ. বলেন: "মাজনুন (পাগল) ব্যক্তির তালাক পতিত হয় না, কারণ তার কোনো ইচ্ছা বা নিয়ত থাকে না।" (রাদ্দুল মুহতার)
৩. শারীরিক দুর্বলতার প্রভাব
শুধু শারীরিক দুর্বলতা (যেমন: অসুস্থতা, দুর্বলতা, ক্লান্তি) তালাক পতিত হওয়াকে প্রভাবিত করে না। যদি ব্যক্তি তালাকের শব্দ সচেতনভাবে উচ্চারণ করে এবং তার বিবেক-বুদ্ধি ঠিক থাকে, তাহলে তালাক পতিত হবে।
সমাধান: স্ত্রীকে কীভাবে ফিরিয়ে রাখবে?
যদি তালাক পতিত হয়ে যায়:
১. যদি এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হয় (রাজয়ি তালাক):
- স্বামী ইদ্দতের মধ্যে (স্ত্রীর ইদ্দতকালীন সময়, সাধারণত ৩ মাসিক বা গর্ভবতী হলে সন্তান জন্ম পর্যন্ত) নতুন বিবাহ ছাড়াই ফিরিয়ে নিতে পারবে।
- ফিরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি: সাক্ষীসহ মুখে বলা—"আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বা এ ধরনের কথা বলা।
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا
"তাদের স্বামীরা ইদ্দতের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বেশি হকদার, যদি তারা সংশোধন চায়।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
২. যদি তিন তালাক হয়ে যায় (তালাক মুগাল্লাজা):
- স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়।
- তাকে ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায়: স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে শরীয়তসম্মতভাবে বিয়ে করবে, সেই স্বামীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করবে, তারপর যদি সেই স্বামী মারা যায় বা তালাক দেয়, তাহলে ইদ্দত শেষে প্রথম স্বামী নতুন করে বিবাহ করতে পারবে (হিল্লা)।
- আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ
"অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয়, তাহলে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)