সিহর, জিনের আছর ও বদনজরের লক্ষণ, ঘরে রুকইয়াহ করার সহীহ পদ্ধতি।

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 5354
Questioner: md. aktaruzzaman
Question Asked: 12 Sep 2026, 04:29 PM
Reviewed & Published: 12 Sep 2026, 04:31 PM
Views: 8
Tokens: 6,506
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ্। আমি গত ৪ মাস হলো কিছু সমস্যায় আছি।স্বপ্নে কিছু খাচ্ছি,উড়ছি এরকম দেখি যেটা কালও দেখেছি।বিশেষ করে দিনের বেলা ঘুমালে এগুলো দেখি।মনে হয় স্বপ্নে কারো সাথে ইন্টিমিসিতে আছি এরকম ফিল পাই।এটা প্রায়ই হয়।শরীরে শক্তি পাইনা। বাথরুমে চোখো বন্ধ করতে ভায় লাগে মনে হয় কেউ দেখছে।কিছুই ভালো লাগেনা।মাদরাসা পড়ার প্রতি কোন আগ্রহ পাইনা।মনে হয় বাদ দিয়ে দিবো।স্বলাতে মনোযোগ নাই,কোরআন তিলওয়াত করতে ইচ্ছে করে।কিছুই ভালো লাগে না।গত ১ মাস হলো ইন্টিমেটের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। হাজবেন্ডের প্রতি আগ্রহ আসেনা।ব্যক্তিগত টাইমে জ্বালাপোড়া করছে।সবচেয়ে চিন্তার বিষয় আমার আর হাজবেন্ডের মাঝে সামান্য কিছুতেই মনমালিন্য হয়ে যায় যা গত ৪ বছর ছিলো না।এবং মাঝে গুরুতর ঝামেলাও হয়েছিলো।হাজবেন্ড সব বিষয়ে ভুল ধরে,হুটহাট এমন কথা বলে কষ্ট পাই।এর সমাধান কি?রাকির কাছে রুক্যাইয়া জরার মত আর্থিক সামর্থ্য নেই আলহামদুলিল্লাহ। তাই চাই ঘরেই রুক্যাইয়া করতে।কিভাবে করবো? কি দোয়া পড়বো যদি বলতেন মুনাসিব হতো ইন শা আল্লাহ ।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রিয় বোন, আপনার বর্ণনা শুনে দুঃখ হলো। আপনার লক্ষণগুলো — বিশেষ করে রাতে/দিনে ঘুমে অশ্লীল স্বপ্ন, ব্যথা, শরীরে দুর্বলতা, ইবাদতে অনাগ্রহ, স্বামীর সাথে মনমালিন্য — এগুলো সিহর (জাদু), জিনের আছর, বা আইন (বদনজর) এর সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। তবে নিশ্চিতভাবে বলার জন্য রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, তবে আপনি ঘরে বসেই কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ করতে পারবেন, ইন শা আল্লাহ।


প্রথমে করণীয়: চিকিৎসা ও রুকইয়াহ একসাথে

শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেছেন — কুরআন দিয়ে রুকইয়াহ করা সুন্নাহসম্মত, তবে সাথে সাথে ডাক্তারি চিকিৎসাও করবেন। কারণ কিছু শারীরিক সমস্যাও (হরমোন, রক্তস্বল্পতা) এমন লক্ষণ দিতে পারে।


ঘরে রুকইয়াহ করার পদ্ধতি

১. রুকইয়াহর আগে প্রস্তুতি

  • সম্পূর্ণ বিশ্বাস ও ইয়াকিন রাখুন আল্লাহই শিফা দেন।
  • সব হারাম বাদ দিন — সুদ, হারাম খাবার, ছবি/মিউজিক, বেপর্দা।
  • সকাল-সন্ধ্যার আযকার নিয়মিত পড়ুন (নিচে দেওয়া আছে)।
  • পবিত্র অবস্থায় থাকুন, সম্ভব হলে অজু করে নিন।

২. রুকইয়াহর সময় যা পড়বেন

ক) সূরা ফাতিহা — ৭ বার খ) আয়াতুল কুরসি — ৭ বার গ) সূরা বাকারার শেষ ২ আয়াত — ৩ বার ঘ) সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস — প্রতিটি ৭ বার ঙ) সূরা ইয়াসিন — ১ বার (সম্পূর্ণ) চ) সূরা বাকারা — সম্ভব হলে সম্পূর্ণ (৩ দিনে হলেও)

৩. রুকইয়াহর দোয়া (হাদিসে বর্ণিত)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ এই দোয়া পড়ে রুকইয়াহ করতেন:

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রব্বান-নাস, আযহিবিল-বাস, ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শাফিয়া ইল্লা আনতা।

অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, শিফা দিন; আপনিই শিফা দানকারী, আপনি ছাড়া কোনো শিফা দানকারী নেই।

(বুখারি: ৫৬৭৫, মুসলিম: ২১৯১)

ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত নবী ﷺ এর রুকইয়াহ:

بِسْمِ اللَّهِ، أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ'যিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আউ আইনি হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরকিকা।

অর্থ: আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি, প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক অনিষ্টকারী আত্মা ও হিংসুকের চোখ থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দিন। আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি।

(মুসলিম: ২১৮৬)

৪. রুকইয়াহর পদ্ধতি

  • এক হাত মাথায় বা ব্যথার স্থানে রাখুন, অন্য হাত দিয়ে পড়ুন।
  • পড়ার সময় ফুঁ দিন (সামান্য থুতু মিশ্রিত ফুঁ)।
  • জল/তেলে পড়ে ফুঁ দিয়ে গোসল করুন ও পান করুন (নিচে দেখুন)।
  • দিনে ২-৩ বার করুন, বিশেষ করে ফজর ও মাগরিবের পর।

রুকইয়াহর পানি ও তেল তৈরি

  1. একটি পাত্রে বিশুদ্ধ পানি নিন।
  2. উপরের সূরাগুলো পড়ে ফুঁ দিন (৭ বার করে)।
  3. সকালে খালি পেটে পান করুন, গোসল করুন।
  4. জয়তুন তেল বা সরিষার তেলে পড়ে ফুঁ দিয়ে ব্যথার স্থানে ও মাথায় লাগান।
  5. ৭ দিন নিয়মিত করুন, ইন শা আল্লাহ উপকার পাবেন।

সকাল-সন্ধ্যার আযকার (সবচেয়ে জরুরি)

শাইখ ইবন উসাইমিন (রহ.) বলেছেন — আযকারই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

  • সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার: বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু...
  • ৩ বার: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক
  • ৩ বার: বিসমিল্লাহি লাযি লা ইয়াদুররু মাআস-মিহি শাইউন...
  • ৭ বার: হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া...
  • সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস — সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে।

স্বামীর সাথে মনমালিন্যের সমাধান

এটি সিহরের প্রভাবও হতে পারে, আবার শয়তানের কুমন্ত্রণাও। করণীয়:

  1. স্বামীকে রুকইয়াহর পানি পান করান — জেনে বা না জেনে।
  2. রাতে ঘুমানোর আগে সূরা বাকারার শেষ ২ আয়াত পড়ুন (শয়তান ঘরে ঢুকতে পারে না — বুখারি: ৫০০৯)।
  3. রাগের সময় চুপ থাকুন — নবী ﷺ বলেছেন: "রাগ হলে চুপ থাকো" (মুসনাদ আহমাদ)।
  4. সালাতুল হাজাত পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
  5. সালাম দেওয়া বাড়িয়ে দিন, ছোট উপহার দিন — শয়তানের কুমন্ত্রণা ভাঙবে।
  6. শাইখ ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন — স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা শয়তানের সবচেয়ে বড় কাজ, তাই আযকার ও কুরআন দিয়ে তা মোকাবেলা করুন।

ইন্টিমেট সম্পর্কে অনাগ্রহ

এটি সিহর/জিনের আছরের একটি সাধারণ লক্ষণ। পাশাপাশি:

  • হরমোন পরীক্ষা করান (থাইরয়েড, প্রোল্যাক্টিন)।
  • জ্বালাপোড়ার জন্য ডাক্তার দেখান — সংক্রমণ হতে পারে।
  • রুকইয়াহ চালিয়ে যান, ইন শা আল্লাহ ভালো হবে।

সবচেয়ে জরুরি উপদেশ

শাইখ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন: "রুকইয়াহ একটি উপায়, কিন্তু শিফা দেন একমাত্র আল্লাহ। তাই তাওবা, ইস্তিগফার, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিন।"

  • তাহাজ্জুদ পড়ুন — এ সময় দোয়া কবুল হয়।
  • সূরা বাকারা প্রতিদিন পড়ুন (৩ দিনে হলেও)।
  • সদকা করুন — সামর্থ্য অনুযায়ী, অল্প হলেও।
  • ইস্তিগফার বেশি বেশি করুন।

সংক্ষেপে করণীয় তালিকা

| সময় | আমল | |------|------| | ফজরের পর | রুকইয়াহর পানি পান, আযকার | | দিনে | সূরা বাকারা/ইয়াসিন, রুকইয়াহ | | মাগরিবের পর | সন্ধ্যার আযকার, রুকইয়াহ | | ঘুমের আগে | আয়াতুল কুরসি, শেষ ২ আয়াত, ৩ কুল | | সপ্তাহে | জয়তুন তেল মালিশ, গোসল |


আল্লাহ তা'আলা আপনার সব কষ্ট দূর করুন, শিফা দান করুন, স্বামীর সাথে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিন। আমিন।

যদি ২-৩ সপ্তাহেও উন্নতি না হয়, তবে একজন বিশ্বস্ত রাকি (আহলে সুন্নাহ) এর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.