মাগরিবের পর সূরা ওয়াকিয়ার তিলাওয়াত শুনা সম্পর্কে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২) একজন মোবাইলে কুরআন তিলাওয়াত করতেছে, তার পাশে আরেকজন কম্পিউটারে সূরা তিলাওয়াত শুনতে পারবে (পরিমিত সাউন্ডে)? এতে গুনাহ হবে?
Answer
প্রথম প্রশ্নের উত্তর
সূরা ওয়াকিয়ার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْوَاقِعَةِ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ لَمْ تُصِبْهُ فَاقَةٌ أَبَدًا
"যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে, তার কখনো দারিদ্র্য আসবে না।"
(বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮; ইবনে আসাকির; তাফসীরে কুরতুবি)
তিলাওয়াত শোনার বিধান
কুরআন তিলাওয়াত শোনা নিজেই একটি ইবাদত এবং সাওয়াবের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
"যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।"
(সূরা আল-আরাফ: ২০৪)
ফকীহগণের মত
১. নিজে তিলাওয়াত না করে শুধু শোনার ক্ষেত্রে:
-
যদি কেউ নিজে তিলাওয়াত করতে অক্ষম হয় বা ব্যস্ত থাকে, তবে অন্যের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শুনলে সে-ও সাওয়াব পাবে। কারণ শ্রবণও কুরআনের খিদমতের অন্তর্ভুক্ত।
-
তবে হাদিসে বর্ণিত "প্রতি রাতে পাঠ করার" বিশেষ ফজিলতটি নিজে পাঠ করার সাথে সম্পৃক্ত। শুধু শোনার দ্বারা সেই বিশেষ ফজিলত (দারিদ্র্য থেকে মুক্তি) পাওয়া যাবে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
২. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"কুরআন শ্রবণ করা ইবাদত, তবে যে ফজিলত পাঠকের জন্য বর্ণিত হয়েছে তা পাঠকের জন্যই নির্দিষ্ট। শ্রবণকারী আলাদা সাওয়াব পাবে।"
(রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃ: ৬৩০-এর কাছাকাছি)*
৩. মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) এর বক্তব্য:
"কুরআন তিলাওয়াত শোনা সাওয়াবের কাজ। কিন্তু হাদিসে যে বিশেষ ফজিলত নিজে পাঠ করার সাথে যুক্ত, তা শোনার মাধ্যমে হাসিল হবে না। তবে শ্রবণকারীও কুরআন শ্রবণের সাধারণ সাওয়াব পাবে।"
(ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ১, পৃ: ৩২৫-এর কাছাকাছি)*
সারসংক্ষেপ (প্রথম প্রশ্ন)
| বিষয় | বিধান | |------|------| | অন্যের তিলাওয়াত শোনা | জায়েজ, সাওয়াবের কাজ | | শ্রবণকারী সাওয়াব পাবে কি? | হ্যাঁ, কুরআন শ্রবণের সাওয়াব পাবে | | সূরা ওয়াকিয়ার বিশেষ ফজিলত (দারিদ্র্য থেকে মুক্তি) | নিজে পাঠ করলেই পাওয়া যাবে; শুধু শুনলে সেই বিশেষ ফজিলত পাওয়া যাবে বলে নিশ্চিত নয় | | সমাধান | সম্ভব হলে নিজে পাঠ করুন; না পারলে শুনুন এবং নিয়মিত করার চেষ্টা করুন |
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
একাধিক ডিভাইসে ভিন্ন তিলাওয়াত শোনার বিধান
১. মূলনীতি:
কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা জায়েজ। তবে একই সময়ে একাধিক তিলাওয়াত একসাথে মিশে গেলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয় এবং কুরআনের আদব রক্ষা হয় না।
২. ফকীহগণের মত:
ইমাম বদরুদ্দীন আইনি (রহ.) "আল-বিনায়া" গ্রন্থে বলেন:
"কুরআন শ্রবণের সময় মনোযোগ দেওয়া ওয়াজিব। যদি একাধিক তিলাওয়াত একসাথে মিশে যায় এবং অর্থ বোঝা না যায়, তবে তা আদবের পরিপন্থী।"
ইবনে আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন:
"কুরআন তিলাওয়াত এমনভাবে শোনা উচিত যাতে তিলাওয়াতের আদব ও মর্যাদা রক্ষা হয়। একাধিক আওয়াজ একসাথে মিশে গেলে তা আদবের খেলাফ।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃ: ৬৩২)*
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ বলেন:
"কুরআন শোনার সময় নীরবতা ও মনোযোগ আবশ্যক। এলোমেলোভাবে একাধিক তিলাওয়াত শোনা কুরআনের মর্যাদার পরিপন্থী।" (মাআরিফুল কুরআন, সূরা আরাফ: ২০৪-এর তাফসীর)*
৩. প্রয়োগ:
- যদি দুটি তিলাওয়াত একসাথে মিশে যায় এবং কোনোটিই স্পষ্ট বোঝা না যায় → মাকরূহ (আদবের খেলাফ)।
- যদি পরিমিত সাউন্ডে হয় এবং একটির সাথে অন্যটি মিশে না যায়, তবে জায়েজ।
- তবে উত্তম হলো: একসাথে একটিই তিলাওয়াত শোনা, যাতে মনোযোগ ও আদব রক্ষা হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮
- তাফসীরে কুরতুবি, সূরা ওয়াকিয়া
- রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদিন, খণ্ড: ১
- মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, সূরা আরাফ: ২০৪
- ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড: ১
- আল-বিনায়া, বদরুদ্দীন আইনি
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ৫
والله سبحانه وتعالى أعلم بالصواب