রুকাইয়া

Family Life · Hanafi

Question No: 5357
Questioner: mahmuda mim (0501)
Question Asked: 12 Sep 2026, 05:16 PM
Reviewed & Published: 12 Sep 2026, 05:38 PM
Views: 11
Tokens: 4,459
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি আইওএম এর একজন স্টুডেন্ট। আমার পরিবারে আমার মা,ভাই,বোন, দাদি আর আমার বাবা আছে। বাবা আমাদের পরিবার রেখে ২য় বিয়ে করছে। বাবার ২য় স্ত্রী আমার বাবাকে কুফরি করছে। বাবা মায়ের মধ্যে অনেক ঝামেলা হয়। বাবা আমাদের পরিবার ছেড়ে দিতে চাই। মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। এই অবস্থায় একজন সন্তান হিসেবে আমি কি করতে পারি। বাবাকে না জানিয়ে গোপনে কি রুকাইয়া করা যাবে? যদি যায় তার নিয়ম কি? আমি কি করতে পারব?

Answer

রুকাইয়া সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক সমস্যার সমাধান

উত্তর (হানাফী মাযহাব অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد

প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

আপনার পারিবারিক অবস্থা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন। তবে মনে রাখবেন—রুকাইয়া কোনো জাদু-টোনা বা গোপন কৌশল নয়; এটি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আধ্যাত্মিক চিকিৎসা, যা শর্তসাপেক্ষে বৈধ।


১. গোপনে (বাবাকে না জানিয়ে) রুকাইয়া করা যাবে কি?

সিদ্ধান্ত: সাধারণভাবে যাবে না—কারণ:

  • রুকাইয়া মূলত নিজের বা অনুমতিক্রমে অন্যের ওপর করা হয়।
  • বাবার ওপর গোপনে রুকাইয়া করা মানে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ, যা ইসলামে নিষিদ্ধ (গীবত, হুকুম ছাড়া অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ)।
  • রুকাইয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি বা বাবার মন পরিবর্তন জোরপূর্বক—তাহলে তা সিহর/জাদুর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা কুফরি।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

«وَلَا يَجُوزُ لِأَحَدٍ أَنْ يَتَصَرَّفَ فِي مَالِ غَيْرِهِ أَوْ أَهْلِهِ بِغَيْرِ إِذْنِهِ» (রদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ২৪৭)

তবে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হতে পারে:

| অবস্থা | হুকুম | |---|---| | নিজের জন্য রুকাইয়া (নিজে পড়া/পড়ানো) | জায়েজ | | মায়ের অনুমতিতে মায়ের জন্য রুকাইয়া | জায়েজ | | বাবার অনুমতি ছাড়া বাবার জন্য | সাধারণত নাজায়েজ | | বাবার ওপর জোর করে/গোপনে | নাজায়েজ, এমনকি হারাম হতে পারে |


২. রুকাইয়ার শরীয়তসম্মত নিয়ম

রুকাইয়া বৈধ হতে হলে নিম্নলিখিত শর্ত পূরণ করতে হবে:

  1. কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম-সিফাত বা দুআ দ্বারা হতে হবে — জাদু-মন্ত্র, অশ্লীল বা অর্থহীন শব্দ নয়।
  2. আরবি বা বোধগম্য ভাষায় হতে হবে — অর্থ না জানা মন্ত্র নয়।
  3. বিশ্বাস রাখতে হবে যে রুকাইয়া নিজে নয়, আল্লাহই শিফা দেন — রুকাইয়া স্বতন্ত্র প্রভাবক নয়।
  4. হারাম উপায়ে নয় — যেমন: কবর-কেন্দ্রিক, জিন-শয়তানের সাহায্য, তাবিজ-কবজ, পানি-চুমুকের নামে শিরক।
  5. নিজের বা অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর — অন্যের ওপর বিনা অনুমতিতে নয়।

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ» — "যতক্ষণ তাতে শিরক না থাকে, রুকাইয়াতে কোনো অসুবিধা নেই।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০০; মুসনাদ আহমাদ)

