গান শোনা হারাম বিষয়ে বিস্তারিত।
Halal and Haram · Hanafi
Question
গান শোনা হারাম এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই ইনশাআল্লাহ
Answer
গান শোনা হারাম বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়া
**উত্তরঃ-
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
ভূমিকা
ইসলামে গান-বাজনা ও সংগীতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমা-এ উম্মতের আলোকে ফকীহগণ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হানাফী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহগণ গান-বাজনাকে হারাম বলেছেন।
১. কুরআনুল কারীমের দলীল
(ক) সূরা লুকমান, আয়াত ৬
وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ
অনুবাদ: "আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করার জন্য অর্থহীন কথাবার্তা (لهو الحديث) ক্রয় করে এবং তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।"
তাফসীর: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত মুজাহিদ (রহঃ) প্রমুখ সাহাবী ও তাবেঈন "لهو الحديث" (অর্থহীন কথা)-এর তাফসীরে বলেছেন—এটি হলো গান-বাজনা।
রেফারেন্স:
- তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা লুকমান, আয়াত ৬
- তাফসীরে তাবারী, ২১/৪০
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.), সূরা লুকমানের তাফসীর
(খ) সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ৬৪
وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُم بِصَوْتِكَ
অনুবাদ: "আর তাদের মধ্যে যাকে পারো তোমার কণ্ঠস্বর দ্বারা প্ররোচিত কর।"
তাফসীর: মুফাসসিরগণ বলেন, "صوت" (কণ্ঠস্বর) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো গান-বাজনা ও বাঁশি।
রেফারেন্স: তাফসীরে ইবনে কাসীর; তাফসীরে কুরতুবী
(গ) সূরা নাজম, আয়াত ৫৯-৬১
أَفَمِنْ هَٰذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ ۞ وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ ۞ وَأَنتُمْ سَامِدُونَ
অনুবাদ: "তোমরা কি এই কথায় বিস্মিত হও? এবং হাসো, কাঁদো না? আর তোমরা গাফেল (سامدون)?"
তাফসীর: হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, "سامدون" অর্থ গান গাওয়া।
রেফারেন্স: তাফসীরে ইবনে কাসীর; তাফসীরে তাবারী
২. হাদীস শরীফের দলীল
(ক) সহীহ বুখারী শরীফ
عَنْ أَبِي مَالِكٍ الْأَشْعَرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ
অনুবাদ: হযরত আবু মালিক আশআরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: "আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) বলে মনে করবে।"
রেফারেন্স: সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৫৯০
ফিকহী বিশ্লেষণ: ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) "ফাতহুল বারী"তে বলেন—এই হাদীসে বাদ্যযন্ত্র (المعازف) হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট দলীল রয়েছে। কারণ নবী (সাঃ) এগুলোকে মদ ও ব্যভিচারের সাথে উল্লেখ করেছেন, যা স্পষ্টতই হারাম।
(খ) সহীহ মুসলিম শরীফ
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: صَوْتَانِ مَلْعُونَانِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ: مِزْمَارٌ عِنْدَ نِعْمَةٍ، وَرَنَّةٌ عِنْدَ مُصِيبَةٍ
অনুবাদ: হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "দুটি আওয়াজ দুনিয়া ও আখিরাতে লানতপ্রাপ্ত: (১) নিয়ামতের সময় বাঁশির আওয়াজ (গান-বাজনা), (২) মুসিবতের সময় চিৎকার-বিলাপ।"
রেফারেন্স: সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০০৫; মুসনাদে আহমাদ
(গ) সুনানে আবু দাউদ
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْغِنَاءُ يُنْبِتُ النِّفَاقَ فِي الْقَلْبِ كَمَا يُنْبِتُ الْمَاءُ الزَّرْعَ
অনুবাদ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "গান মুনাফিকী সৃষ্টি করে অন্তরে, যেমন পানি ফসল উৎপন্ন করে।"
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর স্পষ্ট মত হলো—গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র হারাম। তিনি বলেন, গান-বাজনা ফিসক (পাপাচার) এর অন্তর্ভুক্ত।
রেফারেন্স: আল-মাবসূত, সারাখসী; বাদায়েউস সানায়ে
ফাতাওয়া আলমগীরী
الْغِنَاءُ وَاللَّهْوُ حَرَامٌ
অনুবাদ: "গান ও অপ্রয়োজনীয় বিনোদন হারাম।"
রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ৫, পৃ. ৩৫১
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)
বেহেশতী যেওরে তিনি বলেন—"গান-বাজনা শোনা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নাচ-গান সবই হারাম।"
রেফারেন্স: বেহেশতী যেওর, খণ্ড ৪