আজানের সময় দোয়া কবুল হয়—কিন্তু নাম ধরে লানত করা কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আজানের সময় নাম ধরে লানত করার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—আজানের সময় দোয়া কবুল হয়; কিন্তু কেউ যদি আজানের পর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ধরে লানত (অভিশাপ) করতে থাকে, তাহলে সেই লানতের কী হবে? অর্থাৎ তা কবুল হবে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আজানের সময় দোয়া কবুল হওয়ার যে বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, তা নেক দোয়ার জন্য এবং শর্তসাপেক্ষে। নাম ধরে কারো বিরুদ্ধে লানত করা বা অভিশাপ দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। আজানের সময় হলেও এমন লানত কবুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই; বরং তা বান্দার নিজের আমলনামায় গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। তবে হ্যাঁ, যদি কেউ প্রকৃত জালিম ও অত্যাচারী হয় এবং প্রমাণিতভাবে তার জুলুমের কারণে শরিয়তসম্মতভাবে বদদোয়া করা হয়, তাহলে তা ভিন্ন বিষয়—তবুও সাধারণ মুসলিমকে নাম ধরে লানত করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
বিস্তারিত আলোচনা
১. আজানের সময় দোয়া কবুল হওয়ার হাদিস
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন—
«الدُّعَاءُ لَا يُرَدُّ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ»
"আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া رد করা হয় না।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২১; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২১২; মুসনাদে আহমাদ
অন্য বর্ণনায় এসেছে—
«ثِنْتَانِ لَا تُرَدَّانِ: الدُّعَاءُ عِنْدَ النِّدَاءِ، وَعِنْدَ الْبَأْسِ حِينَ يُلْحِمُ بَعْضُهُمْ بَعْضًا»
"দুটি দোয়া رد করা হয় না—আজানের সময় এবং যুদ্ধের সময় যখন দুই পক্ষ পরস্পরে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২৫৪০
মুহাদ্দিসিনের ব্যাখ্যা: এই দোয়া কবুলের সুযোগ নেক দোয়া ও কল্যাণের জন্য। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এ সময়ের দোয়া কবুল হওয়া বিশেষ রহমত—তা আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার জন্য।
২. নাম ধরে লানত করা ইসলামে নিষিদ্ধ
কোনো নির্দিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিকে নাম ধরে লানত করা বা অভিশাপ দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
«وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا»
"আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখো না।"
— সূরা হাশর, আয়াত ১০
আর রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—
«لَا تَلَاعَنُوا بِلَعْنَةِ اللَّهِ وَلَا بِغَضَبِ اللَّهِ وَلَا بِالنَّارِ»
"তোমরা একে অপরকে আল্লাহর লানত, আল্লাহর গজব বা জাহান্নামের আগুন দিয়ে অভিশাপ দিও না।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯০৬; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৬
ইমাম ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন—
"কোনো মুসলিমকে বিনা কারণে লানত করা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।"
— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৪০০-এর কাছাকাছি
৩. আজানের সময় লানত কবুল হবে কি?
উত্তর: না। কারণ—
-
দোয়া কবুলের শর্ত: দোয়া কবুল হওয়ার জন্য দোয়াকারীর হালাল রুজি, নেক নিয়ত ও বৈধ বিষয় হওয়া শর্ত। লানত করা বৈধ বিষয় নয়, তাই তা কবুল হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
-
আজানের সময়ের ফজিলত: এই সময়ের ফজিলত নেক আমল ও কল্যাণের জন্য নির্ধারিত। এ সময়কে গুনাহের কাজে ব্যবহার করা আরও বড় গুনাহ।
-
হাদিসের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ ﷺ আজানের সময় নিজে দোয়া করতেন এবং সাহাবিদের কল্যাণের দোয়া শেখাতেন—লানত নয়।
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে—
"আজানের সময় দোয়া কবুল হয়, কিন্তু তা শর্তসাপেক্ষে—নেক দোয়ার জন্য। গুনাহের কাজ বা কারো বিরুদ্ধে বদদোয়া এ সময়ের ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"
— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৭-এর কাছাকাছি
৪. ব্যতিক্রম: জালিমের বিরুদ্ধে বদদোয়া
যদি কেউ প্রকৃত জালিম হয়, প্রমাণিতভাবে অত্যাচার করে এবং শরিয়তসম্মতভাবে তার বিরুদ্ধে বদদোয়া করা হয়—যেমন কুরআনে ফিরআউন, আবু লাহাব প্রমুখের বিরুদ্ধে লানত এসেছে—তাহলে তা ভিন্ন। কিন্তু সাধারণ মুসলিমকে নাম ধরে ব্যক্তিগত লানত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ—
«وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ»
"ভালো ও মন্দ সমান নয়; মন্দের জবাব দাও উত্তম দিয়ে।"
— সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩৪
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ বলেন—
"জালিমের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা জায়েজ, তবে তা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে নয়; বরং জুলুমের প্রতিকার ও দ্বীনের হেফাজতের জন্য হতে হবে।"
— মাআরিফুল কুরআন, সূরা হাশর, আয়াত ১০-এর তাফসির
৫. করণীয়
- নাম ধরে লানত করা থেকে বিরত থাকুন—এটি গুনাহ।
- আজানের সময় নেক দোয়া করুন—নিজের, পরিবারের, উম্মাহর কল্যাণ কামনা করুন।
- কারো প্রতি বিদ্বেষ থাকলে আল্লাহর কাছে হেদায়েতের দোয়া করুন।
- প্রকৃত জালিমের বিরুদ্ধে শরিয়তসম্মতভাবে বিচার চান বা আল্লাহর কাছে ন্যায়ের দোয়া করুন—ব্যক্তিগত লানত নয়।
উপসংহার
আজানের সময় দোয়া কবুল হয়—এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু এই ফজিলত নেক দোয়ার জন্য। নাম ধরে লানত করা ইসলামে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ; আজানের সময় হলেও তা কবুল হবে না, বরং গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। তাই মুসলিমের উচিত—আজানের সময়কে কল্যাণের দোয়ায় কাজে লাগানো, কারো বিরুদ্ধে লানত নয়।
তবে যদি মাজলুম জালেমের বিরুদ্ধে লানত করে তাহলে সর্বাবস্থায় তাহা কবুল হবে।
📚 তথ্যসূত্র
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫২১, ২৫৪০, ৪৯০৬
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২১২, ১৯৭৬
- মুসনাদে আহমাদ
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন শামি), খণ্ড ৬
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- ফাতাওয়া আলমগিরি
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি)