হুরমাত মুসাহারা
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
হুরমাত মুসাহারা (মুসাহারা সম্পর্ক) প্রসঙ্গে বিধান
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, আপনার বর্ণিত ঘটনায় হুরমাত মুসাহারা (মুসাহারা সম্পর্ক) প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ ও হারাম কাজ, যার জন্য আপনাকে আন্তরিক তাওবা করতে হবে। আপনার মাকে এ বিষয়ে জানানোর প্রয়োজন নেই।
১. হুরমাত মুসাহারা কী?
মুসাহারা (مصاهرة) শব্দের অর্থ বৈবাহিক সম্পর্ক। হুরমাত মুসাহারা বলতে বোঝায়, কোনো নারী বা পুরুষের সাথে এমন কোনো কাজ সংঘটিত হওয়া যা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট নিষিদ্ধতা (حرمة المصاهرة) সৃষ্টি করে — অর্থাৎ শাশুড়ি-বউ, সৎমা, সৎকন্যা ইত্যাদির মতো স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম হয়ে যাওয়া।
কুরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَائِكُمْ...
"তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, তোমাদের দুধমা, দুধবোন, শাশুড়ি..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এখানে মা মূলত হারাম — এটি নসব (রক্তসম্পর্ক) দ্বারা প্রমাণিত, মুসাহারা দ্বারা নয়। মায়ের সাথে মুসাহারা সম্পর্কের প্রশ্নই ওঠে না, কারণ মা নিজেই রক্তসম্পর্কে হারাম।
২. মুসাহারা প্রতিষ্ঠিত হয় কোন কাজে?
ফকীহগণের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, হুরমাত মুসাহারা প্রতিষ্ঠিত হয় শুধুমাত্র নিম্নলিখিত কারণে:
- বিবাহ — কোনো নারীকে বিবাহ করা হলে তার মা (শাশুড়ি), তার কন্যা (সৎকন্যা) হারাম হয়ে যায়।
- সহবাস (জিমা) — সন্দেহমূলক সহবাসও (وطء بشبهة) কিছু ফকীহের মতে মুসাহারা প্রতিষ্ঠা করে।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"হুরমাত মুসাহারা কেবল বিবাহ অথবা সহবাস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়; কেবল স্পর্শ, চুম্বন বা দৃষ্টিপাত দ্বারা নয়।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩২/১৩৭)
শায়খ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"মুসাহারা হারাম হওয়ার কারণ দুটি: বিবাহ এবং সহবাস। কেবল স্পর্শ বা হস্তমৈথুন মুসাহারা প্রতিষ্ঠা করে না।" (আশ-শারহুল মুমতি', ১২/১৩৫)
৩. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনায় যা ঘটেছে:
- আপনি মায়ের শরীর দেখেছেন ও স্পর্শ করেছেন
- হস্তমৈথুন করেছেন
- কিন্তু সহবাস (জিমা) করেননি
যেহেতু সহবাস সংঘটিত হয়নি, শুধু স্পর্শ ও হস্তমৈথুন হয়েছে — এতে হুরমাত মুসাহারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মা রক্তসম্পর্কে হারাম, এবং এই হারামত্ব বহাল আছে; কোনো নতুন নিষিদ্ধতা সৃষ্টি হয়নি।
তবে এটা যিনার নিকটবর্তী একটি জঘন্য গুনাহ। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
"তোমরা যিনার নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
৪. আপনার মাকে জানানো প্রসঙ্গে
আপনার মাকে এ বিষয়ে জানানো উচিত নয়। কারণ:
- এটি আপনার মায়ের জন্য অপমান ও কষ্টের কারণ হবে।
- এতে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে।
- ইসলামে গুনাহ গোপন রাখা ও তাওবা করা উত্তম — বিশেষত যখন তা অন্যকে জানানোর প্রয়োজন নেই।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন করবেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৯০)
আপনি নিজের গুনাহ গোপন রেখে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তাওবা করুন।
৫. করণীয়
- আন্তরিক তাওবা করুন — লজ্জিত হোন, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, ভবিষ্যতে এ কাজ থেকে বিরত থাকুন।
- সালাতুল তাওবা পড়ুন এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন।
- ঘুমের ব্যবস্থা পরিবর্তন করুন — আলাদা ঘরে বা অন্তত আলাদা বিছানায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করুন।
- দৃষ্টি সংযত রাখুন — মায়ের প্রতি দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করুন।
- বিবাহের চেষ্টা করুন — যদি সামর্থ্য থাকে, দ্রুত বিবাহ করুন; এটি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বৈধ উপায়।
- রোজা রাখুন — রাসূল ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না, সে রোজা রাখুক; তা তার জন্য ঢাল।" (সহীহ বুখারী: ১৯০৫)
৬. সতর্কতা
আপনার মায়ের সাথে আপনার সম্পর্ক মা-সন্তানের সম্পর্ক — এটি কখনোই পরিবর্তিত হয় না। মা আপনার জন্য চিরকাল হারাম এবং এই হারামত্ব কখনো ভঙ্গ হয় না। আপনার কর্তব্য হলো এই সম্পর্ককে সম্মান করা, তাওবা করা এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।
আল্লাহ আপনার তাওবা কবুল করুন এবং আপনাকে হেফাজত করুন। আমীন।
তথ্যসূত্র:
- সূরা আন-নিসা: ২৩
- সূরা আল-ইসরা: ৩২
- সহীহ মুসলিম: ২৫৯০
- সহীহ বুখারী: ১৯০৫
- মাজমুউল ফাতাওয়া (ইবন তাইমিয়্যাহ): ৩২/১৩৭
- আশ-শারহুল মুমতি' (ইবন উসাইমীন): ১২/১৩৫