ইস্তেহাজার নামাজ
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার অনিয়মিত মাসিকের সমস্যা প্রায় ১৬ বছর ধরে। চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হচ্ছি না।
২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত নিয়ম ছিল, প্রতি ৩ মাস পর পিরিয়ড হতো এবং সেটার স্থায়িত্ব থাকতো টানা ১ মাস।
২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়ম হয়ে গেল, প্রতি ৩ মাস পর পিরিয়ড হতো এবং সেটার স্থায়িত্ব থাকতো টানা ২ মাস।
বর্তমানে ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যখন পিরিয়ড শুরু হয় সেটার স্থায়িত্ব ৪ মাসেও শেষ হয় না ।
এক্ষেত্রে নামাজ রোজা কিভাবে আদায় করবো?
আমি ইস্তেহাজার সময় গুলোতে এভাবে নামাজ পড়তাম,
আমি আগে প্রথম ১০ দিন নামাজ রোজা থেকে বিরত থাকতাম। তারপর নামাজ পড়তাম ১৫ দিন, তারপর আবার ১০ দিন নামাজ ছেড়ে দিতাম এবং ১৫ দিন নামাজ পড়তাম। এগুলো করতাম ইস্তেহাজার সময় গুলোতে৷
কিন্তু আমি এখন শুনেছি যে, যতদিন পর্যন্ত ইস্তেহাজার অবস্থায় থাকা হবে ততোদিনই নামাজ ছাড়া যাবে না। অর্থাৎ পিরিয়ড শুরু হলে প্রথম ১০ দিন হায়েজ হিসেবে ধরে, বাকী দিন ইস্তেহাজা ধরে নিয়মিত নামাজ রোজা করতে হবে যদিও সেটার স্থায়িত্ব ৪ মাস হোক বা বছর জুড়েই হোক। আমি যে, ১০+১৫+১০+১৫--- এভাবে পড়তাম পিরিয়ড থাকা অবস্থায় সেটা কি ঠিক ছিল? যদি না থাকে তাহলে সঠিক কোনটা?
আমি আসলে বুঝতেছি না। যদি ব্যাপার টা বিস্তারিত বুঝিয়ে বলতেন ভালো হয়৷
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেনসিটিভ। প্রথমে দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা আপনার শারীরিক কষ্ট দূর করুন এবং ইবাদতে সহীহ পদ্ধতি অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
উত্তর
দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই শারীরিক সমস্যায় ভোগার জন্য আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ শেফা ও সুস্থতা দান করুন।
আপনার অতীতের আমল, নতুন শোনা কথার বিভ্রান্তি এবং অনবরত রক্তস্রাবের (ইস্তেহাজা) ক্ষেত্রে নামায-রোযা আদায়ের সঠিক শরয়ী নিয়ম ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার ইতঃপূর্বে ১০ দিন হায়েজ (নামায-রোযা বন্ধ) এবং ১৫ দিন তোহুর/ইস্তেহাজা (নামায-রোযা পালন) হিসেবে ধরে আমল করার পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ সঠিক ও শরীয়তসম্মত ছিল।
আপনি সম্প্রতি যে কথাটি শুনেছেন—(একবার ১০ দিন হায়েজ ধরে বাকি ৪ মাস বা বছরজুড়ে একটানা ইস্তেহাজা ধরে নামায পড়তে হবে এবং মাঝখানে আর কখনোই হায়েজ ধরা যাবে না)—তা ভুল ও শরীয়তের বিধান পরিপন্থী। অনবরত রক্তস্রাব হলেও প্রতি চক্রে হায়েজ ও ইস্তেহাজা পর্যায়ক্রমে ঘুরে ফিরে আসবে।
শরয়ী মূলনীতি ও ফিকহী ব্যাখ্যা:
১. হায়েজ ও তোহুরের সময়সীমা: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী হায়েজের (ঋতুস্রাব) সর্বনিম্ন সময় ৩ দিন এবং সর্বোচ্চ সময় ১০ দিন ১০ রাত। ১০ দিনের চেয়ে বেশি রক্ত প্রবাহিত হলে অতিরিক্ত রক্তকে হায়েজ না ধরে 'ইস্তেহাজা' (অসুস্থতাজনিত রক্ত) হিসেবে গণ্য করা হয়। আর দুই হায়েজের মধ্যবর্তী সর্বনিম্ন পবিত্রতা (তোহুর)-এর সময় হলো ১৫ দিন।
২. অনবরত রক্তপ্রবাহের বিধান (ইস্তিমরারুদ্দাম): রক্ত যদি বন্ধ না হয়ে টানা ৪ মাস বা বছরজুড়ে অনবরত প্রবাহিত হতে থাকে, তবে শরীয়তে এটাকে ‘ইস্তিমরারুদ্দাম’ (استمرار الدم) বলা হয় । ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষেত্রে নারীর পূর্বের অভ্যাসের দিনগুলো (আদাত) হায়েজ গণ্য হবে এবং বাকি দিনগুলো ইস্তেহাজা গণ্য হবে। যদি নির্দিষ্ট অভ্যাস পরিবর্তিত বা ফাসিদ হয়ে যায়, তবে সর্বোচ্চ হায়েজ ১০ দিন এবং সর্বনিম্ন তোহুর ১৫ দিন ধরে হিসাব পরিচালনা করতে হয় ।
৩. পর্যায়ক্রমিক আবর্তন: রক্ত পড়া বন্ধ না হলেও প্রতি ১৫ দিন ইস্তেহাজার (তোহুর) মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় ১০ দিন হায়েজ শুরু হয়। তাই ১ বছর বা ৪ মাস একটানা কেবল ইস্তেহাজা ধরে নামায পড়া ভুল; বরং ১০ দিন হায়েজ এবং ১৫ দিন ইস্তেহাজার চক্র অব্যাহত থাকবে।
আপনার জিজ্ঞাসার সুনির্দিষ্ট উত্তর:
১. আপনার আগের ১০+১৫+১০+১৫... পড়ার পদ্ধতি কি ঠিক ছিল?