ইমাম তাহাবী (রহ.) «শরহু মাআনিল আসার»-এ উল্লেখ করেন যে, সাহাবায়ে কেরাম কুরআন দিয়ে রুকাইয়া করতেন এবং রাসূল ﷺ তা অনুমোদন করেছেন।


৩. আপনার করণীয় (একজন সন্তান হিসেবে)

ক. নিজের ও মায়ের জন্য করণীয়:

  • নিজে ও মায়ের জন্য কুরআন পড়ুন — সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ফালাক, সূরা নাস।
  • সকাল-সন্ধ্যা আযকার পড়ুন — বিশেষত:
    • «أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ»
    • «بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ...»
  • সদকা করুন — নবী ﷺ বলেছেন: «الصَّدَقَةُ تَدْفَعُ الْبَلَاءَ» (সদকা বিপদ দূর করে)।
  • দুআ করুন — তাহাজ্জুদে, নামাজের পর, বিশেষত মায়ের জন্য।

খ. বাবার ব্যাপারে করণীয়:

  • বাবার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না — বাবা-মায়ের হক ইসলামে সর্বোচ্চ।
  • বাবার জন্য দুআ করুন — হেদায়েতের জন্য।
  • মাঝে মাঝে শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন — কুরআন-হাদিসের আলোকে, রাগ-বিতর্ক নয়।
  • বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে গালি-গালাজ করবেন না — এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
  • বাবার অনুমতি নিয়ে তার জন্য রুকাইয়া করানোর চেষ্টা করুন — যদি তিনি রাজি হন।

গ. যা করবেন না:

  • ❌ বাবার ওপর গোপনে রুকাইয়া/তাবিজ
  • ❌ জাদু-টোনা, কবিরাজ, ফকিরের কাছে যাওয়া
  • ❌ বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীকে গালি দেওয়া বা তার ওপর জুলুম
  • ❌ বাবা-মায়ের বিচ্ছেদে উসকানি দেওয়া
  • ❌ বাবার সম্পত্তি বা হক নষ্ট করা

৪. পারিবারিক সমস্যার শরীয়তসম্মত সমাধান

  1. পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সালিশ — চাচা, দাদা, বা সম্মানিত আলেমকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।
  2. মা-বাবার মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা — কুরআনের নির্দেশ:

    «وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا» — "যদি তাদের মধ্যে বিচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে এক বিচারক তার পরিবার থেকে ও এক বিচারক তার পরিবার থেকে পাঠাও।" (সূরা নিসা: ৩৫)

  3. ধৈর্য ও ইস্তিগফার — আল্লাহ পরীক্ষা দেন, ধৈর্যের প্রতিদান দেন।
  4. প্রয়োজনে ইসলামী পারিবারিক পরামর্শক/মুফতির শরণাপন্ন হোন — সরাসরি।

৫. সংক্ষিপ্ত উত্তর

| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | বাবাকে না জানিয়ে গোপনে রুকাইয়া করা যাবে? | না, সাধারণত যাবে না — বাবার অনুমতি ছাড়া তার ওপর রুকাইয়া করা জায়েজ নয়। | | যদি যায়, নিয়ম কী? | কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক, শিরকমুক্ত, নিজের বা অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে। | | আমি কী করতে পারব? | নিজে ও মায়ের জন্য দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, সদকা, বাবার জন্য হেদায়েতের দুআ, শান্তভাবে বোঝানো, বড়দের মাধ্যমে সালিশ। |


মূল কথা: রুকাইয়া একটি ইবাদত, জাদু নয়। বাবার ওপর গোপনে রুকাইয়া করা ইসলামে নিষিদ্ধ। বরং আপনি নিজে ও মায়ের জন্য কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমল করুন, বাবার জন্য দুআ করুন, এবং পারিবারিক সমস্যার সমাধানে শরীয়তসম্মত পথ অবলম্বন করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার পরিবারকে হেফাজত করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.