কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়া সম্পর্কে জানতে চাই।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বিবাহিত প্রায় ৬ বছর। বাচ্চা নেই। কারন প্রায় সাড়ে ৫ বছর আমি এমবিবিএস এ ছিলাম। তাই, একসাথে থাকা গত ৪/৫ মাস।
এখন মূলত, আমরা হাজবেন্ড ওয়াইফ যে যার বাসায় থাকি গত ১.৫ মাস ধরে। প্রথমত, কখনোই ভাবিনি, নিজেদের মধ্যে কোনরূপ ছাড়াছাড়ির ভাবনা আসবে, যেহেতু আমাদের হাজবেন্ড ওয়াইফ রিলেশন ভালো ছিল, প্রবলেম ছিলো আমার শ্বাশুড়ির দেওয়া মানসিক চাপ নিয়ে। এমন যে আমার নিজের রুম এর আলামরিও উনার একসেস ছিলো। অবাক হওয়ার মত সব আচরণ, উনার কথাবার্তা থেকে শুরু করে আমার খাওয়াদাওয়া, আমাদের হাসবান্ড ওয়াইফ এর ঘুরাঘুরি , ইভেন পার্সোনাল লাইফেও উনার মতের প্রাধান্য চাপিয়ে দিতে চাইত।নিজেকে খুব পরাধীন লাগত।
এই ১.৫ মাস আগে, আমরা (আমার স্বামীও) আমাদের রুম এ তালা দিয়ে ঘুরতে যাই, ২-৩ দিনের জন্য। কারণ ছিল, আমাদের রুম থেকে ক্রমাগত টাকা চুরি হওয়া ( যদিও এই কারণ, আজ পর্যন্ত আমরা দুজন প্রকাশ করিনি) ।
আমার স্বামী কারন বলেন, বেশিদিন বাইরে তাই। এনিয়ে উনি আমার আম্মু আব্বুক ইনভলভ করে হুলোস্ত করে ফেলেন।
আমি আসার পর একদিন কথা না বলা, একসাথে না খাওয়া এসব ট্রিটমেন্ট দেন। আমর হাজব্যান্ড এব্যাপারে উনাকে কনসোল করার কোনো স্টেপ নেননি।
এটা নিয়ে একদিন কথা বাড়ায়, আমি রাগ করে বাসা থেকে কান্না করে বের হয়ে যাই।
আমার হাজবেন্ড ও অমাকে হেল্প করেন, আমার বাসায় দিয়ে আসেন, মন ভালো জন্য।
তবে, আমি বাসায় আসার পর ধীরে ধীরে খেয়াল করলাম, আমার হাজবেন্ড এর রেসপন্স কমে যাচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম, পরিবারগত অশান্তি এবং দুটানা।
কিন্তু এমন পর্যায়ে যাচ্ছিল, আমি কল বা ম্যাসাজ দিলেই উনি তা রিসিভ করেন।
নিজ থেকে না কল, না ম্যাসাজ, না দেখা করার প্ল্যান, আমার বাসায় না আসা।
একদম উদ্যমহীন। আমার পরিবার ও এ নিয়ে অবাক হতো। যেহেতু, আমাদের রিলেশন ভালো ছিল।
এসব অমাকে ক্রমাগত কষ্ট দিত। জিজ্ঞাসা করলে কিছুই বলতনা, বেশি খুঁচালে সান্ত্বনা দিত আন্ড মাঝে মাঝে খুবই বিরক্ত হতো।
