নেক সোহবত পাওয়া প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
নারীরা কিভাবে নেক সোহবত পেতে পারে? পুরুষ রা উস্তাযদের, হুজুর বা শায়েখ দের কাছে যাওয়া আসা করতে পারে। আত্মারব্যাধি গুলো তাদের কাছে প্রকাশ করতে পারে৷ তাদের কাছ থেকে তারবিয়াত পেতে পারে। কিন্তু আমরা গৃহিণী রা যারা চার দেয়ালের মধ্যে থাকি, দ্বীনের কিছুটা বুঝ পেয়ে অন্ধকারে পথ হাটি। স্বামী ও তার পরিবার এবং নিজে পরিবারেও বিন্দমাত্র দ্বীনের বালার নেই, কেউ নামাজ কালাম পর্যন্ত পড়েনা। এমন পরিবেশে নিজের অতীতের জিন্দিগি বারবার টানে, বিশেষ করে আখলাকের দোষত্রুটি গুলো কিছুতেই সংশোধন করা যাচ্ছেনা। পরিবারের কাছে উত্তম তারবিয়াত পাইনি, না পেয়েছি স্বামীর কাছে। তাই আখলাকের দোষত্রুটি গুলো কিভাবে সংশোধন করবো কোন কূলকিনার পাইনা। চেষ্টা করি, কিছুদিন পর আবার আগের মত। এভাবে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে গেছি। এখন বাচ্চাগুলোর মধ্যে বদ আখলাক প্রকাশ পাচ্ছে। বাচ্চারা প্রায় বালেগ। আমি নিজে সংশোধন না হলে তাদেরকে খালি নসীহত করলে তো কোন লাভ নাই! তারা তো আমাকে দেখেই শিখে। আমার সমস্যা বুঝে আমাকে কোন উপায় বাতলে দিন প্লিজ। আমি একা একা আর পেরে উঠছিনা
Answer
উত্তর: নারীর নেক সোহবত ও আখলাক সংশোধনের উপায়
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার বেদনা হৃদয়স্পর্শী। আল্লাহ তাআলা আপনার এই সংগ্রামকে কবুল করুন এবং আপনার আখলাক সংশোধনের পথ সহজ করে দিন। আমিন।
১. নেক সোহবতের মূল ভিত্তি: নিয়ত ও ইখলাস
প্রথমেই বুঝতে হবে — নেক সোহবত মানে শুধু কোনো শায়েখের সামনে বসা নয়। বরং নেক সোহবতের আসল রূহ হলো:
- আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন (তাকওয়া)
- নিয়তের বিশুদ্ধতা (ইখলাস)
- নিজের দোষ-ত্রুটি স্বীকার করে সংশোধনের চেষ্টা (মুজাহাদা)
আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" (সূরা তাওবা: ১১৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উসুল ছিল — "আমি যদি কোনো ফকিহের কাছে বসি, তবে তার ইলম থেকে উপকৃত হই; আর যদি কোনো জাহিদের কাছে বসি, তবে তার তাকওয়া থেকে উপকৃত হই।" (তারিখে বাগদাদ)
২. গৃহিণীদের জন্য নেক সোহবতের ব্যবহারিক উপায়
(ক) ঘরে বসেই ইলমের সোহবত
১. অনলাইনে নির্ভরযোগ্য আলেমদের বয়ান শোনা — যেমন: মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.), মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.), আশরাফ আলী থানভি (রহ.)-এর বয়ান ও কিতাব।
২. কিতাব অধ্যয়ন — বিশেষ করে:
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি রহ.) — নারীদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)
- তালিমুদ্দিন (আশরাফ আলী থানভি রহ.)
- আখলাক ও তারবিয়াত সংক্রান্ত কিতাব
৩. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও তাফসীর — প্রতিদিন অন্তত কিছু আয়াত অর্থসহ পড়া।
(খ) নেক সোহবতের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ
- প্রতিদিন ফজরের পর ১৫-২০ মিনিট আল্লাহর যিকর ও কুরআন।
- সপ্তাহে একদিন নির্দিষ্ট করে ইলমের জন্য (অনলাইন ক্লাস/বয়ান)।
- মাসে একদিন কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমার কাছে ফোনে বা অনলাইনে পরামর্শ।
(গ) স্বামী ও পরিবারের প্রতি দাওয়াত
আপনার পরিবার দ্বীন থেকে দূরে — এটি আপনার জন্য সবর ও দাওয়াতের সুযোগ। জোর করে নয়, বরং:
- নিজের আমল দিয়ে দেখান — আপনি নামাজ পড়ুন, কুরআন পড়ুন, উত্তম আখলাক দেখান।
- হিকমতের সাথে নসীহত — রাগ বা তিরস্কার নয়, বরং ভালোবাসা ও দুআর মাধ্যমে।
- তাদের জন্য দুআ করুন — হিদায়াত আল্লাহর হাতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আপনি উত্তম পদ্ধতিতে দাওয়াত দিন।" (সূরা নাহল: ১২৫)
৩. আখলাকের দোষ-ত্রুটি সংশোধনের কার্যকর পদ্ধতি
(ক) মুজাহাদা ও মুহাসাবা (আত্ম-জবাবদিহি)
আশরাফ আলী থানভি (রহ.) "বেহেশতী জেওর"-এ বলেন:
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজের দিনের আমল পর্যালোচনা করুন — কোন ভালো কাজ করলেন, কোন মন্দ কাজ করলেন। মন্দ কাজের জন্য তাওবা করুন, ভালো কাজের জন্য শুকরিয়া আদায় করুন।
প্র্যাকটিক্যাল পদ্ধতি:
- একটি ডায়েরি রাখুন। প্রতিদিন রাতে লিখুন:
- আজ কোন গুনাহ করেছি?
- কোন আখলাকের দোষ প্রকাশ পেয়েছে (রাগ, হিংসা, অহংকার, গীবত)?
- আগামীকাল কী সংশোধন করবো?
(খ) প্রতিটি দোষের বিপরীতে গুণ চর্চা
| দোষ | বিপরীত গুণ | আমল | |------|------------|------| | রাগ | সবর ও হিলম | রাগের সময় চুপ থাকা, ওযু করা | | হিংসা | ভালোবাসা ও দুআ | হিংসার পাত্রের জন্য দুআ করা | | অহংকার | বিনয় | নিজের দোষ মনে করা | | গীবত | চুপ থাকা | জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ | | অলসতা | নিয়মিত আমল | ছোট ছোট আমল শুরু করা |
(গ) ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করুন
ইবন আবিদিন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেন — আমলের ধারাবাহিকতা (ইস্তিকামাত) পরিমাণের চেয়ে উত্তম।
- প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত নামাজ — সময়মতো।
- সকাল-সন্ধ্যা ১০০ বার ইস্তিগফার।
- দরুদ শরিফ ১০০ বার।
- সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি নিয়মিত।
৪. বাচ্চাদের আখলাক সংশোধনের উপায়
আপনি ঠিক বলেছেন — নিজে সংশোধন না হলে সন্তানকে নসীহত কাজে দেবে না। তাই:
১. নিজের আমল দিয়ে দেখান — বাচ্চারা দেখে শেখে। ২. তাদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক — কঠোরতা নয়, বরং নরম ব্যবহার। ৩. তাদের জন্য দুআ — হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দুআ: "হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান এবং আমার সন্তানদেরও।" (সূরা ইব্রাহিম: ৪০) ৪. তাদের ছোট ছোট দায়িত্ব দিন — নামাজ, কুরআন, দুআ শেখান। ৫. তাদের বন্ধু-বান্ধব দেখুন — খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে রাখুন।
৫. একা একা পেরে না উঠলে কী করবেন?
(ক) আল্লাহর কাছে কাঁদুন
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আমি কি তোমাদের ডাকে সাড়া দিই না?" (সূরা গাফির: ৬০)
রাতে তাহাজ্জুদে উঠে আল্লাহর কাছে আপনার সব দুর্বলতা, কষ্ট, অসহায়ত্ব পেশ করুন। আল্লাহর সাথে সম্পর্কই সবচেয়ে বড় সোহবত।
(খ) একজন নির্ভরযোগ্য আলেমার সাথে যোগাযোগ
আপনি চাইলে ফোনে বা অনলাইনে কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমার কাছে পরামর্শ নিতে পারেন। যেমন:
- দারুল উলুম দেওবন্দ-এর ফতোয়া বিভাগ
- ইফতা ওয়েবসাইট (ifatwa.info / darulifta-deoband.com)
- স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য মসজিদের ইমাম
(গ) নারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য অনলাইন কোর্স
- আল-বালাগ বা মাদানী চ্যানেল-এর নারীদের ক্লাস
- তালিমী ক্লাস — ঘরে বসে অনলাইনে
৬. সবরের ফজিলত ও দুআ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "আল্লাহ তাআলা বলেন: আমি যখন আমার বান্দার কাছ থেকে তার প্রিয় বস্তু (সন্তান/স্বামী) নিয়ে নিই, আর সে সবর করে, তখন আমি তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হই না।" (সহিহ বুখারি)
আপনার জন্য দুআ:
"হে আল্লাহ! আমার আখলাককে উত্তম করে দিন, আমার সন্তানদের হিদায়াত দিন, আমার স্বামী ও পরিবারকে দ্বীনের পথে আনুন, এবং আমাকে সবর ও ইস্তিকামাত দান করুন। আমিন।"
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | নেক সোহবত | অনলাইন বয়ান, কিতাব, নির্ভরযোগ্য আলেমার পরামর্শ | | আখলাক সংশোধন | মুহাসাবা, ডায়েরি, ছোট আমল, বিপরীত গুণ চর্চা | | পরিবার | নিজের আমল দিয়ে দাওয়াত, দুআ, সবর | | সন্তান | ভালোবাসা, দুআ, নিজের আদর্শ | | একাকীত্ব | আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, তাহাজ্জুদ, আলেমার পরামর্শ |
মনে রাখবেন: আপনি একা নন। আল্লাহ আপনার সাথে আছেন। আপনার এই সংগ্রামই আপনার জন্য জান্নাতের সিঁড়ি। হতাশ হবেন না, বরং প্রতিটি ব্যর্থতাকে তাওবার সুযোগ হিসেবে নিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