ব্রেস্টফিডিং করার পর বাচ্চার মুখ থেকে দুধ ছিটে আসা কি নাপাক?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ব্রেস্টফিডিং করার পর বাচ্চার মুখ থেকে যে দুধ ছিটে আসে সেটা তো নাপাক নায়, তাইনা?
(২) যেকোন কিছুই (ম্যাটেরিয়ালস/ বস্তু/ কাপড়) নাপাকের সংস্পর্শে গেলেই তো সেটা নাপাক হয়ে যাবেনা যতক্ষণ না নাপাকির চিহ্ন/ গন্ধ পরিলক্ষিত হয় তার মধ্যে, ঠিক আছেই তো?
Answer
পাক-নাপাক সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রথম প্রশ্ন: ব্রেস্টফিডিং করার পর বাচ্চার মুখ থেকে যে দুধ ছিটে আসে
হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। মায়ের দুধ বা বাচ্চার মুখ থেকে নির্গত দুধ পাক (তাহির)। এটি নাপাক নয়।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ "আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় তাদের (স্ত্রীদের) সাথে মিলিত হয়ো না।" — (সূরা বাকারা: ১৮৭)
এখানে ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে স্ত্রী-সহবাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, মানুষের শরীর থেকে নির্গত সাধারণ পাক বস্তু মসজিদকে নাপাক করে না। মায়ের দুধ মানুষের শরীর থেকে নির্গত একটি পাক বস্তু।
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا يَنْجُسُ "নিশ্চয়ই মুমিন কখনো নাপাক হয় না।" — (সহিহ বুখারি: ২৮৩, সহিহ মুসলিম: ৩৭১)
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, মুমিনের শরীর, রক্ত, লালা, ঘাম, দুধ ইত্যাদি সবই পাক। (শরহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ৪, পৃ. ৫৭)
ফিকহি বিধান:
আল্লাহ তাআলা কুরআনে মায়ের দুধকে "দুধ" হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তা পানীয় হিসেবে হালাল বলেছেন:
وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَّ كَثِيرًا "আর আমি তাদেরকে পান করাই যা আমি সৃষ্টি করেছি—চতুষ্পদ জন্তু ও বহু মানুষ।" — (সূরা ফুরকান: ৪৯)
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার" গ্রন্থে উল্লেখ করেন:
"وَلَبَنُ الْآدَمِيِّ طَاهِرٌ" "মানুষের দুধ পাক।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০৩)
সারকথা: ব্রেস্টফিডিং করার পর বাচ্চার মুখ থেকে যে দুধ ছিটে আসে, তা সম্পূর্ণ পাক। এটি কাপড়ে বা শরীরে লাগলে ধোয়া আবশ্যক নয়; নামাজও ভঙ্গ হবে না।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: নাপাকের সংস্পর্শে গেলে কি সাথে সাথে নাপাক হয়ে যায়?
হ্যাঁ, আপনার বক্তব্য সঠিক। যেকোনো বস্তু (কাপড়, ম্যাটেরিয়ালস, আসবাব ইত্যাদি) নাপাকির সংস্পর্শে এলেই সাথে সাথে নাপাক হয়ে যায় না; বরং নাপাকির দৃশ্যমান চিহ্ন (রং/দাগ) বা গন্ধ পরিলক্ষিত হলে তবেই তা নাপাক হিসেবে গণ্য হবে।
দলিল:
১. হাদিস:
একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল:
يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ أَحَدَنَا يُصَلِّي فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ؟ "হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ কি এক কাপড়ে নামাজ পড়তে পারে?"
রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
أَوَكُلُّكُمْ يَجِدُ ثَوْبَيْنِ؟ "তোমাদের প্রত্যেকের কি দুটি কাপড় আছে?"
— (সহিহ বুখারি: ৩৬১, সহিহ মুসলিম: ৫১৫)
এই হাদিস প্রমাণ করে, সাধারণ অবস্থায় কাপড় পাক থাকে; সন্দেহের কারণে নাপাক হয় না।
২. নাপাকির বিধান সম্পর্কে হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا وَطِئَ أَحَدُكُمْ بِنَعْلِهِ الْأَذَى فَإِنَّ الْأَرْضَ طَهُورٌ لَهَا "তোমাদের কেউ যদি জুতা দিয়ে নাপাকির উপর পা রাখে, তবে মাটিই তার জন্য পবিত্রকারী।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫)
অর্থাৎ, নাপাকির উপর পা রাখলেই জুতা নাপাক হয় না; বরং মাটিতে ঘষলে পাক হয়ে যায়।
৩. ফিকহি মূলনীতি:
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন:
"الْأَصْلُ فِي الْأَشْيَاءِ الطَّهَارَةُ حَتَّى تَتَيَقَّنَ النَّجَاسَةُ" "মূলনীতি হলো, প্রত্যেক বস্তু মূলত পাক, যতক্ষণ না নাপাকির ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৩০০)
৪. ইমাম তাহতাবি (রহ.)-এর বক্তব্য:
"الْمَاءُ الْقَلِيلُ إِذَا لَاقَى النَّجَاسَةَ لَا يَنْجُسُ إِلَّا إِذَا تَغَيَّرَ أَحَدُ أَوْصَافِهِ" "অল্প পানি নাপাকির সংস্পর্শে এলে নাপাক হয় না, যতক্ষণ না তার কোনো একটি গুণ (রং, গন্ধ, স্বাদ) পরিবর্তিত হয়।" — (মাজমাউল আনহুর, খণ্ড ১, পৃ. ২৫)
৫. ফতোয়ায়ে আলমগিরি:
"وَلَا يَنْجُسُ الثَّوْبُ بِمُجَرَّدِ الْمُلَاقَاةِ بَلْ بِظُهُورِ أَثَرِ النَّجَاسَةِ" "শুধু সংস্পর্শে কাপড় নাপাক হয় না; বরং নাপাকির চিহ্ন প্রকাশ পেলে নাপাক হয়।" — (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৪২)
সারকথা:
- নাপাক বস্তু স্পর্শ করলেই কোনো বস্তু নাপাক হয় না।
- যদি নাপাকির রং, দাগ বা গন্ধ কাপড়/বস্তুতে পরিলক্ষিত হয়, তবেই তা নাপাক।
- যদি কোনো চিহ্ন বা গন্ধ না পাওয়া যায়, তবে তা পাক; ধোয়া আবশ্যক নয়।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ব্রেস্টফিডিং-এর দুধ নাপাক? | না, পাক | | নাপাক স্পর্শে বস্তু নাপাক হয়? | না, চিহ্ন/গন্ধ পাওয়া গেলে তবেই নাপাক |
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পাক-নাপাকের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।