কোনো পরপুরুষ অতীতের বিষয়ে স্বামীর কাছে মিথ্যা অভিযোগ করলে এবং স্বামী সন্দেহ প্রকাশ করলে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রীর করণীয় কী?
Family Life · Hanafi
Question
এমনকি স্বামী যদি তা শুনে সন্দেহসূচক প্রশ্ন করে... অভিযোগ করে তাতেও কী করণীয়?
Answer
পরপুরুষের মিথ্যা অভিযোগ ও স্বামীর সন্দেহের ক্ষেত্রে করণীয়
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
কোনো পরপুরুষ (গায়র মাহরাম) অতীতের কোনো বিষয়ে স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীর কাছে মিথ্যা অভিযোগ করলে এবং স্বামী তা শুনে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন করতে থাকলে ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রীর করণীয় কী?
১. মিথ্যা অভিযোগ করা—কবীরা গুনাহ
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা বা অপবাদ দেওয়া ইসলামে কবীরা গুনাহ। বিশেষত কোনো পবিত্র নারীর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা বা মিথ্যা অপবাদ দেওয়া অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ لُعِنُوا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
"নিশ্চয়ই যারা সতী-সাধ্বী, নিরপরাধ ও ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।" — (সূরা আন-নূর: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
اجتنبوا السبع الموبقات... وقذف المحصنات المؤمنات الغافلات
"সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে বেঁচে থাকো... (তন্মধ্যে একটি হলো) নিরপরাধ ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করা।" — (সহীহ বুখারী: ২৭৬৬, সহীহ মুসলিম: ৮৯)
সুতরাং মিথ্যা অভিযোগকারী পরপুরুষ কঠোর গুনাহগার। তবে সে ব্যক্তি নয় যে শাস্তি দেবে—বরং আল্লাহর কাছে তার হিসাব রয়েছে।
২. স্ত্রীর করণীয়
(ক) ধৈর্য ও আল্লাহর উপর ভরসা
স্ত্রীর উচিত সবর করা, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা এবং জানা যে সে নিরপরাধ হলে আল্লাহ তার সম্মান রক্ষা করবেন।
وَاللَّهُ يَعْلَمُ إِنَّكُمْ لَكَاذِبُونَ — প্রসঙ্গত, আল্লাহ জানেন তোমরা মিথ্যাবাদী। — (সূরা আন-নূর: ১৩-১৪)
(খ) স্বামীর কাছে স্পষ্টভাবে নিজের নির্দোষিতা বর্ণনা করা
স্বামী যদি সন্দেহ প্রকাশ করে প্রশ্ন করে, তবে স্ত্রী শান্তভাবে, দৃঢ়ভাবে ও সম্মানের সাথে সত্য কথা বলবে। রাগ, তর্ক বা অভিযোগকারীর প্রতি গালিগালাজ করবে না। হাদীসে এসেছে:
عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ، فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ
"তোমরা সত্যের উপর অবিচল থাকো, কেননা সততা নেকির পথ দেখায়।" — (সহীহ মুসলিম: ২৬০৭)
(গ) স্বামীকে অভিযোগকারীর ব্যাপারে সতর্ক করা
যদি সম্ভব হয়, স্বামীকে বোঝাবে যে অভিযোগকারী ব্যক্তি মিথ্যাবাদী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী। তবে তা প্রমাণসহ বা সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করবে, শুধু আবেগের বশে নয়।
(ঘ) প্রয়োজনে পারিবারিক মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ
উভয় পরিবারের সম্মানিত ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। ইসলামে পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার জন্য মধ্যস্থতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا
"যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক নিয়োগ করো স্বামীর পরিবার থেকে এবং এক বিচারক স্ত্রীর পরিবার থেকে।" — (সূরা আন-নিসা: ৩৫)
(ঙ) অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে শরীয়তসম্মত ব্যবস্থা
যদি অভিযোগকারী প্রকাশ্যে অপবাদ দেয় এবং চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারে, তবে ইসলামী আদালতে হদ্দে কযফ (অপবাদের শাস্তি—৮০ দোররা) প্রযোজ্য। তবে এটি আদালতের বিষয়, ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিষয় নয়।
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً
"যারা সতী নারীদের প্রতি অপবাদ দেয়, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করে না, তাদের আশিটি দোররা মারো।" — (সূরা আন-নূর: ৪)
৩. স্বামীর করণীয়
স্বামীর জন্য জরুরি হলো:
-
তাহকীক ছাড়া সন্দেহে পতিত না হওয়া — আল্লাহ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
"হে ঈমানদারগণ! অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো, নিশ্চয়ই কিছু ধারণা গুনাহ।" — (সূরা আল-হুজুরাত: ১২)
-
স্ত্রীর প্রতি সুধারণা রাখা — রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
"আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে উত্তম চরিত্রকে পূর্ণ করার জন্য।" — (মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৫২)
-
অভিযোগকারীর কথা না শোনা — যদি অভিযোগকারী ফাসিক বা মিথ্যাবাদী হয়, তার কথা গ্রহণ করা যাবে না। ইসলামী বিধান অনুযায়ী ফাসিকের খবর যাচাই করা আবশ্যক:
إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
"যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো খবর আনে, তবে তা যাচাই করে নাও।" — (সূরা আল-হুজুরাত: ৬)
-
স্ত্রীর সাথে সদাচরণ — সন্দেহের বশে স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" — (সূরা আন-নিসা: ১৯)
৪. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিশেষ নির্দেশনা
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় এবং প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারে, তবে তার সাক্ষ্য ও বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আর যদি সে অপবাদ দেয়, তবে তার উপর হদ্দে কযফ ওয়াজিব হবে—যদি মাজলিসে দাবি করে।" — (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হুদুদ, খণ্ড ৪)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
"কেউ যদি কোনো পবিত্র নারীর প্রতি অপবাদ দেয় এবং চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করতে না পারে, তবে তাকে আশিটি দোররা দেওয়া হবে।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল হুদুদ)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"পারিবারিক সন্দেহ-সংশয়ের ভিত্তিতে স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করা বা তালাক দেওয়া জায়েজ নয়। বরং তাহকীক, সাক্ষী-প্রমাণ ও পারিবারিক মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে।" — (ফাতাওয়া উসমানি, পারিবারিক বিষয়াবলি)
৫. ব্যবহারিক করণীয় (সারসংক্ষেপ)
| পক্ষ | করণীয় | |------|--------| | স্ত্রী | সবর করা, সত্য বলা, স্বামীকে শান্তভাবে বোঝানো, প্রমাণ উপস্থাপন, প্রয়োজনে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ | | স্বামী | সুধারণা রাখা, তাহকীক করা, ফাসিকের কথা না শোনা, স্ত্রীর সাথে সদাচরণ করা | | অভিযোগকারী | তাওবা করা, ক্ষমা চাওয়া; অন্যথায় হদ্দে কযফের শাস্তি | | উভয় পরিবার | মধ্যস্থতা করা, ফাসাদ ছড়ানো বন্ধ করা |
৬. উপসংহার
মিথ্যা অভিযোগ করা কবীরা গুনাহ। স্ত্রীর করণীয় হলো সবর, সত্য ও ধৈর্য। স্বামীর করণীয় হলো সন্দেহ না করা, তাহকীক করা এবং স্ত্রীর প্রতি সুধারণা রাখা। অভিযোগকারী যদি প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারে, তবে ইসলামী আদালতে তার বিরুদ্ধে হদ্দে কযফ প্রযোজ্য। পারিবারিক বিষয়ে মধ্যস্থতা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে ফাসাদ ও অপবাদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।