দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়া, নামাজে অলসতা, কুরআন-যিকিরে সুকুন না পাওয়া, অন্তরে মোহর বসে যাওয়ার ভয় সম্পর্কে জানতে চাই।
Faith and Belief · Hanafi
Question
লাস্ট কবে ভালো মতো নামাজ পড়সি তাই ভুলে গেছি (যোহর এর শুধু ৪ রাকাত ফরজ নামাজ পড়ি, বাকি সুন্নাত নামাজ আর পড়িনা অনেকদিন), কুরআন পড়লেও আর শান্তি পাইনা। যিকির এ শান্তি পাইনা। আমি বুঝতে পারছি আমি ধীরে ধীরে হিদায়াত হারিয়ে ফেলসি, দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত! সবকিছু বুঝতে পেরেও কোনোভাবেই এর সমাধান আমি পাইনা। এখন দ্বীন কেই আমার কাছে বোঝা লাগে, ইসলাম কে বোঝা মনে হয়। আল্লাহ তাআলার কাছে ভালো মতো দোয়া করতে পারিনা অনেকদিন। তাহলে কি আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে মোহর বসিয়ে দিসেন?
এভাবে চলতে থাকলে আমি একসময় বেদ্বীন হয়ে যাবো, ইসলাম আমার কাছে অপছন্দণীয় হয়ে যাবে!
আমি এই বিষয় গুলো কাউকে শেয়ার করতে পারিনা (শেয়ার করার ই কেউ নাই), এই বিষয় এ আমাকে কিছু পরামর্শ দিন মিন ফাদলিক!
(এক বোন উত্তর জানতে চেয়েছেন)
Answer
প্রশ্নের উত্তর: দ্বীন থেকে দূরে সরে যাওয়া ও হিদায়াত হারানোর ভয়
ভূমিকা: এটি একটি আধ্যাত্মিক সংকট, ঈমান হারানোর লক্ষণ নয়
প্রিয় বোন, আপনি যে অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন — নামাজে অলসতা, কুরআন-যিকিরে সুকুন না পাওয়া, দ্বীনকে বোঝা মনে হওয়া — এটি কোনো নতুন সমস্যা নয়। ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য নেককার মানুষ এই অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন। একে আরবিতে বলা হয় "ফাতরাত" (আধ্যাত্মিক শুষ্কতা বা বিরতি)। এটি ঈমান হারানোর চূড়ান্ত লক্ষণ নয়, বরং এটি একটি পরীক্ষা ও পরিশুদ্ধির সময়।
১. আপনার অন্তরে মোহর বসে গেছে কি? — এ ভয়ের উত্তর
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন: "তাহলে কি আল্লাহ তাআলা আমার অন্তরে মোহর বসিয়ে দিসেন?"
উত্তর: না, ইনশাআল্লাহ নয়। কারণ—
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا "যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ দেখাব।" — (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
আপনি এখনো চিন্তিত, এখনো সমাধান খুঁজছেন, এখনো দ্বীন হারানোর ভয় পাচ্ছেন — এই ভয়টাই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমানের নূর এখনো জীবিত আছে। মৃত অন্তর দ্বীনের কথা ভেবে ভয় পায় না। যে অন্তরে মোহর বসে যায়, সে আর চিন্তিত হয় না, অনুশোচনা করে না।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন: "ঈমানের আলামতগুলোর মধ্যে একটি হলো — গুনাহের পর অনুশোচনা ও ভয়।"
২. কেন এই অবস্থা হয়? — কারণগুলো বুঝুন
(ক) সুন্নাত নামাজ ছেড়ে দেওয়া
আপনি লিখেছেন — যোহরের শুধু ৪ রাকাত ফরজ পড়েন, সুন্নাত পড়েন না। এটিই আপনার আধ্যাত্মিক শুষ্কতার একটি বড় কারণ।
হাদিসে এসেছে:
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلَاةُ... فَإِنْ نَقَصَتْ قَالَ: انْظُرُوا هَلْ لَهُ مِنْ تَطَوُّعٍ يُكَمِّلُ بِهَا فَرِيضَتَهُ "কিয়ামতের দিন বান্দার প্রথম হিসাব হবে নামাজের... যদি ফরজে ঘাটতি থাকে, আল্লাহ বলবেন: দেখো, তার কোনো নফল আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা হবে।" — (সুনানে তিরমিজি: ৪১৩, সুনানে আবু দাউদ: ৮৬৪)
সুন্নাত ও নফল নামাজ হলো ফরজের ঘাটতি পূরণের মাধ্যম এবং অন্তরের নূর। এটি ছেড়ে দিলে অন্তর কঠিন হয়ে যায়।
(খ) কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগ কমে যাওয়া
কুরআন শুধু পড়লেই হয় না, বুঝে পড়া ও তার ওপর আমল করা প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন:
أَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلٰى قُلُوْبٍ اَقْفَالُهَا "তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা পড়ে আছে?" — (সূরা মুহাম্মাদ: ২৪)
