বিয়ের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তির নিকট ঝাঁড় ফুঁক নেয়া কি জায়েজ?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 5601
Questioner: Jannatul Nayem
Question Asked: 17 Sep 2026, 02:21 PM
Reviewed & Published: 17 Sep 2026, 02:30 PM
Views: 17
Tokens: 5,651
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ের উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তির নিকট ঝাঁড় ফুঁক নেয়া কি জায়েজ?
যদি পানি বা তেল পড়া দেওয়া হয় তা ব্যবহার করা কি শরিয়ত সম্মত হবে?
ওই ব্যক্তিটি বলছেন নির্দিষ্ট কোন পোষাক ফুঁ দিয়ে দিবেন যেটাকে সবসময় পরতে হবে।
এখানে বিবাহ দ্রুত হওয়ার জন্য তদবীর সংক্রান্ত বিশ্বাস জড়িত।
এইধরনের কোন কিছু কি ইসলামে আছে?

কুরআন - সুন্নাহ থেকে উত্তর জানতে চাইছি।

Answer

বিয়ের উদ্দেশ্যে ঝাঁড়-ফুঁক, তদবীর ও নির্দিষ্ট পোশাকে ফুঁ দেওয়ার বিধান

ভূমিকা

প্রশ্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো মূলত তিনটি দিক নিয়ে আলোচনা দাবি করে: ১. বিবাহের উদ্দেশ্যে কোনো ব্যক্তির নিকট ঝাঁড়-ফুঁক নেওয়া। ২. ফুঁ দেওয়া পানি বা তেল ব্যবহার করা। ৩. নির্দিষ্ট পোশাকে ফুঁ দিয়ে তা সর্বদা পরিধান করা এবং বিবাহ দ্রুত হওয়ার বিশ্বাস।

নিচে কুরআন, সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে ধারাবাহিকভাবে উত্তর প্রদান করা হলো।


১. ঝাঁড়-ফুঁক (রুকইয়াহ) এর শরয়ী বিধান

কুরআন থেকে দলিল

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ

"আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা (আরোগ্য) ও রহমত।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ৮২)

قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ

"বলুন, এটি (কুরআন) মুমিনদের জন্য হেদায়েত ও শিফা।" — (সূরা হা-মীম সাজদাহ: ৪৪)

হাদীস থেকে দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে ঝাঁড়-ফুঁক করতেন এবং করাতেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত:

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا مَرِضَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِهِ نَفَثَ عَلَيْهِ بِالْمُعَوِّذَاتِ

"রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাঁর পরিবারের কেউ অসুস্থ হতেন, তখন মুআওবিযাত (সূরা ফালাক, নাস ইত্যাদি) পড়ে তার উপর ফুঁ দিতেন।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৯২)

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, একদা সাহাবায়ে কেরাম এক গোত্রের নিকট গেলেন, যারা তাদের মেহমানদারি করল না। পরে সেই গোত্রের সরদারকে সাপে দংশন করলে এক সাহাবী সূরা ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিলেন এবং সে সুস্থ হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ ﷺ এই কাজের অনুমোদন দিলেন এবং বললেন:

وَمَا يُدْرِيكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ

"তোমাকে কে জানাল যে এটি রুকইয়াহ (ঝাঁড়-ফুঁক)?" — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৭৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০১)

হানাফি ফিকহের বিধান

ইমাম ইবনে আবিদীন শামী রহ. বলেন:

الرُّقْيَةُ بِالْقُرْآنِ وَالْأَدْعِيَةِ الْمَأْثُورَةِ جَائِزَةٌ بِالْإِجْمَاعِ إِذَا كَانَتْ بِكَلَامٍ مَفْهُومٍ

"কুরআন ও বর্ণিত দুআ দ্বারা ঝাঁড়-ফুঁক করা ইজমা অনুযায়ী জায়েজ, যখন তা বোধগম্য কালাম দ্বারা হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩)

শর্তসমূহ:

  1. কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম বা বর্ণিত দুআ দ্বারা হতে হবে।
  2. অর্থ বোধগম্য হতে হবে (অস্পষ্ট/জাদু মূলক শব্দ নয়)।
  3. বিশ্বাস রাখতে হবে যে, শিফা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে; ঝাঁড়-ফুঁক নিজে প্রভাবক নয়।
  4. হারাম বা শিরকি বিষয় থাকা যাবে না।

