ইসলামে সম্পর্ক ছেদ করার বিধান কী? দ্বীনি কারণে সম্পর্ক ছেদ করা কি জায়েয? মিথ্যা অভিযোগ ও অপমানের পর যোগাযোগ বন্ধ করা শরীয়াহ অনুযায়ী সঠিক কি না?
Family Life · Hanafi
Question
একজনের বোনের সাথে আমার অনলাইনে পরিচয় হয়।তারপর অফলাইনে দেখা-সাক্ষাত হয়।দ্বীনি বোন বলা যায়।আমার প্রতিবেশী বা আত্নীয় না।অনেক দিনের সম্পর্ক।ঈমান আমলের দিক থেকে তাদের উত্তম হিসেবেই পেয়েছি।
রিসেন্টলি তারা খুব সামান্য একটা ইশ্যুতে আমার থেকে না শুনেই আমার নামে মিথ্যে অভিযোগ দেয়,আমাকে অপমান করো।
আমি তাদের কোন জবাব দেই নি।এটুকু বলেছি তাদের চিন্তাধারার সাথে আমার চিন্তাধারার অনেক পার্থক্য।তাদের মত অনুযায়ী যেহেতু আমার কারনে তাদের মন- মস্তিষ্ক পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে তাই আমার নিজের দ্বীনের জন্য আর আমার জন্য যেন তাদের কষ্ট না হয় তাই তাদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করলাম।তাদের প্রতি আমার রাগ ক্ষোভ অভিযোগ কিছুই নেই।শুধু এটুকু চাই তারা যেন আমার সাথে যোগাযোগ না করে,সামনা-সামনি না আসে।
তারা এখন বার বার মেসেজ দিয়ে যোগাযোগ করতে চাচ্ছে।আমি আবারো স্ট্রংলি জানিয়ে দিয়েছি তাদের প্রতি আমার রাগ অভিযোগ নেই।কিন্তু জোর করা এভাবে আমার সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইলে এটা আমার নিজের উপর জুলুম ফিল হবে।তারা যেন এটা না করে।
আমার এই সিদ্ধান্ত বা আচরণ শরীয়াহ অনুযায়ী জানতে চাই!
(নিজের ব্যাপারে এটুকু বলি শুধু তাদের প্রতি রাগ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে আমি এই সিদ্ধান্ত নেইনি। তাদের চিন্তাভাবনা বা ম্যাচুরিটি যেমন সেটার সাথে মানিয়ে চলাটা আমার নিজের জন্য কষ্ট হবে।ভবিষ্যতে যেন সম্পর্ক আরো খারাপ না হয় তাই এখন যোগাযোগ অফ রাখতে চাই।)
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—একজন দ্বীনি বোনের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল, পরে কিছু ভুল বোঝাবুঝি ও মিথ্যা অভিযোগের কারণে আপনি সম্পর্ক ছেদ করেছেন। এখন তারা বারবার যোগাযোগ করতে চাইছে, আপনি চাচ্ছেন না। আপনি জানতে চান—এই সিদ্ধান্ত শরীয়াহ অনুযায়ী ঠিক কি না?
উত্তর: আপনার এই সিদ্ধান্ত শরীয়াহ অনুযায়ী নীতিগতভাবে জায়েয, তবে কিছু শর্ত ও সতর্কতা রয়েছে। বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।
১. মূল বিষয়: সম্পর্ক ছেদ করা (হিজরান/কাটা) কখন জায়েয?
ইসলামে মুসলিম ভাই-বোনের মধ্যে সম্পর্ক ছেদ করা সাধারণত নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلَاثِ لَيَالٍ
"কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন রাতের বেশি পরিত্যাগ করা হালাল নয়।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৭৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬০
তবে শরীয়াহর নির্দিষ্ট কারণ থাকলে সম্পর্ক ছেদ করা জায়েয। যেমন:
- দ্বীনি ক্ষতির আশঙ্কা
- ফিতনা বা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার ভয়
- চরম অশ্লীলতা বা অন্যায়ের সম্মুখীন হওয়া
- নিজের ইবাদত-পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলে
ইমাম নববী রহ. বলেন:
"হিজরান (সম্পর্ক ছেদ) হারাম হওয়ার হুকুম তখনই, যখন দুনিয়াবি কারণে হয়। আর যদি দ্বীনি কারণে হয়—যেমন বিদআতি বা ফাসিক ব্যক্তির থেকে দূরে থাকা—তাহলে তা জায়েয, বরং কখনো মুস্তাহাব।" — শরহে মুসলিম, খণ্ড ১৬, পৃ. ১১৩
আপনার ক্ষেত্রে: আপনি স্পষ্ট বলেছেন—রাগ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে নয়, বরং দ্বীনি স্বার্থ, পড়াশোনায় ব্যাঘাত, ভবিষ্যতে সম্পর্ক আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা এবং চিন্তাধারার পার্থক্যের কারণে দূরে সরে যাচ্ছেন। এই কারণগুলো শরীয়াহসম্মত। তাই আপনার সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে জায়েয।
