রাসূল (স:) কে স্বপ্ন দেখার বিষয়ে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উল্লেখ্য, এই স্বপ্নের আগে অন্য সাধারণ স্বপ্ন ছিলো তার মধ্য দিয়ে এটা দেখা হয়েছে। স্বপ্নে সে রাসূল স: এর সাথে কথা বলেনি,কেউ বলে নি এটা রাসূল স: এর লাশ বা রাসূল স: নিজেও বলেনি বা পরিচয় দেয়নি তিনি রাসূল স:। স্বপ্নটা বুধবার যোহরের ওয়াক্তের দিকের সময়ে ছিলো, স্বপ্নটা দেখে উঠার কিছুক্ষণ পর যোহরের আযান হয় এবং কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টিও হয়। স্বপ্নটা দেখে সাথে সাথে উঠে তার একই কষ্ট অনুভুত হচ্ছিলো সে কাঁপছিলো এবং সে বুঝতে পারছিলোনা সে তো সেভাবে প্র্যাক্টিসিং মুসলিম না সাধারন মুসলিমদের মতো তাহলে সে কি সত্যিই এভাবে রেন্ডমলি স্বপ্নে রাসূল(স:) কেই দেখেছে কিনা। এবং চেহারাটি তার স্মরণ থেকে আস্তে আস্তে ফেইড হয়ে যায়। চেহারাটি আর স্মরণে থাকেনা। শুধু অতটুকু বিবরণই বলতে পেরেছিলো তাত্ক্ষণিক।
এখন বোনটি জানতে চাচ্ছিলেন তিনি কি রাসূল (স:) কে দেখেছেন? এবং এই স্বপ্নের অর্থ কি?
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা প্রসঙ্গে — একটি বিশ্লেষণমূলক ফতোয়া
উত্তর (সংক্ষেপে): স্বপ্নে রাসূল (সা.)-কে দেখা সম্ভব এবং তা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তবে আপনার বোনের বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয় — তিনি নিজে রাসূল (সা.)-কে চিনতে পারেননি, কেউ পরিচয় দেয়নি, এবং চেহারা স্মরণে থাকেনি। এমতাবস্থায় নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে তিনি রাসূল (সা.)-কেই দেখেছেন; বরং এটিকে সম্ভাব্য শুভ স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তবে স্বপ্নে কান্না, যোহরের সময়, বৃষ্টি — এসব শুভ আলামতের অন্তর্ভুক্ত। বিস্তারিত নিচে।
১. স্বপ্নে রাসূল (সা.)-কে দেখা কি সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
«مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِي»
"যে ব্যক্তি স্বপ্নে আমাকে দেখল, সে সত্যিই আমাকে দেখল; কারণ শয়তান আমার আকৃতিতে আসতে পারে না।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস ১১০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৬
ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) «فقد رآني» এর ব্যাখ্যায় বলেন — এর অর্থ হলো: সে সত্যিকারের রাসূল (সা.)-এর আকৃতিতেই দেখেছে, শয়তানের কল্পনায় নয়। (ফাতহুল বারী, খ. ১২, পৃ. ৩৮৪)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন — স্বপ্নে রাসূল (সা.)-কে দেখা সত্য, এবং তা মুহাক্কিকীন (তাহকীককারী আলিমগণ)-এর সর্বসম্মত মত। (শারহু সহীহ মুসলিম, খ. ১৫, পৃ. ২৪)
২. তবে কি প্রতিটি স্বপ্নই সত্যিকারের রাসূল (সা.)-এর দীদার?