অমাকে নেওয়ার তেমন কোনো স্টেপ নিতো না । এসব ক্রমাগত অমাকে আরো ধৈর্যহীন করে তোলে। এমনকি উনাকে আমি বাইরে গিয়ে কোথাও থাকতেও বলি। এনিয়েও উনি দিন ঘুরাতো, লাস্ট এ আর যাওয়াই হইনি। দিন দিন নিজেকে বেহায়া, বাজে মেয়ে মনে হচ্ছিল এন্ড মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলাম।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আলাদা বাসায় থাকব, ফিতনাহ কম এর জন্য। কোনোভাবে ওই বাসায় যাবনা। এতে প্রথমত রাজি নাহলেও, নেক্সট এ রাজি হউন।
তবে উনার বাসায় এসব এর পর, অমাকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলে। উনি একেবারে সাইলেন্ট ভাইব দিচ্ছিলেন।
এদিকে অমিও বলি যে "অমাকে হয় আলাদা বাসায় নিয়ে থাকেন নাহয় ছেড়ে দিন, এতকিছুর পর আমি ওই বাসায় যাবনা! আর এভাবেও আপানেকে ছাড়া থাকতে পারছিনা। " উদ্দেশ্য এটাও ছিলো যেন উনার মাঝে এ নিয়ে যে অলসতা, উদ্যমহীনতা, গুরত্বহীনতা কাজ করছে, তা ঝেড়ে ফেলে সিরিয়াস হউন। Then, উনি ও ২বার বলেন, উনার বাসা থেকে আমার সব নিয়ে আসতে। শীঘ্রই ছেড়ে দিবেন, মুক্ত করে দিবেন।
মুখে কখনও যদিও তালাক বলেননি।
মাঝে অনেক খারাপ সময় যায়।
১ মাস অতিবাহিত হবার পর, শেষ পর্যন্ত, আমার কান্না- প্রেশার এ, বাসা শেষ পর্যন্ত নেওয়া হবে ডিসিসন নিলেও, উনি বারবার আজ না কাল, এভাবে ২ সপ্তাহ টানেন। আজ ভালো, কাল খুবই বিরক্ত, অজুহাত।
ইভেন আমার রুম এর বিছানা পত্র থেকে শুরু করে সব ছেড়ে আলাদা হতেই আমি রাজি হয়, উনার বাসা থেকে নিষেধ দেওয়ায়।
অধৈর্য হয়ে আমি ডাইরেক্ট উনার সাথে দেখা করে বলি, তালাক দিতে। সত্যি বলতে, ওইদিন মনে হচ্ছিল, আজীবন এভাবে সাফার করতে হবে, এভাবে আমার প্রতি উদাসিনহীনতায়, মা- বাবা থেকে আলাদা করে দিয়েছি এই তকমা পেতে হবে আজীবন, অমাকে উনি খারাপ ভাবে দেখবেন etc।
ওইদিন উনি বলেন, তুমি ডিভোর্স পেপার আনলে, আমি সাইন করব।
আমি বলছিলাম, শরিয়তে আমার সে অধিকার নেই (যদিও আমার কাবিন নামায় অমাকে অধিকার দেয়া হয়েছে)।
এভাবে কথা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে উনি বলেন,
" আজ থেকে যা ছিলো আমার মনে, আল্লাহ জানেন কি ছিল, সব শেষ। " আমি আর বলি, ভবিষ্যৎ টেন্স এ তালাক হয়না। উনি বলছেন " বর্তমানেই দিছি"।
১. এসব কথাতে কি তালক হয়ে গেছে?
নিয়তের ব্যাপারটা নিশ্চিত না! কারন, তখন রাগের মাথায় মনে হচ্ছে নিয়ত ছিলো। যদি নিয়ত থাকে/ না থাকে, তাহলে কি হুকুম?
