মুখের মোচ (গোঁফ) ডুবিয়ে পানি খাওয়া কি হারাম?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
মুচ (মুখের মোচ) ডিজে পানি খাওয়া এবং খাবারে লাগা অংশের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
১. মুখের মোচ (গোঁফ) ডুবিয়ে পানি খাওয়া কি হারাম? ২. মোচের সাথে কোনো খাবার লাগলে সেই লাগা অংশ কি হারাম হবে? ৩. মোচ (মুখের মোচ) সম্পর্কে হাদিসে কী বলা আছে?
১. মোচ ডুবিয়ে পানি খাওয়া কি হারাম?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, মোচ ডুবিয়ে পানি খাওয়া হারাম নয়। এটি হারাম বা নাজায়েজ কিছু নয়; বরং এটি একটি স্বাভাবিক কাজ। তবে সুন্নতের দৃষ্টিতে কিছু বিবেচনা রয়েছে।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ক) মূলনীতি: ইসলামে কোনো বস্তু মূলত হালাল হলে তা ভিন্নভাবে খাওয়ার কারণে হারাম হয়ে যায় না, যদি না তা সরাসরি নিষিদ্ধ হয়। পানি খাওয়া হালাল, আর মোচ ডুবিয়ে খাওয়া শরিয়তে নিষিদ্ধ কোনো কাজ নয়।
খ) হাদিসের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ ﷺ পানি পান করার সময় তিন শ্বাসে পান করতে বলেছেন এবং নিঃশ্বাস পাত্রের ভেতরে ফেলতে নিষেধ করেছেন।
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ كَانَ يَتَعَوَّذُ مِنْ جَهْدِ الْبَلاَءِ، وَدَرَكِ الشَّقَاءِ، وَسُوءِ الْقَضَاءِ، وَشَمَاتَةِ الأَعْدَاءِ
— সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৩৪৭
পানি পান সম্পর্কে রাসূল ﷺ বলেছেন:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَشْرَبُوا وَاحِدًا كَشُرْبِ الْبَعِيرِ، وَلَكِنِ اشْرَبُوا مَثْنَى وَثُلَاثَ، وَسَمُّوا إِذَا أَنْتُمْ شَرِبْتُمْ، وَاحْمَدُوا إِذَا أَنْتُمْ رَفَعْتُمْ»
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৮৮৫ (হাসান)
এখানে পানি পান করার আদব বর্ণিত হয়েছে — তিন শ্বাসে পান করা, শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা, শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা। মোচ ডুবিয়ে খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো দলিল নেই।
গ) ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, খাওয়া-পানাহার সংক্রান্ত বিষয়ে মূলনীতি হলো ইবাহা (অনুমতি)। যা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়, তা হালাল।
الأصل في الأشياء الإباحة حتى يقوم دليل الحرمة
— (মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, অনুচ্ছেদ ৩৯; রাদ্দুল মুহতার, ৬/৩৪০-এর মূলনীতি)
সিদ্ধান্ত: মোচ ডুবিয়ে পানি খাওয়া হারাম নয়, মাকরুহও নয়। এটি জায়েজ। তবে সুন্নত হলো তিন শ্বাসে পান করা এবং পাত্রে নিঃশ্বাস না ফেলা।
২. মোচের সাথে খাবার লাগলে সেই অংশ হারাম হবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, মোচের সাথে খাবার লাগলে সেই অংশ হারাম হবে না। কারণ মোচ নিজে নাপাক (নাজিস) নয়, বরং তা মানুষের শরীরের একটি স্বাভাবিক অংশ।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ক) মূলনীতি: মানুষের শরীরের চুল, নখ, লালা — এসব মূলত পাক (তাহির)। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেছেন:
وَشَعْرُ الْإِنْسَانِ وَظُفْرُهُ طَاهِرٌ
— (রাদ্দুল মুহতার, ১/২০৭)
অর্থাৎ মানুষের চুল ও নখ পাক। মোচও চুলের অন্তর্ভুক্ত, তাই তা পাক।
