নৌকা বাইচ দেখা, নৌকা বাইচে টাকা দেওয়া ও বিজয়ীকে পুরস্কার দেওয়ার শরীয়তসম্মত বিধান কী?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
নৌকা বাইচ দেখা, টাকা দেওয়া ও পুরস্কার দেওয়ার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
নৌকা বাইচ (boat race) প্রতিযোগিতা দেখা, তাতে টাকা প্রদান করা এবং বিজয়ীকে পুরস্কার দেওয়া—এসবের শরীয়তসম্মত বিধান কী?
বিস্তারিত উত্তর
১. মূলনীতি: শরীয়তে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ভিত্তি
ইসলামে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার প্রদানের বৈধতা কেবল সেই সব খেলাধুলায় রয়েছে, যা দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো বৈধ স্বার্থ সাধন করে এবং যাতে শরীয়তবিরোধী কোনো উপাদান থাকে না। ফিকহে হানাফির মূল গ্রন্থসমূহে এ বিষয়ে স্পষ্ট নীতি বর্ণিত হয়েছে।
আল-হিদায়াহ-তে বর্ণিত আছে:
وَلَا يَجُوزُ السَّبْقُ إلَّا فِي الْخَيْلِ وَالْإِبِلِ وَالسِّلَاحِ، وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ
অর্থ: "ঘোড়দৌড়, উটদৌড় এবং অস্ত্র চালনায় (তীরন্দাজি) ছাড়া অন্য কোনো প্রতিযোগিতায় (পুরস্কারমূলক) প্রতিযোগিতা বৈধ নয়। এটাই ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত।"
(আল-হিদায়াহ, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবন আবিদীন শামী (রহ.) বলেন:
وَالْحَاصِلُ أَنَّ الْمُسَابَقَةَ بِعِوَضٍ لَا تَجُوزُ إلَّا فِي هَذِهِ الثَّلَاثَةِ
অর্থ: "সারকথা হলো, বিনিময়সহ (পুরস্কারমূলক) প্রতিযোগিতা কেবল এই তিনটিতেই বৈধ—ঘোড়দৌড়, উটদৌড় ও তীরন্দাজি।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল জিহাদ)
২. নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা: ফিকহি বিশ্লেষণ
নৌকা বাইচ উপরের তিনটি বৈধ প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে এর বিধান নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের উপর:
(ক) যদি নৌকা বাইচ কেবল বিনোদন ও সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে হয় এবং তাতে কোনো জুয়া বা অর্থের লেনদেন না থাকে:
এমতাবস্থায় শুধু দর্শন হিসেবে দেখা—যদি তাতে শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে (যেমন: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা, অশ্লীলতা, মাদক, হারাম সংগীত ইত্যাদি)—তাহলে মূলত তা মubah (অনুমোদিত) বা কিছু ক্ষেত্রে মাকরূহ হতে পারে। তবে ইসলামে এ ধরনের অপ্রয়োজনীয় খেলায় সময় ও শ্রম ব্যয় করা উত্তম নয়।
(খ) যদি নৌকা বাইচে টাকা দেওয়া হয় (অংশগ্রহণ ফি বা বাজি হিসেবে):
এটি জুয়া (قمار)-এর অন্তর্ভুক্ত হবে, যা কুরআনে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।"
(সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)
যদি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মধ্যে টাকা রেখে বাজি ধরে যে "যে জিতবে সে সব টাকা নেবে"—তাহলে তা নিঃসন্দেহে জুয়া। আর যদি কেবল দর্শক বা আয়োজক পক্ষ থেকে বিজয়ীকে পুরস্কার দেওয়া হয় এবং অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া না হয়, তাহলে সেটি জুয়া নয়; বরং তা সাধারণ ইনাম/পুরস্কার।
(গ) যদি আয়োজক বা কোনো পক্ষ বিজয়ীকে পুরস্কার দেয়, কিন্তু অংশগ্রহণকারীরা কোনো টাকা জমা দেয় না:
এক্ষেত্রে দুটি দিক বিবেচ্য:
-
যদি পুরস্কারের উদ্দেশ্য হয় বৈধ বিনোদন ও উৎসাহ প্রদান, এবং তাতে কোনো জুয়া, বাজি বা শরীয়তবিরোধী উপাদান না থাকে—তাহলে মূলত তা জায়েজ হতে পারে। কারণ এটি হিবা (দান) বা ইনাম (পুরস্কার)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা শরীয়তে বৈধ।
