সিহর, জিনের আছর ও বদনজরের লক্ষণ, ঘরে রুকইয়াহ করার সহীহ পদ্ধতি।
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার বর্ণনা শুনে দুঃখ হলো। আপনার লক্ষণগুলো — বিশেষ করে রাতে/দিনে ঘুমে অশ্লীল স্বপ্ন, ব্যথা, শরীরে দুর্বলতা, ইবাদতে অনাগ্রহ, স্বামীর সাথে মনমালিন্য — এগুলো সিহর (জাদু), জিনের আছর, বা আইন (বদনজর) এর সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। তবে নিশ্চিতভাবে বলার জন্য রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন, তবে আপনি ঘরে বসেই কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ করতে পারবেন, ইন শা আল্লাহ।
প্রথমে করণীয়: চিকিৎসা ও রুকইয়াহ একসাথে
শাইখ ইবন বায (রহ.) বলেছেন — কুরআন দিয়ে রুকইয়াহ করা সুন্নাহসম্মত, তবে সাথে সাথে ডাক্তারি চিকিৎসাও করবেন। কারণ কিছু শারীরিক সমস্যাও (হরমোন, রক্তস্বল্পতা) এমন লক্ষণ দিতে পারে।
ঘরে রুকইয়াহ করার পদ্ধতি
১. রুকইয়াহর আগে প্রস্তুতি
- সম্পূর্ণ বিশ্বাস ও ইয়াকিন রাখুন আল্লাহই শিফা দেন।
- সব হারাম বাদ দিন — সুদ, হারাম খাবার, ছবি/মিউজিক, বেপর্দা।
- সকাল-সন্ধ্যার আযকার নিয়মিত পড়ুন (নিচে দেওয়া আছে)।
- পবিত্র অবস্থায় থাকুন, সম্ভব হলে অজু করে নিন।
২. রুকইয়াহর সময় যা পড়বেন
ক) সূরা ফাতিহা — ৭ বার খ) আয়াতুল কুরসি — ৭ বার গ) সূরা বাকারার শেষ ২ আয়াত — ৩ বার ঘ) সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস — প্রতিটি ৭ বার ঙ) সূরা ইয়াসিন — ১ বার (সম্পূর্ণ) চ) সূরা বাকারা — সম্ভব হলে সম্পূর্ণ (৩ দিনে হলেও)
৩. রুকইয়াহর দোয়া (হাদিসে বর্ণিত)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ এই দোয়া পড়ে রুকইয়াহ করতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شَافِيَ إِلَّا أَنْتَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রব্বান-নাস, আযহিবিল-বাস, ইশফি আনতাশ-শাফি, লা শাফিয়া ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, শিফা দিন; আপনিই শিফা দানকারী, আপনি ছাড়া কোনো শিফা দানকারী নেই।
(বুখারি: ৫৬৭৫, মুসলিম: ২১৯১)
ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত নবী ﷺ এর রুকইয়াহ:
بِسْمِ اللَّهِ، أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরকিকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ'যিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আউ আইনি হাসিদ, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরকিকা।
অর্থ: আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি, প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে, প্রত্যেক অনিষ্টকারী আত্মা ও হিংসুকের চোখ থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দিন। আল্লাহর নামে আমি তোমাকে রুকইয়াহ করছি।
(মুসলিম: ২১৮৬)
৪. রুকইয়াহর পদ্ধতি
- এক হাত মাথায় বা ব্যথার স্থানে রাখুন, অন্য হাত দিয়ে পড়ুন।
- পড়ার সময় ফুঁ দিন (সামান্য থুতু মিশ্রিত ফুঁ)।
- জল/তেলে পড়ে ফুঁ দিয়ে গোসল করুন ও পান করুন (নিচে দেখুন)।
- দিনে ২-৩ বার করুন, বিশেষ করে ফজর ও মাগরিবের পর।
রুকইয়াহর পানি ও তেল তৈরি
- একটি পাত্রে বিশুদ্ধ পানি নিন।
- উপরের সূরাগুলো পড়ে ফুঁ দিন (৭ বার করে)।
- সকালে খালি পেটে পান করুন, গোসল করুন।
- জয়তুন তেল বা সরিষার তেলে পড়ে ফুঁ দিয়ে ব্যথার স্থানে ও মাথায় লাগান।
- ৭ দিন নিয়মিত করুন, ইন শা আল্লাহ উপকার পাবেন।
সকাল-সন্ধ্যার আযকার (সবচেয়ে জরুরি)
শাইখ ইবন উসাইমিন (রহ.) বলেছেন — আযকারই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
- সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার: বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু...
