জামা'আতে আজানের উত্তর দেওয়ার বিধান ও অনলাইন দারসের ক্ষেত্রে প্রয়োগ।
Salah-Prayer · Hanafi
Question
উস্তায, আমি শুনেছি কোনো জামা'আতে যেমন দ্বীনি আলোচনা, দারস, তাদরীস, তালিম চলমান থাকাবস্থায় আজান হয়ে গেলে উক্ত মাজলিশের একজন ভাই আজানের উত্তর দিলে বাকিদের পক্ষ হতে তা আদায় হয়ে যায়, সবাই সমপরিমাণ সওয়াবের অংশীদার হবে।
এই বিষয়টা কি অনলাইন দারস, তালিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে?
যেহেতু অনলাইন ক্লাসে ত্বলিব ভাইয়েরা একেকজন একেক শহরে থাকেন। সেক্ষেত্রে আজানের সময় কিছুটা হেরফের হয়। একজন নিজ যায়গায় বসে আজানের উত্তর দিলে দারসে উপস্থিত বাকি ভাইয়েরা কি সওয়াব পেয়ে যাবে?
Answer
জামা'আতে আজানের উত্তর দেওয়ার বিধান ও অনলাইন দারসের ক্ষেত্রে প্রয়োগ
ভূমিকা
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে অনলাইন দারস, তালিম ও দ্বীনি আলোচনার প্রসার ঘটেছে। এমতাবস্থায় আজানের সময় কী করণীয় এবং একজন উত্তর দিলে বাকিরা সওয়াব পাবে কি না—এ বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে জানা প্রয়োজন।
প্রথমত: আজানের উত্তর দেওয়ার বিধান
আজান শুনলে উত্তর দেওয়া সুন্নত। হাদিসে এসেছে—
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى، قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكٍ عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَزِيدَ اللَّيْثِيِّ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «إِذَا سَمِعْتُمُ النِّدَاءَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ الْمُؤَذِّنُ»
অর্থ: "যখন তোমরা আজান শুনবে, তখন মুয়াজ্জিন যা বলে তা-ই বলবে।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৩; সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১১
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, আজানের উত্তর দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। — শরহে মুসলিম লি-নববী, ৪/৮৬
দ্বিতীয়ত: জামা'আতে একজন উত্তর দিলে বাকিরা সওয়াব পাবে কি?
ফুকাহায়ে কেরামের মত:
হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, আজানের উত্তর দেওয়া প্রত্যেক শ্রবণকারীর জন্য পৃথকভাবে সুন্নত। এটি এমন ইবাদত নয় যা জামা'আতের সাথে আদায় হয়, বরং এটি একটি যিকর যা প্রত্যেকে নিজে আদায় করবে।
রদ্দুল মুহতার-এ আছে—
وَيُجِيبُ الْمُؤَذِّنَ كُلُّ مَنْ سَمِعَهُ، وَهُوَ سُنَّةٌ عَلَى كُلِّ وَاحِدٍ
অর্থ: "আজান শ্রবণকারী প্রত্যেকেই উত্তর দেবে, এবং তা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সুন্নত।" — রদ্দুল মুহতার, ১/৩৯৮
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে—
إِجَابَةُ الْمُؤَذِّنِ سُنَّةٌ عَلَى كُلِّ مَنْ سَمِعَ الْأَذَانَ
অর্থ: "আজানের উত্তর দেওয়া প্রত্যেক শ্রবণকারীর জন্য সুন্নত।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৬
সুতরাং:
একজন উত্তর দিলে বাকিদের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যায়—এ ধারণা সঠিক নয়। বরং প্রত্যেক শ্রবণকারীর জন্য নিজে উত্তর দেওয়া সুন্নত। তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে না দেয়, তাহলে সে সুন্নতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে, কিন্তু গুনাহগার হবে না।
তৃতীয়ত: অনলাইন দারস ও তালিমের ক্ষেত্রে বিধান
১. আজানের সময় হেরফের হওয়া:
অনলাইনে একেকজন একেক শহরে থাকায় আজানের সময় ভিন্ন হয়। এমতাবস্থায়—
- যে ব্যক্তি নিজের এলাকায় আজান শুনবে, সে নিজে উত্তর দেবে।
- যে ব্যক্তি আজান শুনবে না (কারণ তার এলাকায় এখনো আজান হয়নি বা হয়ে গেছে), তার উপর উত্তর দেওয়া ওয়াজিব নয়।
মারাকিল ফালাহ-এ আছে—
وَلَا يُجِيبُ مَنْ لَمْ يَسْمَعْ
অর্থ: "যে শুনবে না, সে উত্তর দেবে না।" — মারাকিল ফালাহ, পৃ. ১৪৪
২. অনলাইন ক্লাসে একজন উত্তর দিলে বাকিরা সওয়াব পাবে কি?