না। এখানে দু'টি শর্ত বিবেচ্য:
| শর্ত | ব্যাখ্যা | |---|---| | (ক) আকৃতির সঠিকতা | রাসূল (সা.)-এর যে সিফাত (গুণাবলি) হাদীসে বর্ণিত — যেমন ফর্সা বর্ণ, হাস্যোজ্জ্বল মুখ, ঘন কালো চুল-দাড়ি, মধ্যম উচ্চতা — স্বপ্নে তা বিদ্যমান থাকতে হবে। | | (খ) দর্শনকারীর পরিচয় জ্ঞান | স্বপ্নদ্রষ্টা যদি নিজেই না চিনতে পারেন, বা কেউ পরিচয় না দেয়, তাহলে নিশ্চিত দাবি করা যায় না। |
আপনার বোনের ক্ষেত্রে তিনি নিজেই বলেছেন — "স্বপ্নে কেউ বলেনি এটা রাসূল (সা.), রাসূল (সা.) নিজেও পরিচয় দেননি, আমি নিজেও চিনতে পারিনি।" এমতাবস্থায় কাটাছেঁড়া করে নিশ্চিত বলা ঠিক হবে না যে তিনি রাসূল (সা.)-কেই দেখেছেন। বরং এটিকে "সম্ভাব্য শুভ স্বপ্ন" বলা যাবে।
ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলতেন — স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়; বিশেষত যখন স্বপ্নদ্রষ্টা নিজেই নিশ্চিত নয়। (তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সীরীন, পৃ. ৪২)
৩. বর্ণনায় যে শুভ আলামতগুলো রয়েছে
আপনার বোনের বর্ণনায় কয়েকটি শুভ ইঙ্গিত রয়েছে:
(ক) ফর্সা চেহারা, হাস্যোজ্জ্বল মুখ, যৌবন
রাসূল (সা.)-এর হাদীসে বর্ণিত সিফাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত — রাসূল (সা.) ছিলেন মধ্যম উচ্চতা, ফর্সা বর্ণ, হাস্যোজ্জ্বল মুখমণ্ডল। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৫৪০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৩৩৭)
(খ) নাকের ভিতর তুলা না থাকা
কাফনের মধ্যে নাকের ভিতর তুলা দেওয়ার প্রথা পরবর্তী যুগের; রাসূল (সা.)-এর যুগে তা ছিল না। এটি সালাফের সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
(গ) যোহরের সময়, আযান ও বৃষ্টি
- যোহরের ওয়াক্ত — দু'আ কবুলের সময়গুলোর একটি।
- বৃষ্টি — রহমতের আলামত। কুরআনে আল্লাহ বলেন: «وَهُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ الْغَيْثَ» — "তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন।" (সূরা শূরা: ২৮)
- স্বপ্ন দেখে উঠে কাঁপা ও কান্না — এটি অন্তরের কোমলতা ও ঈমানের নূরের আলামত।
(ঘ) অন্তরের কষ্ট ও কান্না
রাসূল (সা.)-এর ফিরাক (বিচ্ছেদ)-এর কষ্ট অন্তরে অনুভব করা — এটি মুহাব্বাতের (ভালোবাসার) প্রমাণ। রাসূল (সা.) বলেছেন:
«الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ»
"মানুষ তার সাথে থাকবে, যাকে সে ভালোবাসে।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৪০
৪. চেহারা স্মরণে না থাকা — এর ব্যাখ্যা
স্বপ্নের চেহারা আস্তে আস্তে ফেইড হয়ে যাওয়া — এটি স্বাভাবিক। কারণ:
- স্বপ্নের প্রকৃতি — স্বপ্ন সাধারণত ক্ষণস্থায়ী; জাগ্রত অবস্থায় সম্পূর্ণ স্মরণ রাখা কঠিন।
- হাদীসের ইঙ্গিত — রাসূল (সা.) বলেছেন, স্বপ্ন তিন প্রকার: (ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (খ) শয়তানের পক্ষ থেকে ভয়, (গ) নফসের কল্পনা। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩)
- আলিমদের মত — ইমাম ইবনে সীরীন (রহ.) বলেন, স্বপ্নের চেহারা স্মরণে না থাকলে তা সাধারণত রু'ইয়ায়ে সালিহা (সৎ স্বপ্ন)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা অন্তরকে নরম করে।
