সাদাস্রাব, প্রস্রাব, ওয়াসওয়াসা ও গ্যাসের সমস্যায় নামাজ ও অজু ভাঙে কি না?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 5687
Questioner: Vicki Butler
Question Asked: 19 Sep 2026, 06:05 PM
Reviewed & Published: 19 Sep 2026, 06:38 PM
Views: 42
Tokens: 6,247
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম ,
সাদাস্রাব এর সমস্যা আছে , এখন নামাজের সময় সাদাস্রাব বা প্রস্রাব কোনোটাই না বের হয়ে শুধু ভিজা ভিজা লাগলে কি অজু নামাজ ভেঙে যাবে কিনা ,জোহর এর একদম শেষ সময়ে জোহর শেষ করে এই ওযুতে আসর পড়া যাবে কিনা, নামাজ নিয়ে খুব পেরেশানি তে থাকতে হয় ,ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে বারবার অজু করা খুবই কষ্টকর হয়ে যায়, ( বাচ্চা রাখার ও কেউ নেই) সাথে ওয়াসওয়াসা আর অতিরিক্ত গ্যাস এর প্রবলেম বিশেষ করে নামাজের সময়,রুকু সিজদা নিয়ে কনফিউশন হয়, বেশির ভাগ সময় বায়ু আটকে নামাজ পড়তে হয়,নামাজ শেষে আবার প্রবলেম গুলো শেষ হয়ে যায়,এমন অবস্থায় কীভাবে সহজে সালাত আদায় করতে পারি। খুবই কষ্টকর পরিস্থিতিতে আছি ।এ নিয়ে আল্লাহর সাথে ও অভিমান করে ফেলি ।

Answer

পবিত্রতা ও নামাজ: সাদাস্রাব, ওয়াসওয়াসা ও গ্যাসের সমস্যায় করণীয়

উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার অবস্থা অত্যন্ত কষ্টকর—আল্লাহ তা'আলা আপনার কষ্ট বোঝেন এবং ইনশাআল্লাহ এর প্রতিদান দেবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "আল্লাহ তা'আলা অসুস্থ বান্দার নামাজকে পূর্ণাঙ্গভাবে কবুল করেন এবং তার জন্য দ্বিগুণ প্রতিদান লেখেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৯৬-এর অনুরূপ অর্থ)

নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ধাপে ধাপে দিচ্ছি:


১. শুধু "ভিজা ভিজা লাগা" কি অজু ভাঙে?

উত্তর: না, ভাঙে না।

শরীয়তের মূলনীতি হলো—নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা বাতিল হয় না (اليقين لا يزول بالشك)। অজু হয়েছে—এটি নিশ্চিত। ভেঙেছে কি না—এটি সন্দেহ। তাই শুধু "ভিজা ভিজা লাগছে" বা "মনে হচ্ছে কিছু বের হয়েছে" এই সন্দেহে অজু ভাঙবে না।

ফিকহি মূলনীতি:
"শরীর থেকে কোনো নাপাকি বের হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হলে, শুধু সন্দেহ বা ওয়াসওয়াসার কারণে অজু ভাঙে না।"
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫
ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০

তবে শর্ত: যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে প্রস্রাব বা সাদাস্রাব বের হয়েছে (এবং তা কাপড়ে লেগেছে), তাহলে অজু ভাঙবে এবং কাপড় ধুতে হবে।


২. জোহরের শেষ সময়ে জোহর শেষ করে সেই অজুতে আসর পড়া যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, যাবে—যদি অজু না ভেঙে থাকে।

অজু ভাঙার কারণগুলো নির্দিষ্ট। শুধু সময় পরিবর্তন হলে অজু ভাঙে না। তাই:

  • যদি জোহরের শেষ সময়ে অজু করে জোহর পড়েন,
  • এরপর আসরের সময় পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো নাপাকি বের না হয় (শুধু সন্দেহ নয়),
  • তাহলে সেই অজু দিয়েই আসর পড়তে পারবেন।

দলিল:
রাসূলুল্লাহ ﷺ একই অজুতে একাধিক নামাজ পড়েছেন—এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১৭
আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫


৩. সাদাস্রাব (মাজি/ওয়াদি) বা প্রস্রাবের সমস্যায় করণীয়

ক. যদি সাদাস্রাব নিয়মিত ও অনবরত বের হতে থাকে (সালসালুল বাওল বা ইস্তিহাযার মতো):

তাহলে আপনি "মা'যুর" (معذور) হিসেবে গণ্য হবেন। মা'যুরের বিধান:

  1. প্রতিটি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে একবার অজু করবেন—এরপর সেই ওয়াক্তের ভেতরে যত নামাজ পড়বেন, অজু ভাঙবে না (যদিও স্রাব বের হয়)।
  2. ওয়াক্ত শেষ হলে অজু শেষ—পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য আবার অজু করতে হবে।
  3. কাপড়ে নাপাকি লাগলে—যদি কষ্টকর হয়, তাহলে শুধু সেই অংশ ধুয়ে নিন বা কাপড় পরিবর্তন করুন।

দলিল:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মা'যুরের অজু ওয়াক্তের সাথে সম্পর্কিত—ওয়াক্ত শেষ হলে অজু শেষ।
আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০
রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০৫
ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫

খ. মা'যুর হওয়ার শর্ত:

  • পুরো ওয়াক্তের মধ্যে অন্তত একবার স্রাব বের হওয়া নিশ্চিত হতে হবে।
  • ওয়াক্তের কিছু অংশ স্রাব বন্ধ থাকলেও, যদি পুরো ওয়াক্তে অন্তত একবার বের হয়—তবেই মা'যুর।

