পাওনা মাফ করে দেয়া প্রসঙ্গে
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,
এক ব্যাক্তি তিনার পরিচিত একজন কে কিছু টাকা কর্য দেন। এবং যখন সেই ব্যাক্তি এই কর্য পরিশোধ করতে আসেন তখন কর্য দাতা বলেন আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি তাই আপনাকে আর এই টাকা ফেরত দিতে হবে না।
কর্য পরিশোধ ক্বারি সেই ব্যাক্তিও নাছোড়বান্দা তিনি বলতেছেন আমি মাফ নিবো না বা চাই না। আমি পরিশোধ করবোই।
এখন আমাদের কি করা উচিৎ বা উত্তম হবে দয়া করে জানাবেন।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম: একজন ব্যক্তি তার পরিচিতজনকে কিছু টাকা ঋণ (কর্জ) দিয়েছেন। ঋণগ্রহীতা যখন টাকা পরিশোধ করতে আসে, তখন ঋণদাতা তাকে মাফ করে দেন (ঋণ ক্ষমা করে দেন)। কিন্তু ঋণগ্রহীতা মাফ গ্রহণ করতে রাজি নন এবং তিনি টাকা পরিশোধ করবেই বলে জোর দিচ্ছেন। এখন করণীয় কী?
শরীয়তের বিধান:
ইসলামী অর্থনীতি ও ফিকহের দৃষ্টিতে ঋণ (কর্জ) একটি পবিত্র আমানত এবং তা পরিশোধ করা ঋণগ্রহীতার উপর ফরজ (ওয়াজিব)। তবে ঋণদাতা যদি খুশি মনে ঋণটি মাফ করে দেন, তবে তা শরীয়তসম্মতভাবে বৈধ এবং ঋণগ্রহীতা দায়মুক্ত হয়ে যান।
কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে: ঋণ মাফের জন্য ঋণগ্রহীতার সম্মতির প্রয়োজন নেই। ঋণদাতা যদি স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টচিত্তে ঋণ মাফ করে দেন, তবে তা সম্পূর্ণ বৈধ এবং ঋণগ্রহীতার উপর তা গ্রহণ করা জরুরি না হলেও ঋণদাতার পক্ষ থেকে মাফ করা শরীয়তসম্মতভাবে কার্যকরী হয়ে যায়। ঋণগ্রহীতা যদি তা না মানেন এবং টাকা পরিশোধ করতেই চান, তাহলে ঋণদাতার উচিত তাকে বোঝানো যে, "আমি সন্তুষ্টচিত্তে তোমার ঋণ মাফ করে দিয়েছি, তুমি এখন দায়মুক্ত।"
কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা:
১. কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যদি তোমরা ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য অধিক উত্তম, যদি তোমরা জানতে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮০)
২. হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ঋণগ্রস্তকে (ঋণ পরিশোধে) সহজ করে দেয় অথবা মাফ করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন।" (সহীহ মুসলিম: ৩০০৬)
হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত:
১. ঋণ মাফের শর্ত: ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ঋণদাতা যদি ঋণগ্রহীতাকে বলে, "আমি তোমার ঋণ মাফ করে দিলাম" অথবা "তোমার উপর আমার কোনো দাবি নেই" — তবে তা সহীহ (বৈধ) এবং ঋণগ্রহীতার সম্মতি ছাড়াই ঋণ মাফ হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৩০৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৩৫)
