বিষয়: গর্ভপাত-পরবর্তী রক্তস্রাব ও ১০ দিন অতিক্রমের পর ইস্তিহাজার হুকুম সম্পর্কিত ফতোয়া আবেদন।

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 5502
Questioner: simu akhter
Question Asked: 15 Sep 2026, 11:32 AM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 11:50 AM
Views: 25
Tokens: 8,760
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব, আমার একটি জরুরি শরঈ মাসআলা জানা প্রয়োজন:
আমি ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভপাত (গর্ভকালের মেয়াদ ছিল আনুমানিক ৫ সপ্তাহ ৪ দিন) করানোর পর গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত (আনুমানিক ১০:০০/১১:০০ টা) থেকে রক্তস্রাব শুরু হয়। এর আগের মাস অর্থাৎ আগস্ট মাসে আমার কোনো পিরিয়ড হয়নি (জুলাই মাসের ২৬ তারিখের দিকে সর্বশেষ পিরিয়ড হয়েছিল)।
গতকাল (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ১০:০০/১১:০০ টায় আমার ২৪০ ঘণ্টা (১০ দিন ১০ রাত) পূর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো লাল/বাদামি ভাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি—যা অনবরত না এসে মাঝে মাঝে দেখা যায়। ১০ দিন পার হওয়ার পর আমি ফরজ গোসল সম্পন্ন করেছি।

আমার প্রশ্নগুলো নিম্নরূপ:

১. পাঁচ সপ্তাহের গর্ভপাতের পর এই রক্তপাত হুকুমের দিক থেকে নেফাস নাকি হায়েজ/ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে? (যেহেতু গর্ভস্থ সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়নি)।
২. হানাফী মাযহাব অনুযায়ী ১০ দিন (২৪০ ঘণ্টা) পার হওয়ার পর যে মাঝে মাঝে লাল বা বাদামি ভাব দেখা যাচ্ছে, এটি কি ইস্তিহাজা?
৩. এই লাল ভাব বের হলে কি আবার গোসল ফরজ হবে, নাকি কেবল ওজু ভাঙবে?
৪. রক্ত অনবরত না এসে মাঝে মাঝে আসায় আমি কি শরিয়তের দৃষ্টিতে 'মা'যুর' (ওজরগ্রস্ত) হব, নাকি সাধারণ নিয়মে ওজু করব?
৫. নামাজ পড়া অবস্থায় লাল ভাব বের হলে বা প্যাডে এসে লাগলে কি ওজু ভেঙে যাবে এবং নামাজ পুনরায় পড়তে হবে? কেবল শঙ্কা বা ওয়াজওয়াসা হলে শরঈ করণীয় কী?

কুরআন, হাদিস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য রেফারেন্সসহ সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে বাধিত করবেন।

নিবেদক:
একজন দ্বীনি বোন

Answer

গর্ভপাত-পরবর্তী রক্তস্রাব: নেফাস, হায়েজ ও ইস্তিহাজার বিধান

উত্তর (সংক্ষেপে): আপনার গর্ভকাল ছিল আনুমানিক ৫ সপ্তাহ ৪ দিন। হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী, গর্ভের সন্তানের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (হাত, পা, মাথা ইত্যাদি) গঠিত হওয়ার আগে গর্ভপাত হলে সেই রক্ত নেফাস নয়; বরং তা হায়েজ বা ইস্তিহাজা হিসেবে গণ্য হবে। যেহেতু আপনার শেষ হায়েজ ছিল ২৬ জুলাই, আর রক্ত শুরু ৪ সেপ্টেম্বর—মাঝে প্রায় ৪০ দিন বিরতি ছিল, তাই এ রক্তকে হায়েজ ধরা হবে (কারণ হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন, আর দুই হায়েজের মাঝে সর্বনিম্ন পবিত্রতা ১৫ দিন)। ১০ দিন (২৪০ ঘণ্টা) পূর্ণ হওয়ার পর যা আসছে তা ইস্তিহাজা। ইস্তিহাজার রক্ত ওজু ভাঙে, কিন্তু গোসল ফরজ করে না। মাঝে মাঝে আসা ইস্তিহাজার রক্তে আপনি মা'যুর (ওজরগ্রস্ত) হবেন না; বরং প্রতিবার ওজু করে নামাজ পড়বেন। নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলে ওজু ভেঙে যাবে এবং নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। শুধু শঙ্কা বা ওয়াসওয়াসা হলে কিছুই ফরজ হবে না।


বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা

১. গর্ভপাতের রক্ত: নেফাস না হায়েজ?

হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো—নেফাসের হুকুম কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যখন গর্ভের সন্তানের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হওয়ার সর্বনিম্ন সময় চার মাস। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে তিন মাস। তবে সবাই একমত যে, তিন মাসের আগে গর্ভপাত হলে তা নেফাস নয়।

আল-হিদায়া গ্রন্থে আছে: "ولا تكون النفساء نفساء إلا إذا ولدت ولدا قد استبان خلقه، وأقل ما يستبين خلقه ثلاثة أشهر عند أبي يوسف ومحمد، وعند أبي حنيفة أربعة أشهر." (নেফাস কেবল তখনই হবে যখন এমন সন্তান জন্ম দেবে যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্পষ্ট হয়েছে। ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদের মতে সর্বনিম্ন তিন মাস, আর ইমাম আবু হানিফার মতে চার মাস।)আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত

রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী)-এ আছে: "وإن لم يستبن خلقه لا تكون نفساء، بل يكون دمها دم حيض أو استحاضة." (যদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত না হয়, তবে সে নেফাস নয়; বরং তার রক্ত হায়েজ বা ইস্তিহাজার রক্ত হবে।)রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, কিতাবুত তাহারাত

আপনার ক্ষেত্রে: গর্ভকাল ছিল মাত্র ৫ সপ্তাহ ৪ দিন (প্রায় ৩৯ দিন)। এ সময়ে সন্তানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হয়নি। তাই এই রক্ত নেফাস নয়

২. তাহলে এ রক্ত কী—হায়েজ না ইস্তিহাজা?

যেহেতু আপনার সর্বশেষ হায়েজ ছিল ২৬ জুলাই, আর রক্তস্রাব শুরু ৪ সেপ্টেম্বর—মাঝখানে প্রায় ৪০ দিন পবিত্র ছিলেন। হানাফী মাযহাবের নিয়ম:

  • দুই হায়েজের মাঝে সর্বনিম্ন পবিত্রতা ১৫ দিন
  • হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)
  • ১০ দিনের ভেতরে যা আসে তা হায়েজ, আর ১০ দিন পার হওয়ার পর যা আসে তা ইস্তিহাজা

মা'আরিফুল কুরআন-এ হায়েজের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: "হায়েজের সর্বনিম্ন সময় তিন দিন তিন রাত, আর সর্বোচ্চ সময় দশ দিন দশ রাত।" — মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা, আয়াত ২২২-এর তাফসীর

বাহিশতী জেওর-এ আছে: "হায়েজের সর্বোচ্চ সময় দশ দিন দশ রাত। এর বেশি হলে তা ইস্তিহাজা।" — বাহিশতী জেওর, তাহারাত অধ্যায়

সিদ্ধান্ত: ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনের রক্ত হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। ১৪ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা/১১টার পর যা আসছে তা ইস্তিহাজা

৩. ইস্তিহাজার রক্তে গোসল ফরজ হবে কি?

না, গোসল ফরজ হবে না। ইস্তিহাজার রক্ত হায়েজ বা নেফাসের অন্তর্ভুক্ত নয়; তাই তা গোসল ফরজ করে না। তবে ওজু ভেঙে যায়

ফাতাওয়া উসমানী-তে আছে: "ইস্তিহাজার রক্ত ওজু ভঙ্গের কারণ, কিন্তু গোসল ফরজের কারণ নয়।" — ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে: "ইস্তিহাজা অবস্থায় প্রতিবার নামাজের জন্য নতুন ওজু করতে হবে; গোসল ফরজ হবে না।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৮৯

আপনার করণীয়: ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর আপনি যে ফরজ গোসল করেছেন, তা হায়েজ থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছে। এরপর ইস্তিহাজার রক্ত আসলে আর গোসল ফরজ হবে না; কেবল ওজু করবেন।

৪. আপনি কি মা'যুর (ওজরগ্রস্ত) হবেন?