২. বিবাহের উদ্দেশ্যে ঝাঁড়-ফুঁক নেওয়ার বিধান

মূলনীতি

বিবাহ সংঘটিত হওয়া আল্লাহর হাতে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ

"তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দিয়ে দাও।" — (সূরা নূর: ৩২)

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ রিযিকদাতা, শক্তিশালী, পরাক্রমশালী।" — (সূরা যারিয়াত: ৫৮)

বিবাহ দ্রুত হওয়া আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদীরের বিষয়। আল্লাহ বলেন:

وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ

"আর আমি প্রত্যেক বস্তুকে সুস্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।" — (সূরা ইয়াসিন: ১২)

ফিকহি বিধান

বিবাহের উদ্দেশ্যে ঝাঁড়-ফুঁক নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত ও বিশ্বাস নির্ধারক:

জায়েজ অবস্থা:

  • যদি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দুআ পড়ে ফুঁ দেওয়া হয়।
  • এবং বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহই বিবাহ সহজ করে দেবেন, ঝাঁড়-ফুঁক শুধু একটি উপায়।
  • তবে এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং এটি সাধারণ দুআর অন্তর্ভুক্ত।

নাজায়েজ/শিরকি অবস্থা:

  • যদি বিশ্বাস করা হয় যে, ঝাঁড়-ফুঁক নিজেই বিবাহ দ্রুত করবে।
  • যদি নির্দিষ্ট ব্যক্তির ফুঁ-এ বিশেষ ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
  • যদি এমন শব্দ/মন্ত্র ব্যবহার করা হয় যা বোধগম্য নয় বা শিরকি।
  • যদি তদবীরকে (আধ্যাত্মিক ব্যবস্থা) আল্লাহর উপর ভরসার বিকল্প মনে করা হয়।

ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. বলেন:

وَلَا بَأْسَ بِالرُّقْيَةِ إِذَا كَانَتْ بِالْقُرْآنِ، وَأَمَّا إِنْ كَانَتْ بِأَسْمَاءٍ لَا يُفْهَمُ مَعْنَاهَا فَلَا تَجُوزُ

"কুরআন দ্বারা ঝাঁড়-ফুঁকে অসুবিধা নেই; কিন্তু যদি এমন নাম/শব্দ দ্বারা হয় যার অর্থ বোঝা যায় না, তবে জায়েজ নয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৩)


৩. ফুঁ দেওয়া পানি বা তেল ব্যবহার করা

ফিকহি বিধান

কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দুআ পড়ে ফুঁ দেওয়া পানি বা তেল ব্যবহার করা জায়েজ। কারণ এটি চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত:

عَنْ ثَابِتٍ عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَانَ يَنْفُثُ فِي الْمَاءِ وَيَشْرَبُهُ

"নবী ﷺ পানিতে ফুঁ দিতেন এবং তা পান করতেন।" — (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৮৮৫; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২০৭৩)

শর্ত:

  1. পড়া শব্দগুলো কুরআন, আল্লাহর নাম বা বর্ণিত দুআ হতে হবে।
  2. বিশ্বাস থাকতে হবে যে, শিফা/উপকার আল্লাহর পক্ষ থেকে।
  3. পানি/তেল নিজে প্রভাবক নয়।

নাজায়েজ অবস্থা:

  • যদি পড়া শব্দ বোধগম্য না হয় বা শিরকি হয়।
  • যদি বিশ্বাস করা হয় যে, পানি/তেল নিজেই সমস্যা সমাধান করবে।
  • যদি এটি তদবীরের নামে আল্লাহর উপর ভরসা ছেড়ে দেওয়া হয়।

৪. নির্দিষ্ট পোশাকে ফুঁ দিয়ে সর্বদা পরিধান করা

এই প্রথার শরয়ী ভিত্তি নেই

ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই যে, নির্দিষ্ট কোনো পোশাকে ফুঁ দিয়ে তা সর্বদা পরিধান করতে হবে। এটি বিদআত (নতুন প্রথা) এবং তদবীর সংক্রান্ত কুসংস্কার

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ

"যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" — (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮)

আয়েশা রা. বলেন:

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

"যে ব্যক্তি এমন আমল করবে যার উপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।" — (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮)