২. ঋণগ্রহীতার করণীয়: যদি ঋণদাতা স্পষ্টভাবে ঋণ মাফ করে দেন, তাহলে ঋণগ্রহীতার উপর তা গ্রহণ করা আবশ্যক নয়, বরং তিনি যদি টাকা পরিশোধ করতে চান, তবে তা জায়েয (বৈধ) আছে। কিন্তু ঋণদাতা যদি টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে ঋণগ্রহীতার উচিত ঋণদাতাকে সন্তুষ্ট করা এবং বোঝানো যে, "আপনি আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন, কিন্তু আমি আপনার এই ঋণ পরিশোধ করতেই চাই।"
তবে উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ হলো ঋণদাতার মাফ গ্রহণ করা, কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঋণ মাফ করাকে "অধিক উত্তম" বলেছেন। কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি পরিশোধ করতেই চান, তাহলে তিনি ঋণদাতাকে বলতে পারেন: "আপনি যদি আমার ঋণ মাফ করে দেন, তবে সেই টাকা আপনি কোনো গরিবকে সদকা করে দিন" — এতে উভয়ের সন্তুষ্টি থাকবে এবং ঋণদাতার মাফও কার্যকর থাকবে।
৩. ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর বক্তব্য: রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"যদি ঋণদাতা ঋণ মাফ করে দেয়, তবে তা সহীহ; ঋণগ্রহীতার সম্মতি শর্ত নয়। তবে ঋণগ্রহীতা যদি পরিশোধ করতে চায়, তাহলে ঋণদাতার জন্য উত্তম হলো তা গ্রহণ না করা এবং তাকে বোঝানো যে, আমি তোমাকে মাফ করে দিয়েছি।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ১২৩)
আপনাদের জন্য করণীয় ও উত্তম আমল:
১. ঋণদাতার করণীয়: আপনি যদি সত্যিই সন্তুষ্টচিত্তে ঋণ মাফ করে থাকেন, তাহলে ঋণগ্রহীতাকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলুন: "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমার ঋণ মাফ করে দিয়েছি। তুমি এখন দায়মুক্ত। এই টাকা আমার কাছে ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।" যদি তিনি জোর দেন, তবে আপনি বলতে পারেন: "আমি তোমার টাকা নেব না, কারণ আমি তা মাফ করে দিয়েছি। তুমি চাইলে এই টাকা কোনো গরিবকে সদকা করে দাও।"
২. ঋণগ্রহীতার করণীয়: ঋণদাতা যদি সত্যিই মাফ করে দেন, তাহলে আপনার উচিত তার এই মহানুভবতা ও অনুগ্রহকে সম্মান করা। তবে যদি আপনার মনে হয় ঋণদাতা অনিচ্ছায় মাফ করেছেন (যেমন: লজ্জায় বা সংকোচে), তাহলে আপনি তাকে বলতে পারেন: "আমি আপনার ঋণ পরিশোধ করবোই, কারণ ঋণ পরিশোধ করা আমার দায়িত্ব।" কিন্তু যদি ঋণদাতা স্পষ্টভাবে ও সন্তুষ্টচিত্তে মাফ করে থাকেন, তাহলে মাফ গ্রহণ করাই উত্তম এবং তা গ্রহণ করা জায়েয।
৩. মীমাংসার সর্বোত্তম পথ: উভয়ের মধ্যে সমঝোতার জন্য ঋণদাতা বলতে পারেন: "আমি তোমার ঋণ মাফ করলাম, কিন্তু তুমি যদি সন্তুষ্ট না হও, তাহলে তুমি এই টাকা কোনো এতিম বা গরিবকে সদকা করে দাও।" এতে ঋণদাতার মাফ কার্যকর থাকবে, ঋণগ্রহীতার টাকা পরিশোধের মানসিকতাও পূরণ হবে এবং গরিবের উপকার হবে। এটি সবচেয়ে উত্তম সমাধান।
সারকথা: শরীয়তের দৃষ্টিতে ঋণদাতার মাফ করা বৈধ এবং তা কার্যকর। ঋণগ্রহীতার জন্য মাফ গ্রহণ করা উত্তম, তবে তিনি যদি পরিশোধ করতেই চান, তাহলে ঋণদাতা তা গ্রহণ না করে তাকে সদকা করার পরামর্শ দিতে পারেন। আল্লাহ তাআলা উভয়কে উত্তম প্রতিদান দান করুন। (আমিন)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।