ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সুদের টাকা দিয়ে আয়কর দেয়া যাবে কিনা?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 5512
Questioner: MD TUHIN SARKER
Question Asked: 15 Sep 2026, 07:10 PM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 07:35 PM
Views: 17
Tokens: 4,580
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটি কোম্পানিতে চাকরি করি এবং আমার স্যালারি একাউন্ট সিটি ব্যাংকে ( সেভিংস একাউন্ট)। কোম্পানি প্রতিবছর প্রফিটের একটা অংশ তিন ভাগ করে একভাগ কোম্পানি একাউন্টে(যেটা চাকরি ছাড়ার সময় একবারে দেয়ার জন্য জমা রাখে) এবং দুইভাগ স্যালারি একাউন্ট দিয়ে থাকে।প্রতিবছর কোম্পানি একাউন্টে জমা সেই টাকার সুদ স্যালারি একাউন্টে জমা হয়।আমার প্রশ্ন এই প্রাপ্ত সুদের টাকা দিয়ে আয়কর দেয়া যাবে কিনা?

Answer

ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সুদের টাকা দিয়ে আয়কর দেওয়া যাবে কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, ব্যাংকের সুদের টাকা দিয়ে আয়কর দেওয়া জায়েয নয়। কারণ সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম ও নাপাক সম্পদ। হারাম মাল দিয়ে ইবাদত বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়। তবে সুদের টাকা সরাসরি নিজের মালিকানায় না রেখে, বিনা নিয়তে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে সদকা করে দেওয়া জায়েয — এতে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, কিন্তু সওয়াব পাওয়া যায় না।


বিস্তারিত আলোচনা

১. সুদ সম্পূর্ণ হারাম — কুরআনের দলিল

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)

২. হাদিসের দলিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, সুদের লেখক ও সাক্ষী — সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন:

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়ালে, সুদ খাওয়ালে, সুদের লেখক ও তার দুই সাক্ষীকে অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান (গুনাহগার)।" — (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮; সুনানে আবু দাউদ: ৩৩৩৩)

৩. সুদের মাল নাপাক — হানাফি ফিকহের মূলনীতি

হানাফি মাযহাবের প্রখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)-এ উল্লেখ আছে:

"সুদ হলো খবিস (নাপাক) মাল। তা ভক্ষণ করা, দান করা বা কোনো কাজে লাগানো জায়েয নয়; বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা বিনা নিয়তে ফেলে দেওয়া ওয়াজিব।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৮-১৭০, কিতাবুল বাইউ)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

"সুদ গ্রহণ করা জায়েয নয়; আর যদি কেউ তা গ্রহণ করে ফেলে, তবে তার উচিত বিনা সওয়াবের নিয়তে তা গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ২২৭)

৪. হারাম মাল দিয়ে আয়কর দেওয়ার বিধান

আয়কর দেওয়া একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যা বৈধ উপার্জন থেকে আদায় করতে হয়। কিন্তু সুদের টাকা হারাম ও নাপাক। হারাম মাল দিয়ে কোনো ইবাদত বা বৈধ দায়িত্ব আদায় করা যায় না। যেমন:

  • হারাম মাল দিয়ে নামাজ পড়া যায় না (কাপড় নাপাক হলে নামাজ হয় না)।
  • হারাম মাল দিয়ে যাকাত দেওয়া যায় না।
  • হারাম মাল দিয়ে কুরবানি করা যায় না।

অনুরূপভাবে হারাম সুদের টাকা দিয়ে আয়কর দেওয়াও জায়েয নয়। কারণ আয়কর দেওয়া একটি শরীয়তসম্মত দায়িত্ব, যা পবিত্র উপার্জন থেকে আদায় করতে হবে।

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে বলেন:

"সুদের টাকা দিয়ে কোনো কর বা সরকারি ফি দেওয়া জায়েয নয়; কারণ তা হারাম মাল। হ্যাঁ, যদি সরকার জোরপূর্বক সুদসহ ট্যাক্স আদায় করে, তবে তা ভিন্ন বিষয়।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫, সুদ অধ্যায়)

৫. তাহলে সুদের টাকা কী করবেন?

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সুদের টাকার ব্যাপারে করণীয়:

  1. মূল সুদ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে — ব্যাংককে ফিরিয়ে দেওয়া বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা।
  2. ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হলে — বিনা সওয়াবের নিয়তে গরিব-দুঃখী, মিসকিন, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সদকা করে দেওয়া।
  3. নিজের জন্য ব্যবহার না করা — খাওয়া, পরা, ব্যবসা, সম্পদ বৃদ্ধি — কোনো কাজে নিজের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।
  4. আয়কর বা অন্য কোনো বৈধ দায়িত্বে ব্যবহার না করা — কারণ এটি হারাম মালকে বৈধ কাজে লাগানোর শামিল।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"সুদের মাল নিজের প্রয়োজনে খরচ করা জায়েয নয়; বরং তা বিনা নিয়তে ফকির-মিসকিনকে দিয়ে দেওয়া উচিত।" — (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৯)

৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

আপনার স্যালারি অ্যাকাউন্টে সুদ জমা হলে:

  • সুদটি আলাদা করে রাখুন — মূল বেতনের সাথে মিশিয়ে ফেলবেন না।
  • মূল বেতন হালাল — কারণ চাকরির বেতন বৈধ; শুধু সুদের অংশটুকু হারাম।
  • সুদ দিয়ে আয়কর দিলে — আয়করের দায়িত্ব আদায় হবে না; বরং আলাদা হালাল টাকা থেকে আয়কর দিতে হবে।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | ব্যাংকের সুদ | সম্পূর্ণ হারাম ও নাপাক | | সুদ দিয়ে আয়কর দেওয়া | জায়েয নয় | | সুদের টাকা নিজের জন্য ব্যবহার | জায়েয নয় | | সুদের টাকা বিনা নিয়তে গরিবকে দেওয়া | জায়েয (গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য) | | আয়কর দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি | হালাল উপার্জন থেকে দেওয়া |

পরামর্শ: আপনার স্যালারি অ্যাকাউন্টে যে সুদ জমা হয়, তা আলাদা করে রাখুন এবং বিনা সওয়াবের নিয়তে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করে দিন। আয়কর হালাল বেতনের টাকা থেকে পরিশোধ করুন। সম্ভব হলে সুদমুক্ত ইসলামি ব্যাংকিং বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করুন, যাতে সুদের সমস্যা এড়ানো যায়।


রেফারেন্স:

  1. আল-কুরআন: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫-২৭৯
  2. সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮
  3. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৩৩
  4. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), খণ্ড ৫, পৃ. ১৬৮-১৭০
  5. ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ২২৭
  6. ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫
  7. ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩, পৃ. ২৮৯
  8. বাহিশতী জেওর, সুদ অধ্যায়
  9. মা'আরিফুল কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫-এর তাফসীর

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.