-
তবে যদি এই প্রতিযোগিতা এমন হয় যাতে সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হয়, অথবা তাতে গুনাহের পরিবেশ থাকে—তাহলে তা মাকরূহে তাহরীমি বা নাজায়েজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ার বক্তব্য
ফতোয়ায়ে উসমানি-তে (খণ্ড ৩, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহাহ) উল্লেখ আছে যে, যে সব খেলায় জুয়া বা বাজি থাকে, তা হারাম। আর যে সব খেলায় জুয়া নেই এবং শরীয়তবিরোধী কিছু নেই, তা মূলত জায়েজ; তবে যদি তা দ্বীনি দায়িত্ব থেকে গাফিল করে বা সময়ের অপচয় ঘটায়, তাহলে তা মাকরূহ।
ইমদাদুল ফতোয়া-তে হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন:
جو کھیل شرعی ممنوعات سے خالی ہو اور اس میں کوئی دینی یا دنیوی فائدہ ہو تو وہ جائز ہے، ورنہ نہیں۔
অর্থ: "যে খেলা শরীয়তের নিষিদ্ধ বিষয় থেকে মুক্ত এবং যাতে দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকার রয়েছে, তা জায়েজ; অন্যথায় নয়।"
৪. সারসংক্ষেপ ও ফতোয়া
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | নৌকা বাইচ দেখা (শরীয়তবিরোধী পরিবেশ ছাড়া) | মূলত জায়েজ, তবে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় হলে মাকরূহ | | অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাজি ধরা | হারাম (জুয়া) | | দর্শক/আয়োজক পক্ষ থেকে বিজয়ীকে পুরস্কার দেওয়া (কোনো বাজি ছাড়া) | মূলত জায়েজ, যদি শরীয়তবিরোধী কিছু না থাকে | | নৌকা বাইচে টাকা দেওয়া (বাজি হিসেবে) | হারাম | | নৌকা বাইচে টাকা দেওয়া (সাধারণ দান/সponsর হিসেবে, শর্তহীন) | জায়েজ, তবে উত্তম নয় |
চূড়ান্ত ফতোয়া: নৌকা বাইচে যদি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে টাকা রেখে প্রতিযোগিতা হয় (যেমন: "যে জিতবে সে টাকা পাবে")—তাহলে তা জুয়া হওয়ার কারণে হারাম। আর যদি কেবল আয়োজক বা কোনো ব্যক্তি বিজয়ীকে পুরস্কার দেয় এবং অংশগ্রহণকারীরা কোনো টাকা জমা না দেয়—তাহলে তা মূলত জায়েজ; তবে এতে সময়ের অপচয় ও গুনাহের পরিবেশ থাকলে তা মাকরূহ। আর শুধু দেখা—যদি পরিবেশ পবিত্র থাকে, তাহলে জায়েজ; অন্যথায় নাজায়েজ।
আরবি সারসংক্ষেপ (خلاصة الفتوى)
السؤال: ما حكم مشاهدة سباق القوارب، ودفع المال فيه، وإعطاء الجائزة للفائز؟
الجواب: إذا كان سباق القوارب مشتملاً على المراهنة والمال المدفوع من المتسابقين، فهو قمار محرم بنص القرآن الكريم: ﴿إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ...﴾ [المائدة: ٩٠]۔ وأما إذا أعطى المنظم أو شخص آخر جائزة للفائز دون أن يدفع المتسابقون مالاً، فهو جائز في الأصل إن خلا عن المحرمات، لكنه مكروه إذا أدى إلى تضييع الوقت أو اشتمل على منكرات۔ وأما مجرد المشاهدة فجائزة إذا كان المجلس خالياً عن المحرمات، وإلا فلا۔
المراجع: الهداية، رد المحتار (٦/٤٠٠)، فتاوى عثماني (٣/٤٥٠)، إمداد الفتاوى، فتاوى عالمكيري (٥/৩৫৮)۔
তথ্যসূত্র:
- আল-হিদায়াহ, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন শামী), খণ্ড ৬
- ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩
- ইমদাদুল ফতোয়া, হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.)
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি, খণ্ড ৫
- মা'আরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শাফী (রহ.)
- তুহফাতুল ফুকাহা, আলাউদ্দিন সামারকান্দি