২. তালাক নাহলে,
বিবাহিত জীবন যে পর্যায়ে গেছে, উনার ফ্যামিলি অমাকে তালাক দিতে বলে, উনার বরাবর তাচ্ছিলতা, ২ফ্যামিলির কাছে পরস্পর সম্মান বিলীন হয়ে যাওয়া,
আমার বিবাহিত লাইফে কন্টিনিউ করার ব্যাপারে যদি উপদেশ দিতেন।
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর
ভূমিকা
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নে উল্লেখ আছেঃ- উনি বলেন, " আজ থেকে যা ছিলো আমার মনে, আল্লাহ জানেন কি ছিল, সব শেষ। " আমি আর বলি, ভবিষ্যৎ টেন্স এ তালাক হয়না। উনি বলছেন " বর্তমানেই দিছি"।
এ কথাটি যদি আপনার স্বামী তালাকের নিয়তে বলে থাকে,সেক্ষেত্রে এক তালাকে বায়েন পতিত হয়েছে। পুনরায় ঘর সংসার করতে চাইলে নতুন করে বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।
আর যদি উক্ত বাক্য বলার সময় আপনার স্বামীর তালাকের কোন নিয়ত না থাকে, সেক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে না। আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আগের মতই বহাল রয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আপনারা নিশ্চিন্ত মনে ঘর সংসার চালিয়ে যেতে পারেন।
— মুফতি তাকী উসমানী রহ. বলেন:
"কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। নিয়ত ছাড়া কিনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না।"
কিছু পরামর্শঃ-
১. ধৈর্য ও সংযম অবলম্বন করুন
আল-কুরআন (সূরা আন-নিসা: ১৯): "وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ" "তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"
সূরা আর-রূম: ২১: "وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً" "তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।"
বিবাহিত জীবনে ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাগের মুহূর্তে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
২. পারিবারিক হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ
শ্বাশুড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ আপনার সংসারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শরীয়তে শ্বাশুড়ির প্রতি সম্মান রাখা কর্তব্য, তবে স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।
হাদীস (তিরমিযী: ১১৬৩): "أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ" "পূর্ণ ঈমানদার সেই, যার চরিত্র সর্বোত্তম; এবং তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম।"
স্বামীর উচিত স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানো এবং পরিবারের অযাচিত হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা। তবে স্ত্রীরও উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো।
৩. আলাদা বাসা — শরয়ী দৃষ্টিকোণ
আলাদা বাসায় থাকা শরীয়তে নিষিদ্ধ নয়, বরং অনেক সময় ফিতনা কমাতে সহায়ক। তবে এটি স্বামীর সামর্থ্য ও সম্মতির উপর নির্ভরশীল।
ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩৪০) — উল্লেখ আছে: "যদি স্ত্রীর জন্য শ্বশুরালয়ে থাকা কষ্টদায়ক হয় এবং স্বামী সামর্থ্য রাখে, তবে আলাদা বাসা নেওয়া জায়েয।"
আপনার স্বামী যদি আলাদা বাসার জন্য রাজি হন, তবে তা ফিতনা কমাতে সহায়ক হবে। তবে জোরাজুরি নয়, বরং ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান খুঁজুন।
৪. পারস্পরিক সম্মান রক্ষা
দুই পরিবারের মধ্যে সম্মান বিনষ্ট হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ইসলামে পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
হাদীস (বুখারী: ৫৯৮৭): "مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ" "যে আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।"
উভয় পরিবারের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার চেষ্টা করুন। সরাসরি confrontation এড়িয়ে চলুন।
৫. সরাসরি তালাকের দাবি পরিহার করুন
আপনি নিজেই তালাক দিতে বলেছেন — এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে কাম্য নয়। তালাক শেষ অবলম্বন।
হাদীস (আবু দাউদ: ২১৭৮): "أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ" "আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বিষয় হলো তালাক।"
তালাকের দাবি করার পরিবর্তে সমাধানের পথ খুঁজুন।
৬. পরামর্শ ও মধ্যস্থতা
আল-কুরআন (সূরা আন-নিসা: ৩৫): "وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِّنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِّنْ أَهْلِهَا" "যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে এক বিচারক তার পরিবার থেকে এবং এক বিচারক তার পরিবার থেকে নিয়োগ করো।"
উভয় পরিবারের সম্মানিত ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করান। সরাসরি দুই পরিবারের confrontation এড়িয়ে চলুন।
৭. স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা
স্বামীর সাথে শান্ত পরিবেশে বসে খোলামেলা কথা বলুন। তার অনুভূতি, চাপ ও সমস্যাগুলো শুনুন। তাকে বুঝান যে আপনি তার পাশে আছেন, কিন্তু শ্বাশুড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলছে।
৮. ধৈর্য ও দুআ
আল-কুরআন (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩): "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ" "হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।"
আল্লাহর কাছে দুআ করুন: "রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউন" (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)।