- ৩ বার: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক
- ৩ বার: বিসমিল্লাহি লাযি লা ইয়াদুররু মাআস-মিহি শাইউন...
- ৭ বার: হাসবিয়াল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়া...
- সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস — সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে।
স্বামীর সাথে মনমালিন্যের সমাধান
এটি সিহরের প্রভাবও হতে পারে, আবার শয়তানের কুমন্ত্রণাও। করণীয়:
- স্বামীকে রুকইয়াহর পানি পান করান — জেনে বা না জেনে।
- রাতে ঘুমানোর আগে সূরা বাকারার শেষ ২ আয়াত পড়ুন (শয়তান ঘরে ঢুকতে পারে না — বুখারি: ৫০০৯)।
- রাগের সময় চুপ থাকুন — নবী ﷺ বলেছেন: "রাগ হলে চুপ থাকো" (মুসনাদ আহমাদ)।
- সালাতুল হাজাত পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
- সালাম দেওয়া বাড়িয়ে দিন, ছোট উপহার দিন — শয়তানের কুমন্ত্রণা ভাঙবে।
- শাইখ ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন — স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা শয়তানের সবচেয়ে বড় কাজ, তাই আযকার ও কুরআন দিয়ে তা মোকাবেলা করুন।
ইন্টিমেট সম্পর্কে অনাগ্রহ
এটি সিহর/জিনের আছরের একটি সাধারণ লক্ষণ। পাশাপাশি:
- হরমোন পরীক্ষা করান (থাইরয়েড, প্রোল্যাক্টিন)।
- জ্বালাপোড়ার জন্য ডাক্তার দেখান — সংক্রমণ হতে পারে।
- রুকইয়াহ চালিয়ে যান, ইন শা আল্লাহ ভালো হবে।
সবচেয়ে জরুরি উপদেশ
শাইখ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন: "রুকইয়াহ একটি উপায়, কিন্তু শিফা দেন একমাত্র আল্লাহ। তাই তাওবা, ইস্তিগফার, সালাত ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিন।"
- তাহাজ্জুদ পড়ুন — এ সময় দোয়া কবুল হয়।
- সূরা বাকারা প্রতিদিন পড়ুন (৩ দিনে হলেও)।
- সদকা করুন — সামর্থ্য অনুযায়ী, অল্প হলেও।
- ইস্তিগফার বেশি বেশি করুন।
সংক্ষেপে করণীয় তালিকা
| সময় | আমল | |------|------| | ফজরের পর | রুকইয়াহর পানি পান, আযকার | | দিনে | সূরা বাকারা/ইয়াসিন, রুকইয়াহ | | মাগরিবের পর | সন্ধ্যার আযকার, রুকইয়াহ | | ঘুমের আগে | আয়াতুল কুরসি, শেষ ২ আয়াত, ৩ কুল | | সপ্তাহে | জয়তুন তেল মালিশ, গোসল |
আল্লাহ তা'আলা আপনার সব কষ্ট দূর করুন, শিফা দান করুন, স্বামীর সাথে ভালোবাসা ফিরিয়ে দিন। আমিন।
যদি ২-৩ সপ্তাহেও উন্নতি না হয়, তবে একজন বিশ্বস্ত রাকি (আহলে সুন্নাহ) এর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করুন।