খ) খাবারে লাগা অংশ: যদি মোচের সাথে খাবার লেগে যায়, তবে সেই খাবার হারাম হয় না। কারণ মোচ পাক, আর পাক বস্তুর সংস্পর্শে খাবার নাজিস হয় না। হ্যাঁ, যদি মুখে খাবারের টুকরা লেগে থাকে এবং তা মুখ থেকে বের করে আবার খাওয়া হয়, তবুও তা হারাম নয় — বরং তা মাকরুহ হতে পারে শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে।
গ) হাদিসের দৃষ্টান্ত: রাসূল ﷺ নিজে খাবার খাওয়ার সময় মোচ ও দাঁড়ি থেকে খাবার পরিষ্কার করতেন, কিন্তু তা হারাম বলেছেন বলে কোনো দলিল নেই।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا وُضِعَ الْعَشَاءُ وَأُقِيمَتِ الصَّلَاةُ فَابْدَءُوا بِالْعَشَاءِ»
— সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৭২
সিদ্ধান্ত: মোচের সাথে লাগা খাবার হারাম নয়, হালাল। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সুন্নত, তাই খাওয়ার পর মোচ পরিষ্কার করা উত্তম।
৩. মোচ (মুখের মোচ) সম্পর্কে হাদিসে কী বলা আছে?
ক) মোচ কাটা/ছোট করার নির্দেশ:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ، وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ»
— সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৮৯২; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯
অর্থ: "মুশরিকদের বিরোধিতা করো — দাঁড়ি লম্বা করো এবং মোচ (গোঁফ) কেটে ছোট করো।"
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «جُزُّوا الشَّوَارِبَ، وَأَرْخُوا اللِّحَى»
— সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৬০
অর্থ: "মোচ কাটো এবং দাঁড়ি লম্বা করো।"
খ) মোচ না কাটার ব্যাপারে সতর্কতা:
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ لَمْ يَأْخُذْ مِنْ شَارِبِهِ فَلَيْسَ مِنَّا»
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৭৬১ (হাসান সহীহ)
অর্থ: "যে ব্যক্তি তার মোচ (গোঁফ) কাটে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।"
গ) ফিকহি ব্যাখ্যা (হানাফি মাযহাব):
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেছেন:
وَالسُّنَّةُ فِي الشَّارِبِ أَنْ يُقَصَّ حَتَّى يَبْدُوَ الْإِطَارُ، وَهُوَ مَا بَيْنَ الشَّارِبِ وَالشَّفَةِ
— (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪০৭)
অর্থাৎ সুন্নত হলো মোচ এতটুকু ছোট করা যাতে ঠোঁটের উপরের সীমানা (ইতার) প্রকাশ পায়। সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা বা একেবারে লম্বা রাখা — দুটোই সুন্নতের খিলাফ।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে উল্লেখ করেছেন যে, মোচ ছোট রাখা সুন্নত, আর তা না কাটা মাকরুহ তাহরিমি।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | মোচ ডুবিয়ে পানি খাওয়া হারাম? | না, জায়েজ | | মোচের সাথে লাগা খাবার হারাম? | না, হালাল | | মোচ সম্পর্কে হাদিস? | মোচ কাটা/ছোট করা সুন্নত, না কাটা নিষিদ্ধ | | মোচ পাক না নাপাক? | পাক (তাহির) |
তথ্যসূত্র
- সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৮৯২, ৬৩৪৭, ৬৭২
- সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯, ২৬০
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৮৮৫, ২৭৬১
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ১/২০৭, ৬/৪০৭
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ, অনুচ্ছেদ ৩৯
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
মূল কথা: মোচ ডুবিয়ে পানি খাওয়া বা মোচের সাথে লাগা খাবার — কোনোটিই হারাম নয়। তবে মোচ ছোট রাখা সুন্নত এবং তা না কাটা নিষিদ্ধ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।