হ্যাঁ, আপনার আগে ১০ দিন হায়েজ ধরে নামায-রোযা ছেড়ে দেওয়া এবং পরবর্তী ১৫ দিন ইস্তেহাজা ধরে নিয়মিত নামায-রোযা আদায় করা পুরোপুরি সঠিক ও শরীয়তসম্মত ছিল। আপনার বিগত দিনের কোনো নামায বা রোযা কাযা করতে হবে না।
২. আপনি যা শুনেছেন তা কেন সঠিক নয়?
কারণ অনবরত রক্তস্রাব চলাকালে পুরো ৪ মাস বা বছরজুড়ে একটানা ইস্তেহাজা গণ্য হয় না; বরং প্রতি চক্রে হায়েজ ও ইস্তেহাজা পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হতে থাকে।
বর্তমানে আপনার জন্য নামায-রোযা আদায়ের সহজ ও সঠিক নিয়ম:
বর্তমানে যেহেতু আপনার রক্তস্রাব ৪ মাসেও বন্ধ হচ্ছে না, তাই আপনি নিচের নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত আমল চালিয়ে যাবেন:
- ১ম ধাপ (হায়েজের ১০ দিন): রক্ত শুরু হওয়ার পর প্রথম ১০ দিন হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। এই ১০ দিন নামায পড়া এবং রোযা রাখা সম্পূর্ণরূপে নিষেধ।
- ২য় ধাপ (গোসল ও ইস্তেহাজার ১৫ দিন): ১০ দিন পূর্ণ হওয়া মাত্রই আপনি গোসল করে নিবেন। এরপর পরবর্তী ১৫ দিন ইস্তেহাজা (পবিত্রতা) হিসেবে গণ্য হবে। এই ১৫ দিন রক্ত পড়া সত্ত্বেও আপনি নামায পড়বেন এবং রোযা রাখবেন ।
- ইস্তেহাজা অবস্থায় নামাযের পদ্ধতি: ইস্তেহাজার সময়গুলোতে আপনি শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘ওজরওয়ালী’ (মা'যুর) বলে গণ্য হবেন । তাই প্রতিটি ফরয নামাযের ওয়াক্ত শুরু হলে নতুন করে ওজু করবেন। ওই ওজু দিয়ে ওই ওয়াক্তের ফরয, সুন্নত ও নফল নামায আদায় করবেন এবং ওয়াক্ত শেষ হলে ওজু ভেঙে যাবে।
- ৩য় ধাপ (চক্রের পুনরাবৃত্তি): ১৫ দিন ইস্তেহাজা শেষ হওয়ার পর ১৬তম দিন থেকে পুনরায় আপনার ১০ দিনের হায়েজ শুরু হবে। তখন আবার নামায-রোযা বন্ধ রাখবেন। ১০ দিন শেষে গোসল করে আবার ১৫ দিন ইস্তেহাজা ধরে নামায-রোযা পড়বেন।
(এভাবে ১০ দিন হায়েজ + ১৫ দিন ইস্তেহাজার চক্রে আপনার নিয়মিত আমল অব্যাহত থাকবে।)
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৪৬ (হায়েজের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মেয়াদ এবং ইস্তেহাজার বিবরণ)।
- পৃষ্ঠা: ৪৭ (তোহুরের সর্বনিম্ন মেয়াদ ১৫ দিন এবং হায়েজের নিষিদ্ধ কাজসমূহ)। ২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৩ (ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ: হায়েজ ও তোহুরের সময়সীমা)।
- পৃষ্ঠা: ১১৮ (ইস্তেহাজা ও অনবরত রক্তপ্রবাহের মাসায়েল — ইস্তিমরারুদ্দাম)।
- পৃষ্ঠা: ১২০–১২১ (ইস্তেহাজাওয়ালী নারীর ইবাদত ও ওজরের বিবরণ)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।