৫. আপনার বোনের করণীয়
| করণীয় | দলীল | |---|---| | আলহামদুলিল্লাহ বলা | স্বপ্ন শুভ হলে আল্লাহর শোকর আদায় করা সুন্নাহ। | | কারও কাছে বর্ণনা না করা (শুধু বিশ্বস্ত আলিম/আপনজন ছাড়া) | রাসূল (সা.) বলেছেন: «لَا تُحَدِّثْ بِهَا إِلَّا حَبِيبًا أَوْ عَالِمًا» — "স্বপ্ন শুধু প্রিয়জন বা আলিমকে বলো।" (তিরমিযী, হাদীস ২২৮০) | | নফল ইবাদত বাড়ানো | বিশেষত তাহাজ্জুদ, দরুদ শরীফ, কুরআন তিলাওয়াত। | | সীরাহ অধ্যয়ন করা | রাসূল (সা.)-এর জীবনী পড়া — এতে মুহাব্বাত বাড়ে। | | দরুদ শরীফ বেশি পড়া | রাসূল (সা.) বলেছেন: «أَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ» — "আমার উপর বেশি দরুদ পড়ো।" (তিরমিযী, হাদীস ৪৮৪) | | ভয় পাওয়ার কিছু নেই | এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা নয়; বরং রহমতের আলামত। |
৬. সতর্কতা — যা করা যাবে না
- নিশ্চিত দাবি করা — "আমি রাসূল (সা.)-কেই দেখেছি" বলে কসম খাওয়া বা প্রচার করা ঠিক নয়, যখন পরিচয় নিশ্চিত নয়।
- স্বপ্নের উপর ভিত্তি করে বিধান তৈরি করা — স্বপ্ন শরীয়তের দলীল নয়।
- অতিরঞ্জিত করা — স্বপ্নকে কেন্দ্র করে কুসংস্কার বা ভক্তির অতিরেক্ষে যাওয়া।
- স্বপ্নকে ভবিষ্যদ্বাণী মনে করা — এটি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি ও উপদেশ।
৭. সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখা কি সম্ভব? | হ্যাঁ, হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। | | আপনার বোন কি নিশ্চিতভাবে রাসূল (সা.)-কে দেখেছেন? | নিশ্চিত বলা যাবে না; কারণ তিনি নিজে চিনতে পারেননি, কেউ পরিচয় দেয়নি। তবে সম্ভাব্য শুভ স্বপ্ন। | | স্বপ্নের অর্থ কী? | অন্তরের কোমলতা, রাসূল (সা.)-এর প্রতি মুহাব্বাতের ইঙ্গিত, এবং সীরাহ-সুন্নাহর সাথে সংযুক্ত হওয়ার তাগাদা। | | করণীয় কী? | শোকর, দরুদ, সীরাহ অধ্যয়ন, নফল ইবাদত, এবং স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা পরিহার। |
দু'আ
اللَّهُمَّ ارْزُقْنَا حُبَّ نَبِيِّكَ، وَاجْعَلْنَا مَعَهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، وَأَرِنَا إِيَّاهُ فِي الْمَنَامِ وَالْيَقَظَةِ
"হে আল্লাহ! আপনার নবীর ভালোবাসা আমাদের দান করুন, দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদেরকে তাঁর সাথে রাখুন, এবং স্বপ্নে ও জাগরণে আমাদেরকে তাঁর দীদার দান করুন।"
والله أعلم بالصواب
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী, হাদীস ১১০, ৩৫৪০, ৬১৬৮
- সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৬৩, ২২৬৬, ২৩৩৭, ২৬৪০
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস ৪৮৪, ২২৮০
- ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার, খ. ১২
- শারহু সহীহ মুসলিম, ইমাম নববী, খ. ১৫
- তাফসীরুল আহলাম, ইবনে সীরীন
- রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদীন, খ. ৯ (স্বপ্ন প্রসঙ্গে)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানী, মুফতি তাকী উসমানী, খ. ১