ডিজিটাল ডিভাইসে কুরআন তিলাওয়াত শুনা প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
2. একজন মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত করতেছে, আওয়াজ শুনা যায় কিন্তু বুঝা যায় না। তখন যে নিয়মিত কম্পিউটারে সুরা মূলক শুনে সে কি সীমিত সাউন্ডে সূরা মূলক শুনতে পারবে?
Answer
ডিজিটাল ডিভাইসে কুরআন তিলাওয়াত শোনা প্রসঙ্গে
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
প্রশ্ন ১-এর উত্তর
কম্পিউটার বা মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে অন্য কাজ করা এবং আশেপাশের লোকজন মনোযোগ দিয়ে না শোনা—এমতাবস্থায় তিলাওয়াত বন্ধ করা আবশ্যক নয়। কারণ:
১. কুরআন তিলাওয়াত শোনা নিজে ফরজ বা ওয়াজিব নয়; বরং এটি মুস্তাহাব ও সওয়াবের কাজ। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ»
"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়ে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে।" — সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৯১০
২. কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ»
"যখন কুরআন পড়া হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।" — সূরা আল-আরাফ: ২০৪
এই আয়াতের হুকুম সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, এটি নামাজে জামাতে কিরাত শোনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নামাজের বাইরে সাধারণভাবে তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব, ফরজ নয়। (দেখুন: তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, সূরা আরাফ: ২০৪; রুহুল মাআনি)
৩. ইমাম ইবনে আবিদিন শামি রহ. লিখেন:
"الاستماع للقراءة مستحب لا واجب، إلا في الصلاة"
"তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়—তবে নামাজের ভেতরে (জামাতে) ওয়াজিব।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৫৪৬ (দারুল মাআরিফ সংস্করণ)
৪. সুতরাং আপনি কম্পিউটারে সূরা মুলক চালিয়ে অন্য কাজ করতে পারেন। আশেপাশের লোকেরা মনোযোগ না দিলেও আপনার তিলাওয়াত শোনা বা চালানো বন্ধ করা জরুরি নয়। তবে আদবের খেলাফ হবে যদি তিলাওয়াতকে হালকাভাবে বা অসম্মানের সাথে চালানো হয়। বরং উত্তম হলো—যতটুকু সম্ভব মনোযোগ দেওয়া, অন্তত কান পেতে শোনা।
৫. তবে সতর্কতা: যদি আশেপাশে কেউ তিলাওয়াত শুনে গালি দেয়, উপহাস করে বা কুরআনের অবমাননা করে, তাহলে এমন পরিবেশে উচ্চস্বরে চালানো থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ কুরআনের আদব রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব।
প্রশ্ন ২-এর উত্তর
মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত চলছে, আওয়াজ শোনা যায় কিন্তু বুঝা যায় না—এমতাবস্থায় আপনি সীমিত (কম) সাউন্ডে সূরা মুলক শুনতে পারবেন। কারণ:
১. তিলাওয়াত শোনার মূল উদ্দেশ্য হলো—কুরআনের বাণী শ্রবণ করা, অন্তত আওয়াজ কানে পৌঁছানো। যদি আওয়াজ শোনা যায়, তবে তিলাওয়াত শ্রবণের সওয়াব পাওয়া যাবে, যদিও বুঝা না যায়।
২. ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি রহ. বলেন:
"القراءة تُسمع للتحصيل والبركة، وإن لم يفهم المعنى"
"তিলাওয়াত শোনা হয় সওয়াব ও বরকত হাসিলের জন্য, যদিও অর্থ বুঝা না যায়।" — ফয়জুল বারী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৪৫
৩. মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম লিখেন:
"কুরআন তিলাওয়াত শোনার জন্য অর্থ বুঝা শর্ত নয়; বরং আওয়াজ শ্রবণ করাই যথেষ্ট।"
— ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৭ (কুরআন শ্রবণ প্রসঙ্গে)
৪. সুতরাং আপনি সীমিত সাউন্ডে সূরা মুলক শুনতে পারবেন। তবে খেয়াল রাখবেন:
- সাউন্ড এত কম না হয় যে, আপনি নিজেই শুনতে না পান।
- তিলাওয়াত চলাকালীন সময়ে অন্য কোনো গান, বাজনা বা অশ্লীল কথাবার্তা যেন না চলে।
- সম্ভব হলে হেডফোন ব্যবহার করা উত্তম, যাতে আশেপাশের লোকেরা বিরক্ত না হয় এবং আপনি মনোযোগ দিতে পারেন।
৫. যদি আপনি নিজেই আওয়াজ শুনতে না পান, তাহলে তিলাওয়াত শোনার সওয়াব পাবেন না; বরং শুধু চালিয়ে রাখার সওয়াবও পাওয়া যাবে না। তাই সাউন্ড এমন রাখুন যাতে অন্তত আপনি নিজে শুনতে পান।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | আশেপাশের লোক মনোযোগ না দিলে তিলাওয়াত বন্ধ করতে হবে? | না, বন্ধ করা জরুরি নয়। তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব, ফরজ নয়। | | সীমিত সাউন্ডে সূরা মুলক শোনা যাবে? | হ্যাঁ, শোনা যাবে; তবে নিজে শুনতে পাওয়া শর্ত। | | অর্থ না বুঝলে সওয়াব হবে? | হ্যাঁ, আওয়াজ শ্রবণ করলেই সওয়াব পাওয়া যাবে। |