(গ) গুনাহের প্রভাব
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব "আদ-দাউ ওয়াদ-দাওয়া" -তে বলেন: "গুনাহ হলো অন্তরের রোগ। প্রতিটি গুনাহ অন্তরে একটি কালো দাগ ফেলে। দাগ বাড়তে থাকলে পুরো অন্তর কালো হয়ে যায়।"
ফকিহগণ বলেন: "গুনাহ হলো ঈমানের চোর।" — এটি চুপচাপ ঈমানের নূর চুরি করে নেয়।
৩. সমাধান: করণীয় আমলসমূহ
(ক) তাওবা করুন — এখনই, এই মুহূর্তে
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِيْنَ اَسْرَفُوْا عَلٰى اَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوْا مِنْ رَّحْمَةِ اللّٰهِ ۗ اِنَّ اللّٰهَ يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ جَمِيْعًا ۗ اِنَّهٗ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ "বলুন: হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন।" — (সূরা যুমার: ৫৩)
তাওবার শর্ত তিনটি:
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়া
- গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া
- আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা
(খ) ফরজ নামাজ সময়মতো আদায় করুন — এটাই প্রথম ধাপ
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا "আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো নামাজ সময়মতো আদায় করা।" — (সহিহ বুখারি: ৫২৭, সহিহ মুসলিম: ৮৫)
পরামর্শ: প্রথমে শুধু ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ সময়মতো পড়ার লক্ষ্য রাখুন। জামাতে সম্ভব হলে জামাতে। এরপর ধীরে ধীরে সুন্নাত যোগ করুন — একবারে সব নয়, ধীরে ধীরে।
(গ) সুন্নাত নামাজ পুনরায় শুরু করুন — অন্তত ২ রাকাত
বাহিশতী জেওর -এ হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) লিখেছেন: "ফরজের পর সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ছেড়ে দেওয়া মাকরূহ তাহরিমি।"
শুরু করুন এভাবে:
- যোহরের ৪ রাকাত ফরজের পর ২ রাকাত সুন্নাত (আগে ৪+২+২)
- মাগরিবের পর ২ রাকাত সুন্নাত
- এশার পর ২ রাকাত সুন্নাত + বিতর
(ঘ) কুরআন বুঝে পড়ুন — আরবি না জানলে বাংলা অনুবাদসহ
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) তাঁর মা'আরিফুল কুরআন -এ লিখেছেন: "কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো — আল্লাহর কালাম বুঝে তার ওপর আমল করা। শুধু আরবি পড়ে না বুঝলে অন্তরে প্রভাব কম হয়।"
পরামর্শ: প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট বাংলা অনুবাদসহ কুরআন পড়ুন। মা'আরিফুল কুরআন বা তাফসীরে উসমানী থেকে।
(ঙ) যিকিরের জন্য সহজ আমল
সকাল-সন্ধ্যার যিকির:
- সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার
- আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার
- আল্লাহু আকবার ৩৪ বার
- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বেশি বেশি
- আস্তাগফিরুল্লাহ বেশি বেশি
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ مِائَةَ مَرَّةٍ حُطَّتْ خَطَايَاهُ "যে ব্যক্তি ১০০ বার 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলবে, তার গুনাহসমূহ মুছে দেওয়া হবে।" — (সহিহ বুখারি: ৬৪০৫)
(চ) দোয়া করতে না পারলে যা করবেন
আপনি লিখেছেন — "আল্লাহর কাছে ভালো মতো দোয়া করতে পারি না।" এটি শয়তানের ধোঁকা। দোয়ার জন্য বিশেষ ভাষা লাগে না। সহজভাবে বলুন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِيْنِكَ "হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।" — (সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২)
এই দোয়াটি রাসূলুল্লাহ ﷺ বেশি বেশি পড়তেন।
(ছ) নেক সঙ্গী খুঁজুন
আপনি লিখেছেন — "শেয়ার করার কেউ নাই।" এটি একটি বড় সমস্যা। ইসলামে নেক সঙ্গীর গুরুত্ব অপরিসীম।
আল্লাহ বলেন:
وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدٰوةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَهٗ "আপনি নিজেকে তাদের সাথে রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে।" — (সূরা কাহফ: ২৮)
পরামর্শ: কোনো নেক মহিলার সাথে বন্ধুত্ব করুন, যিনি দ্বীনের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন। অথবা অনলাইনে নির্ভরযোগ্য ইসলামিক গ্রুপে যুক্ত হোন।
(জ) ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করুন
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
أَحَبُّ الْأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ "আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো — যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" — (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪, সহিহ মুসলিম: ৭৮৩)
পরামর্শ: প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত ফরজ + ২ রাকাত সুন্নাত + ৫ মিনিট কুরআন + ৫ মিনিট যিকির — এই রুটিন দিয়ে শুরু করুন। বাড়াবেন না, যতক্ষণ না এটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
(ক) নিরাশ হবেন না
اِنَّهٗ لَا يَيْـئَسُ مِنْ رَّوْحِ اللّٰهِ اِلَّا الْقَوْمُ الْكٰفِرُوْنَ "নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফির সম্প্রদায়ই নিরাশ হয়।" — (সূরা ইউসুফ: ৮৭)
(খ) শয়তানের ধোঁকা চিনুন
শয়তান আপনাকে বলছে: "তুমি আর ভালো হতে পারবে না, তোমার অন্তরে মোহর বসে গেছে।" এটি শয়তানের সবচেয়ে বড় ধোঁকা। সে চায় আপনি হাল ছেড়ে দিন।
(গ) দ্বীনকে বোঝা মনে হওয়ার কারণ
দ্বীন বোঝা মনে হয় তখনই, যখন আমরা আল্লাহর জন্য নয়, নিজের জন্য দ্বীন পালন করি। যখন আমরা বুঝি — দ্বীন পালন করলে আল্লাহ খুশি হন, এবং এটাই আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য — তখন তা বোঝা মনে হয় না।
আল্লাহ বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ "আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" — (সূরা যারিয়াত: ৫৬)
৫. বিশেষ পরামর্শ: একজন আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন
আপনার অবস্থা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আপনি নিজে থেকে বের হতে না পারেন, তাহলে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমা বা মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন। অনেকে এ ধরনের আধ্যাত্মিক সংকটে আধ্যাত্মিক চিকিৎসা (রুহানি ইলাজ) -এর পরামর্শ দেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর "মাদারিজুস সালিকীন" -এ লিখেছেন: "আত্মার রোগের চিকিৎসা দেহের রোগের চিকিৎসার মতোই — রোগ নির্ণয়, ঔষধ, এবং ধৈর্য প্রয়োজন।"
সারসংক্ষেপ: ৭টি করণীয়
| ক্রম | আমল | সময় | |------|------|------| | ১ | তাওবা করুন (খাঁটি অনুশোচনা) | এখনই | | ২ | ৫ ওয়াক্ত ফরজ সময়মতো | প্রতিদিন | | ৩ | ২ রাকাত সুন্নাত যোগ করুন | ধীরে ধীরে | | ৪ | ৫ মিনিট কুরআন (অনুবাদসহ) | প্রতিদিন | | ৫ | সকাল-সন্ধ্যার যিকির | প্রতিদিন | | ৬ | দোয়া: ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব | বেশি বেশি | | ৭ | নেক সঙ্গী খুঁজুন | চলমান |
শেষ কথা
প্রিয় বোন, আপনি এখনো হারিয়ে যাননি। আপনার ভয়, আপনার চিন্তা, আপনার প্রশ্ন — এগুলোই প্রমাণ যে আপনার অন্তরে ঈমানের বীজ এখনো জীবিত। শুধু পানি দরকার। আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে তাওবা করে ফরজ নামাজে ফিরে আসুন। আল্লাহ তাআলা আপনার অন্তরকে নূর দিয়ে ভরে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ اِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً ۚ اِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَّابُ "হে আমাদের রব! আমাদের অন্তরকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন, আপনি হিদায়াত দেওয়ার পর। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।" — (সূরা আলে ইমরান: ৮)