কেন এটি নাজায়েজ

  1. বিদআত: রাসূল ﷺ বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এমন প্রথা প্রমাণিত নয়।
  2. তদবীরের বিশ্বাস: পোশাকের মাধ্যমে বিবাহ দ্রুত হবে—এটি আল্লাহর উপর ভরসার পরিপন্থী।
  3. কুসংস্কার: নির্দিষ্ট পোশাক সর্বদা পরিধান করা আবশ্যক মনে করা—এটি ইসলামে নেই।
  4. অপব্যয় ও কষ্ট: এটি মানুষের উপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা চাপায়।

ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. বলেন:

وَكُلُّ مَا لَمْ يَثْبُتْ فِي الشَّرْعِ فَهُوَ بِدْعَةٌ وَضَلَالَةٌ

"শরীয়তে যা প্রমাণিত নয়, তা বিদআত ও পথভ্রষ্টতা।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৬২)


৫. বিবাহ দ্রুত হওয়ার জন্য ইসলামি তদবীর

কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক পদ্ধতি

বিবাহ দ্রুত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো শরীয়তসম্মত:

১. দুআ করা:

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

"হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট থেকে যা কিছু কল্যাণ নাযিল হয়, তার মুখাপেক্ষী।" — (সূরা কাসাস: ২৪)

২. ইস্তিগফার ও তাওবা করা:

فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا ۝ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا ۝ وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ

"আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সাহায্য করবেন।" — (সূরা নূহ: ১০-১২)

৩. সূরা ইয়াসিন, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মুযাম্মিল ইত্যাদি নিয়মিত পড়া।

৪. দরুদ শরীফ বেশি পড়া।

৫. তাহাজ্জুদে দুআ করা।

৬. সদকা করা।

৭. আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

"যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" — (সূরা তালাক: ৩)

তদবীরের নামে যা নাজায়েজ

  • নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে গিয়ে বিশেষ ফুঁ/তদবীর নেওয়া।
  • নির্দিষ্ট পোশাক/তাবিজ সর্বদা বহন করা।
  • বিশ্বাস করা যে, এই তদবীর ছাড়া বিবাহ হবে না।
  • অমুসলিম পদ্ধতি বা মন্ত্র ব্যবহার করা।
  • কুরআনের আয়াত বিকৃত বা অপব্যবহার করা।

৬. সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া

| বিষয় | বিধান | |------|--------| | কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ঝাঁড়-ফুঁক | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে) | | বিবাহের উদ্দেশ্যে ঝাঁড়-ফুঁক নেওয়া | যদি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হয় এবং বিশ্বাস ঠিক থাকে, তবে জায়েজ; তবে এটি সুন্নাহ নয় | | ফুঁ দেওয়া পানি/তেল ব্যবহার | জায়েজ (শর্তসাপেক্ষে) | | নির্দিষ্ট পোশাকে ফুঁ দিয়ে সর্বদা পরিধান | নাজায়েজ, বিদআত | | তদবীরের বিশ্বাসে বিবাহ দ্রুত হবে | নাজায়েজ, শিরকি বিশ্বাসের দিকে নিয়ে যায় |

চূড়ান্ত ফতোয়া

১. বিবাহের উদ্দেশ্যে ঝাঁড়-ফুঁক নেওয়া: যদি কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হয় এবং বিশ্বাস ঠিক থাকে, তবে জায়েজ। তবে এটি সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়; বরং সাধারণ দুআর অন্তর্ভুক্ত। উত্তম হলো সরাসরি আল্লাহর কাছে দুআ করা।

২. ফুঁ দেওয়া পানি/তেল ব্যবহার: জায়েজ, যদি পড়া শব্দ কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক হয় এবং বিশ্বাস ঠিক থাকে।

৩. নির্দিষ্ট পোশাকে ফুঁ দিয়ে সর্বদা পরিধান: নাজায়েজ ও বিদআত। ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই।

৪. তদবীর সংক্রান্ত বিশ্বাস: যদি বিশ্বাস করা হয় যে, ঝাঁড়-ফুঁক/তদবীর নিজেই বিবাহ দ্রুত করবে, তবে তা শিরকি বিশ্বাস। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখা ফরজ।

৫. বিবাহ দ্রুত হওয়ার জন্য: কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক দুআ, ইস্তিগফার, দরুদ, সদকা ও তাহাজ্জুদে দুআ করা উচিত। আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকা মুমিনের কর্তব্য।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.