আপনার ক্ষেত্রে: যদি সাদাস্রাব বা প্রস্রাবের সমস্যা এতটাই নিয়মিত যে প্রতি ওয়াক্তে অন্তত একবার বের হয়, তাহলে আপনি মা'যুর। তখন প্রতি ওয়াক্তে একবার অজু করলেই যথেষ্ট—বারবার অজু করার দরকার নেই।


৪. ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) সম্পর্কে

ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের প্রবেশদ্বার। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"শয়তান মানুষের অন্তরে ওয়াসওয়াসা দেয়। যখন সে তা স্মরণ করে এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, তখন শয়তান পালিয়ে যায়।"
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৩

ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা:

  1. সন্দেহকে উপেক্ষা করুন—"হয়তো অজু ভেঙেছে" মনে হলে, ভাঙেনি ধরুন।
  2. নামাজে রুকু-সিজদার সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হলে—যতটুকু নিশ্চিত, ততটুকু ধরুন (কম সংখ্যা)।
  3. "আল্লাহু আকবার" বলে নামাজ শুরু করে আর পিছনে না তাকিয়ে নামাজ শেষ করুন।
  4. নামাজ শেষে "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
  5. বেশি বেশি "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" পড়ুন।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের কাজ। এর চিকিৎসা হলো—সন্দেহকে উপেক্ষা করা এবং নিশ্চিত বিষয়ের উপর আমল করা।"
রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৬


৫. গ্যাস ও বায়ু আটকে নামাজ পড়া

ক. বায়ু বের হওয়ার সন্দেহ:

  • যদি নিশ্চিতভাবে বায়ু বের হয় (শব্দ বা গন্ধ সহ)—অজু ভাঙবে।
  • যদি শুধু মনে হয় বের হয়েছে কিন্তু কোনো শব্দ বা গন্ধ নেই—অজু ভাঙবে না।

হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি নামাজে সন্দেহ করে যে বায়ু বের হয়েছে কি না, সে যেন নামাজ না ভাঙে, যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়।"
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৭
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৬১

খ. গ্যাস আটকে নামাজ:

  • গ্যাস আটকে রাখা নামাজ ভঙ্গের কারণ নয়
  • তবে যদি গ্যাস আটকানোর কারণে অস্থিরতা বা কষ্ট হয়, তাহলে নামাজে মনোযোগ কমে—এটি মাকরুহ।
  • সমাধান: নামাজের আগে টয়লেটে গিয়ে গ্যাস বের করে নিন, তারপর অজু করে নামাজ পড়ুন।

৬. ছোট বাচ্চা নিয়ে বারবার অজু করার কষ্ট

আপনার জন্য বিশেষ ছাড়:

  1. মা'যুর হলে—প্রতি ওয়াক্তে একবার অজু করলেই যথেষ্ট।
  2. একই অজুতে একাধিক নামাজ—যদি অজু না ভাঙে, তাহলে জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা—সব এক অজুতে পড়তে পারবেন (তবে সুন্নত হলো প্রতি নামাজে নতুন অজু করা, কিন্তু ওয়াজিব নয়)।
  3. বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ—রাসূলুল্লাহ ﷺ বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ পড়েছেন।
    সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৬
    সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৪৩
  4. বাচ্চা কাঁদলে—নামাজ সংক্ষিপ্ত করুন (শুধু ফরজ পড়ুন, সুন্নত বাদ দিন)।
  5. যদি একদম কষ্ট হয়—তাহলে বসে বা ইশারায় নামাজ পড়ার অনুমতি আছে (অসুস্থতার কারণে)।

ফাতাওয়া:
"অসুস্থতা বা কষ্টের কারণে নামাজ সংক্ষিপ্ত করা বা বসে পড়া জায়েজ।"
ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৯
ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২১০


৭. আল্লাহর সাথে অভিমান করা

এটি করবেন না। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আল্লাহ কোনো ব্যক্তির উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।"
সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬

"নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।"
সূরা আশ-শারহ, আয়াত: ৫-৬

আপনার করণীয়:

  • আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, অভিমান নয়।
  • "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল" পড়ুন।
  • নিজেকে দুর্বল ভাববেন না—আল্লাহ আপনার কষ্ট জানেন।
  • আপনি অসুস্থ, তাই আপনার নামাজ পূর্ণাঙ্গ—আল্লাহ কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।

সারসংক্ষেপ (আপনার জন্য সহজ সমাধান)

| সমস্যা | সমাধান | |--------|--------| | শুধু ভিজা লাগা | অজু ভাঙবে না (সন্দেহ) | | নিশ্চিত স্রাব বের হওয়া | অজু ভাঙবে, কাপড় ধুতে হবে | | নিয়মিত স্রাব (প্রতি ওয়াক্তে) | মা'যুর—প্রতি ওয়াক্তে একবার অজু | | জোহরের অজুতে আসর | যাবে (যদি না ভাঙে) | | ওয়াসওয়াসা | উপেক্ষা করুন, নিশ্চিতের উপর আমল | | গ্যাস আটকে নামাজ | নামাজ ভাঙবে না, তবে কষ্ট হলে টয়লেটে গিয়ে সমাধান | | বাচ্চা নিয়ে নামাজ | কোলে নিয়ে পড়ুন, সংক্ষিপ্ত করুন | | আল্লাহর সাথে অভিমান | তাওবা করুন, আল্লাহ কষ্ট বোঝেন |


আল্লাহ তা'আলা আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনার নামাজকে সহজ করে দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.