২. তবে লক্ষণীয় কয়েকটি বিষয়
(ক) সম্পর্ক ছেদ সম্পূর্ণ নয়, বরং দূরত্ব বজায় রাখা
আপনি যদি চান—সালাম-সম্ভাষণ, প্রয়োজনে দ্বীনি উপকার, অসুস্থতায় খোঁজখবর ইত্যাদি বন্ধ না করেন, শুধু অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বন্ধ রাখেন—তাহলে এটি হিজরানে কামিল (সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছেদ) নয়, বরং দূরত্ব রক্ষা। এটি আরও নিরাপদ ও উত্তম।
(খ) মিথ্যা অভিযোগ ও অপমানের জবাব
তারা আপনার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে—এটি গুনাহ। তবে আপনি ধৈর্য ধরে কোনো জবাব দেননি—এটি প্রশংসনীয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
"মূর্খরা যখন তাদের সাথে ঝগড়া করে, তারা বলে—সালাম।" — সূরা ফুরকান, আয়াত ৬৩
(গ) জোর করে যোগাযোগ চাওয়া
তারা জোর করছে—এটি তাদের পক্ষ থেকে অন্যায় ও জুলুমের শামিল। কারণ কারো উপর সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া ইসলামে নেই। রাসূল ﷺ বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
"ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির বদলে ক্ষতিও করা যাবে না।" — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৮৬৭; ইবনে মাজাহ, হাদীস ২৩৪১
তাই আপনি যদি ভদ্রভাবে সীমা নির্ধারণ করেন—এটি আপনার অধিকার।
৩. শরীয়াহসম্মত পদ্ধতি
আপনার উচিত:
- রাগ-ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা — আপনি ইতিমধ্যে করেছেন, মাশাআল্লাহ।
- ভদ্রভাবে সীমা জানিয়ে দেওয়া — "আমি আপনার প্রতি কোনো রাগ-অভিযোগ রাখি না, তবে দ্বীনি স্বার্থে ও পড়াশোনার স্বার্থে এখন যোগাযোগ বন্ধ রাখতে চাই।" — এভাবে বলা জায়েয।
- সম্পূর্ণ হিজরান নয়, বরং দূরত্ব — সালাম-সম্ভাষণ, প্রয়োজনে দ্বীনি সহযোগিতা বন্ধ না করা।
- গীবত ও অপমান থেকে বেঁচে থাকা — তাদের সম্পর্কে খারাপ কথা না বলা।
- দুআ করা — তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করা।
- যদি সম্ভব হয়, ভবিষ্যতে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার — যদি তারা সংশোধন হয়, তবে সম্পর্ক পুনরায় চালু করা উত্তম।
৪. বিশেষ সতর্কতা: পর্দা ও ফিতনার বিষয়
যেহেতু এটি নন-মাহরাম পুরুষ-নারীর সম্পর্ক, তাই ইসলামে এ ধরনের সম্পর্কের সীমা রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও মন্দ পথ।" — সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ৩২
আপনি যদি নন-মাহরাম হয়ে থাকেন, তাহলে এই সম্পর্ক ছেদ করা আরও বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ ইসলামে নন-মাহরামের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. বলেন:
"নারী-পুরুষের মধ্যে যেখানে ফিতনার আশঙ্কা আছে, সেখানে সম্পর্ক রাখা নিষিদ্ধ।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭
যদি আপনি নন-মাহরাম হন, তাহলে সম্পর্ক ছেদ করা শুধু জায়েয নয়, বরং কর্তব্য।
৫. ফতোয়া সমূহের আলোকে
- ফতোয়া উসমানি (খণ্ড ২, পৃ. ৪৯৯): দ্বীনি ক্ষতির আশঙ্কায় সম্পর্ক ছেদ করা জায়েয।
- ইমদাদুল ফতোয়া (খণ্ড ৪, পৃ. ২৭৬): ফিতনার ভয়ে দূরত্ব বজায় রাখা বৈধ।
- বাহিশতী জেওর (পৃ. ৪৩৫): মুসলিম ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছেদ করা নিষিদ্ধ, তবে দ্বীনি কারণে ব্যতিক্রম।
- ফতোয়া আলমগিরি (খণ্ড ৫, পৃ. ৩৪৮): দ্বীনি স্বার্থে হিজরান জায়েয।
৬. চূড়ান্ত পরামর্শ
আপনার সিদ্ধান্ত শরীয়াহসম্মত, যদি:
- উদ্দেশ্য হয় দ্বীনি স্বার্থ, রাগ নয়।
- সম্পূর্ণ হিজরান নয়, বরং দূরত্ব।
- সালাম-সম্ভাষণ ও প্রয়োজনে দ্বীনি সহযোগিতা বন্ধ না করা।
- গীবত, অপমান, প্রতিশোধ থেকে বিরত থাকা।
- দুআ করা ও ক্ষমা করা।
তবে যদি আপনি নন-মাহরাম হন, তাহলে সম্পর্ক ছেদ করা আরও বেশি জরুরি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ দেখান। আমীন।
والله أعلم بالصواب