উত্তর: না। কারণ—
- আজানের উত্তর দেওয়া শ্রবণের সাথে সম্পর্কিত। যে শ্রবণ করবে, সে-ই উত্তর দেবে।
- অনলাইন ক্লাসে সবাই একই সময়ে আজান শুনছে না—একজনের এলাকায় আজান হয়েছে, অন্যজনের হয়নি।
- এটি জামা'আতের ইবাদত নয় যে একজন আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।
ফাতাওয়া উসমানি-তে আধুনিক প্রযুক্তিগত বিষয়ে বলা হয়েছে—
الْعِبَادَاتُ الَّتِي تَتَعَلَّقُ بِالشَّخْصِ لَا تَنُوبُ فِيهَا الْوِكَالَةُ وَلَا النِّيَابَةُ إِلَّا مَا وَرَدَ بِهِ الشَّرْعُ
অর্থ: "যে ইবাদত ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত, তাতে ওকালত বা নিয়াবত চলবে না, তবে যা শরীয়ত প্রমাণিত করেছে।" — ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫২৭ (মূলনীতি)
চতুর্থত: সঠিক পদ্ধতি
অনলাইন দারস বা তালিম চলাকালীন আজান হলে:
- যার এলাকায় আজান হচ্ছে, সে চুপচাপ আজানের উত্তর দেবে (দারস চলমান থাকলে সে নিচু স্বরে উত্তর দেবে)।
- যার এলাকায় আজান হয়নি, সে উত্তর দেবে না।
- দারস পরিচালনাকারী উস্তায যদি চান, তাহলে সাময়িক বিরতি দিয়ে সবাইকে আজানের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিতে পারেন—এটি উত্তম।
- আজানের উত্তর দেওয়ার সময় দারসের কথা শোনা বন্ধ রাখা জরুরি নয়, তবে উত্তম হলো মনোযোগ দিয়ে উত্তর দেওয়া।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | আজানের উত্তর দেওয়া | প্রত্যেক শ্রবণকারীর জন্য সুন্নত | | একজন উত্তর দিলে বাকিরা সওয়াব পাবে? | না, প্রত্যেকে নিজে উত্তর দেবে | | অনলাইন দারসে প্রযোজ্য? | হ্যাঁ, তবে শুধু যার এলাকায় আজান হয় সে-ই উত্তর দেবে | | একেক শহরে ভিন্ন সময় হলে? | যে যখন শুনবে, তখন উত্তর দেবে | | দারস চলাকালীন উত্তর দেওয়া? | নিচু স্বরে উত্তর দেওয়া যাবে |
উপদেশ
আজানের উত্তর দেওয়া একটি মহান সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ الْمُؤَذِّنَ... غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ»
অর্থ: "যে ব্যক্তি আজান শুনে (উত্তর দেয়)... তার গুনাহ ক্ষমা করা হয়।" — সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৪
অতএব, প্রত্যেকে নিজে আজানের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন। অনলাইন দারসের ক্ষেত্রে যার এলাকায় আজান হচ্ছে, সে যেন অবশ্যই উত্তর দেয়। আর যার হয়নি, সে পরে নিজের এলাকায় আজান হলে উত্তর দেবে।
রেফারেন্স:
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১১
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩৮৩-৩৮৪
- রদ্দুল মুহতার, ১/৩৯৮
- ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৬
- মারাকিল ফালাহ, পৃ. ১৪৪
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫২৭
- শরহে মুসলিম লি-নববী, ৪/৮৬