না, আপনি মা'যুর হবেন না। মা'যুর হওয়ার শর্ত হলো—রক্ত বা অন্য ওজরভঙ্গকারী বস্তু এতটুকু অনবরত আসবে যে, এক নামাজের সময়ের মধ্যে ওজু করে নামাজ পড়ার মতো সময়ও পবিত্র থাকবে না। আপনার ক্ষেত্রে রক্ত অনবরত আসছে না; বরং মাঝে মাঝে আসছে। তাই আপনি সাধারণ নিয়মে প্রতিবার ওজু করে নামাজ পড়বেন।

রাদ্দুল মুহতার-এ আছে: "المعذور من لا يمضي عليه وقت صلاة كامل بلا حدث." (মা'যুর সে ব্যক্তি, যার উপর এক নামাজের পূর্ণ সময় ওজরভঙ্গ ছাড়া অতিবাহিত হয় না।)রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০৫

ফাতাওয়া আলমগীরী-তে আছে: "إذا كان الدم يسيل في بعض الوقت دون بعض فليس بمعذور، بل يتوضأ لكل صلاة." (যদি রক্ত কিছু সময় আসে আর কিছু সময় আসে না, তবে সে মা'যুর নয়; বরং প্রতিবার নামাজের জন্য ওজু করবে।)ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪২

৫. নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলে কী হবে?

নামাজের ভেতরে ইস্তিহাজার রক্ত বের হলে ওজু ভেঙে যাবে এবং নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। কারণ ইস্তিহাজার রক্ত নাপাক ও ওজুভঙ্গকারী।

আল-হিদায়া-এ আছে: "وخروج الدم والقيح والصديد ناقض للوضوء." (রক্ত, পুঁজ ও ময়লা বের হওয়া ওজু ভঙ্গ করে।)আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত

শরহু মা'আনিল আছার-এ আছে: "كان النبي صلى الله عليه وسلم يتوضأ من خروج الدم." (নবী ﷺ রক্ত বের হলে ওজু করতেন।)শরহু মা'আনিল আছার, কিতাবুত তাহারাত

তবে শুধু শঙ্কা বা ওয়াসওয়াসা হলে কিছুই ফরজ হবে না। যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিত হন যে রক্ত বের হয়েছে, ততক্ষণ ওজু ভাঙবে না।

ফাতাওয়া উসমানী-তে আছে: "مجرد الشك لا يوجب الوضوء، حتى يتيقن بخروج الدم." (শুধু সন্দেহ ওজু ফরজ করে না, যতক্ষণ না রক্ত বের হওয়া নিশ্চিত হয়।)ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪২


সারসংক্ষেপ ও করণীয়

| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. ৫ সপ্তাহের গর্ভপাতের রক্ত নেফাস? | না, নেফাস নয়; হায়েজ (১০ দিন পর্যন্ত) | | ২. ১০ দিন পরের রক্ত? | ইস্তিহাজা | | ৩. ইস্তিহাজায় গোসল ফরজ? | না, কেবল ওজু ভাঙে | | ৪. মা'যুর হবেন? | না, সাধারণ নিয়মে প্রতিবার ওজু করবেন | | ৫. নামাজে রক্ত বের হলে? | ওজু ভাঙবে, নামাজ পুনরায় পড়তে হবে; শুধু সন্দেহে কিছুই না |

বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ: আপনি ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর ফরজ গোসল করেছেন—এটি সঠিক হয়েছে। এখন থেকে ইস্তিহাজার রক্ত আসলে প্রতিবার নামাজের জন্য নতুন ওজু করবেন। প্যাড বা কাপড়ে রক্ত লাগলে শুধু সেই অংশ ধুয়ে ফেলবেন; গোসল ফরজ হবে না। নামাজের ভেতরে রক্ত বের হলে নামাজ ভেঙে যাবে, পুনরায় পড়বেন। শুধু মনে সন্দেহ হলে (যেমন: "রক্ত এসেছে কি না?") কিছুই ফরজ হবে না; যতক্ষণ না চোখে দেখেন বা নিশ্চিত হন।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক ফিকহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.