স্বামী স্ত্রীকে "রিজেক্ট মাল" ও "ছোট বউ আনব" বললে কি তালাক হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, বিবাহ-তালাক—সব ইবাদতের সহিহ মাসআলা জানা ফরজ।
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নে বর্ণিত বিষয়গুলো হলো:
- টয়লেট করতে দেরি হওয়ায় স্বামী স্ত্রীকে বলেছে: "তুমি রিজেক্ট মাল"
- কিছুক্ষণ পর কাজ না করায় স্বামী বলেছে: "ছোট বউ আনব"
- এরপর বলেছে: "রিজেক্ট রিজেক্ট"
- স্ত্রী চিল্লানোর পর স্বামী বলেছে: "পুরনো তাই বলেছি, আর কেন বলেছি আমি জানি"
- স্বামী দাবি করেছে: "তালাকের নিয়তে বলিনি, দুষ্টামি করে বলেছি"
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. তালাকের মূলনীতি
তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি বিষয় আবশ্যক:
- স্পষ্ট তালাকের শব্দ (صريح) — যেমন: "তালাক", "তালাক দিলাম", "তোমাকে ছেড়ে দিলাম"
- ইঙ্গিতমূলক শব্দ (كنائي) — যেমন: "তুমি রিজেক্ট মাল", "ছোট বউ আনব" — এগুলো তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়
মূল সূত্র: রাদ্দুল মুহতার (৩/২৩০), আল-হিদায়া (২/৩৫৫), ফাতাওয়া আলমগিরি (১/৩৭৫)
২. "রিজেক্ট মাল" বা "ছোট বউ আনব" — এগুলো কি তালাক?
উত্তর: না। এগুলো তালাকের স্পষ্ট (صريح) শব্দ নয়, বরং এগুলো কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক) শব্দের মধ্যেও পড়ে না। কারণ:
- "রিজেক্ট মাল" অর্থ "বাতিল/অগ্রহণযোগ্য জিনিস" — এটি গালি বা তিরস্কারের শব্দ, তালাকের শব্দ নয়
- "ছোট বউ আনব" — এটি ভয় দেখানোর বা হুমকির বাক্য, তালাকের ইঙ্গিত নয়
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে কিনায়া শব্দে তালাক সংঘটিত হতে হলে অবশ্যই তালাকের নিয়ত থাকতে হবে। নিয়ত ছাড়া কিনায়া শব্দে তালাক হয় না।
দলিল: রাদ্দুল মুহতার (৩/২৩২): "وَلَا يَقَعُ بِالْكِنَايَةِ إِلَّا بِالنِّيَّةِ أَوْ دَلَالَةِ الْحَالِ" — "কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক সংঘটিত হয় না, তবে নিয়ত বা অবস্থার দলিল থাকলে হয়।"
৩. স্বামী নিজেই স্বীকার করেছে: "তালাকের নিয়তে বলিনি"
যেহেতু স্বামী স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে সে তালাকের নিয়ত করেনি, বরং দুষ্টামি/রাগের বশে বলেছে — সেহেতু কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।
ফাতাওয়া উসমানি (২/৩০০): "কিনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক পতিত হয় না।"
৪. "পুরনো তাই বলেছি" — এর অর্থ কী?
স্বামীর এই বাক্যের অর্থ হলো: "তুমি আমার পুরনো (প্রথম) স্ত্রী, তাই 'ছোট বউ আনব' বলে তোমাকে ভয় দেখিয়েছি।" — এটি তালাকের কোনো ইঙ্গিত নয়, বরং ভয় দেখানোর বা রাগ প্রকাশের বাক্য।
৫. চিল্লানোর পর স্বামীর বক্তব্য
স্বামী বলেছে: "আর কেন বলেছি আমি জানি" — এই বাক্যটিও তালাকের নিয়ত প্রমাণ করে না। বরং সে নিজেই বলেছে "দুষ্টামি করে বলেছি" — অর্থাৎ তালাকের নিয়ত ছিল না।
চূড়ান্ত ফতোয়া
উপরোক্ত বিষয়গুলো দ্বারা কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। কারণ:
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | "রিজেক্ট মাল" বলা | তালাকের শব্দ নয়, গালি/তিরস্কার | | "ছোট বউ আনব" বলা | হুমকি/ভয় দেখানো, তালাকের ইঙ্গিত নয় | | "রিজেক্ট রিজেক্ট" বলা | পুনরাবৃত্তি, তালাকের নিয়ত নেই | | স্বামীর স্বীকারোক্তি | "তালাকের নিয়তে বলিনি" — সুতরাং তালাক হয়নি |
সুতরাং, বিবাহ বহাল আছে। কোনো সমস্যা নেই।
করণীয়
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত আল্লাহর কাছে তাওবা করা — রাগের বশে এমন কথা বলা উচিত নয়
- ভবিষ্যতে তালাকের শব্দ বা ইঙ্গিতমূলক কথা বলা থেকে বিরত থাকা — কারণ অনেক সময় রাগের বশে বলা কথায় তালাক পতিত হয়ে যায়
- যদি কখনো সন্দেহ হয়, তবে নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে গিয়ে মাসআলা জেনে নেওয়া
- পরস্পরের সাথে সদাচরণ করা — আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদাচরণ করো" (সূরা নিসা: ১৯)
সতর্কতা
যদিও এই বিষয়ে তালাক হয়নি, তবে তালাকের শব্দ বা কিনায়া শব্দ নিয়ে খেলা করা মারাত্মক গুনাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তিনটি বিষয়ে খেলা করা যায় না, আর তা করা হলে তা কার্যকর হয়: তালাক, বিবাহ এবং দাসমুক্তি।" — সুনানে আবু দাউদ (২১৯৪), সুনানে তিরমিজি (১১৮৪)
অতএব, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত এই ধরনের কথা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
والله أعلم بالصواب