মনের চিন্তার কারণে ঈমানহারা হওয়া যায় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
উস্তাজ মনের চিন্তার কারণে কি কেউ ঈমানহারা হয়ে যেতে পারে আল্লহ মাফ করুন? আমার খুব ভয় হয় কারণ হঠাৎ করে মনে একটা উলটাপালটা চিন্তা চলে আসে। তখন আমি ইস্তেগফার করে সাথে সাথে কালেমা পড় কিন্তু খুবই অশান্তি হয় যে কেনো এমন চিন্তা আসলো মাথায়। আমি কি করতে পারি যাতে ঈমানহারা না হই?
Answer
মনের চিন্তার কারণে ঈমানহারা হওয়ার বিষয়ে ফতোয়া
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের মূল উত্তর হলো: শুধু মনের ভেতরে উলটাপালটা চিন্তা আসলে বা মনে খারাপ কিছু উদয় হলে ঈমান চলে যায় না, যতক্ষণ না আপনি সেই চিন্তাকে মুখে উচ্চারণ করেন বা অন্তরে তা বিশ্বাস ও সমর্থন করেন। হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে যে, শয়তানের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) যতক্ষণ অন্তরে স্থির না হয়, ততক্ষণ তা ঈমানের ক্ষতি করে না।
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ ۖ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ
"আর আমি তো মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার অন্তর যা কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গলার শিরার চেয়েও নিকটে।" (সূরা কাফ: ১৬)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, অন্তরে ওয়াসওয়াসা আসা স্বাভাবিক; আল্লাহ তা জানেন এবং বান্দাকে এর জন্য দায়ী করেন না, যতক্ষণ না সে তা গ্রহণ করে।
হাদিসের দলিল
১. সাহাবিদের ওয়াসওয়াসার অভিযোগ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, কিছু সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এসে বললেন:
إِنَّا نَجِدُ فِي أَنْفُسِنَا مَا يَتَعَاظَمُ أَحَدُنَا أَنْ يَتَكَلَّمَ بِهِ
"আমরা আমাদের অন্তরে এমন কিছু পাই, যা মুখে উচ্চারণ করতে আমরা ভয় পাই।"
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন:
أَوَقَدْ وَجَدْتُمُوهُ؟ قَالُوا: نَعَمْ، قَالَ: ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
"তোমরা কি তা পেয়েছ? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: এটাই তো খাঁটি ঈমানের প্রমাণ।" (সহীহ মুসলিম: ১৩২)
অর্থাৎ, শয়তানের কুমন্ত্রণা আসা এবং তা অপছন্দ করা — এটাই ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ।
২. ওয়াসওয়াসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
يَأْتِي الشَّيْطَانُ أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ
"শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে: কে সৃষ্টি করেছে এই? কে সৃষ্টি করেছে ওই? এমনকি বলে: তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছে? যখন সে এই পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে যেন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং বিরত হয়।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪)
৩. ওয়াসওয়াসার ক্ষেত্রে করণীয়
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন:
لَا يَزَالُ النَّاسُ يَتَسَاءَلُونَ حَتَّى يُقَالَ: هَذَا خَلَقَ اللَّهُ الْخَلْقَ، فَمَنْ خَلَقَ اللَّهَ؟ فَمَنْ وَجَدَ ذَلِكَ فَلْيَقُلْ: آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ
"মানুষ প্রশ্ন করতে থাকবে, এমনকি বলা হবে: আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন সবকিছু, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে? যে ব্যক্তি এমন কিছু পায়, সে যেন বলে: آمَنْتُ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ (আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের প্রতি ঈমান আনলাম)।" (সহীহ মুসলিম: ১৩৪)
হানাফি ফিকহের দলিল
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহঃ) বলেন:
الْوَسْوَسَةُ لَا تُؤَثِّرُ فِي الْإِيمَانِ مَا لَمْ تَسْتَقِرَّ فِي الْقَلْبِ، فَإِنَّ الْخَطِرَاتِ الْقَلْبِيَّةَ لَا مُؤَاخَذَةَ عَلَيْهَا
"ওয়াসওয়াসা ঈমানের উপর প্রভাব ফেলে না, যতক্ষণ না তা অন্তরে স্থির হয়। কারণ অন্তরের খটকা (খাতিরাত) এর উপর কোনো পাকড়াও নেই।" (রাদ্দুল মুহতার: ১/১১৪)
ইমাম তাহতাবি (রহঃ) বলেন:
الْخَطِرَاتُ الْقَلْبِيَّةُ وَالْوَسَاوِسُ الشَّيْطَانِيَّةُ لَا تَقْدَحُ فِي الْإِيمَانِ، بَلْ هِيَ دَلِيلٌ عَلَى صِحَّةِ الْإِيمَانِ
"অন্তরের খটকা ও শয়তানি কুমন্ত্রণা ঈমানে দোষ সৃষ্টি করে না; বরং তা ঈমানের সুস্থতার প্রমাণ।"
মুফতি তাকি উসমানি (দাঃবাঃ) বলেন:
"ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) ঈমান ভঙ্গের কারণ নয়। কারণ ঈমান হলো অন্তরের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকৃতি। শুধু মনের ভেতরে খারাপ চিন্তা আসা — এটি ইচ্ছাকৃত বিশ্বাস নয়, বরং শয়তানের প্ররোচনা।" (ফতোয়ায়ে উসমানি: ১/১৩২)
আপনার জন্য করণীয়
১. ভয় পাবেন না — এই ভয়টাই শয়তানের হাতিয়ার। সে চায় আপনি অশান্তিতে ভুগুন।
২. ইস্তেগফার ও কালেমা পড়া চালিয়ে যান — আপনি যা করছেন তা-ই সঠিক। তবে মনে রাখবেন, এটা ঈমান বাঁচানোর জন্য নয়, বরং শয়তানকে বিতাড়িত করার জন্য।
৩. "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন — যখনই খারাপ চিন্তা আসে।
৪. "আমানতু বিল্লাহি ওয়া রুসুলিহি" বলুন — হাদিসে এসেছে।
৫. চিন্তাটিকে গুরুত্ব দেবেন না — যত বেশি ভাববেন, তত বেশি আসবে। এড়িয়ে যান, অন্য কাজে মনোযোগ দিন।
৬. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির করুন — অন্তর প্রশান্ত হবে।
৭. ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল পড়ুন — শয়তান থেকে হেফাজতের জন্য।
৮. যদি খুব বেশি কষ্ট হয়, কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
মূল কথা
মনে উলটাপালটা চিন্তা আসা ঈমানহারা হওয়ার কারণ নয়। বরং তা ঈমানের দৃঢ়তার প্রমাণ, কারণ আপনি তা অপছন্দ করছেন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছেন। শয়তান যখন আপনার ঈমান নষ্ট করতে পারে না, তখন সে ভয় দেখিয়ে অশান্ত করে। আপনি দৃঢ় থাকুন, ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান নিরাপদ থাকবে।
والله أعلم بالصواب