ইমাম সাহেব কি এসির রিমোট সরিয়ে নিতে পারেন?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমাদের ভার্সিটিতে (AUST) ছাত্রদের জন্য আলাদা কোনো কমন রুম নেই। তাই বিশ্রাম বা অন্য দরকারে অনেক ছাত্রই প্রেয়ার রুমে অবস্থান করে (এটি মূল মসজিদ নয়, বরং ভার্সিটির ভেতরের একটি প্রেয়ার রুম)। সম্প্রতি সেখানে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে, যার ব্যাপারে আমি সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি ফতোয়া জানতে চাই।
প্রেক্ষাপট:
* সকাল ১০টা কিংবা দুপুর ২টা থেকে ৩টার দিকে কিছু ছাত্র প্রেয়ার রুমে গোল হয়ে বসে এসি ছেড়ে দেয়। তারা সেখানে টিকটক বা রিলস দেখে, গান শোনে এবং গেমস খেলে। এর ফলে নামাজিদের ইবাদতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।
* এই অনাকাঙ্ক্ষিত কাজগুলো বন্ধ করার জন্য একাধিকবার নসিহত করা হয়েছে এবং দেয়ালে সতর্কতামূলক পোস্টারও লাগানো হয়েছে।
* কিন্তু এতেও কাজ না হওয়ায়, ইমাম সাহেব একটি পদক্ষেপ নিয়েছেন। নামাজের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর আড্ডাবাজদের নিরুৎসাহিত করতে তিনি এসির রিমোট নিজের সাথে নিয়ে যান।
মূল সমস্যা:
* নামাজের সময় এসি চললেও, অন্য সময়ে রিমোট না থাকায় যারা একাকী নামাজ পড়তে, জিকির করতে, নিরিবিলি পড়াশোনা করতে বা একটু বিশ্রাম নিতে আসে (মূলত প্র্যাকটিসিং মুসলিমরা), তারা প্রচণ্ড গরমে কষ্ট পায়।
* উল্লেখ্য, আমরা সকল ছাত্রই ভার্সিটিতে নির্দিষ্ট ফি প্রদান করি, যার মধ্যে আমাদের এসি ব্যবহারের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত।
* অন্যদিকে, রিমোট সরিয়ে নিলেও কিছু ছাত্র মোবাইলের 'আইআর ব্লাস্টার' (IR Blaster) ব্যবহার করে এসি চালু করে নেয়। ফলে ইমাম সাহেবের মূল উদ্দেশ্যও পুরোপুরি সফল হচ্ছে না।
আমার প্রশ্ন:
কিছু মানুষের অন্যায় কাজ (গেমস খেলা বা গান শোনা) বন্ধ করার জন্য ইমাম সাহেবের এভাবে এসির রিমোট সরিয়ে নেওয়া কি ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী 'জায়েজ'? এর ফলে সাধারণ ছাত্র ও মুমিনরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং গরমে কষ্ট পাচ্ছে, যারা শুধুমাত্র ইবাদত বা ভালো কাজের জন্য সেখানে আসে।
সালাফদের ফতোয়া ও ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ইমাম সাহেবের এই পদক্ষেপটি কতটুকু সঠিক বা ভুল? এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও দালিলিক উত্তর জানালে উপকৃত হবো।
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নকারী ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে আমরা ইমাম সাহেবের নিয়্যত ও উদ্দেশ্যকে সম্মান জানাই। তিনি নামাজের পবিত্র স্থানকে অপবিত্র ও অনর্থক কাজ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন, যা শরিয়তসম্মত দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাধারণ ছাত্রদের (যারা ইবাদত, জিকির বা বিশ্রামের জন্য আসে) জন্য এসি বন্ধ করে দেওয়া বা রিমোট সরিয়ে নেওয়া কি জায়েজ?
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিচার:
১. ইবাদতের স্থানে শোরগোল ও অনর্থক কাজের বিধান
নামাজের স্থানে বা প্রেয়ার রুমে গান শোনা, টিকটক দেখা বা গেমস খেলা শরিয়তের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ এবং ওই স্থানের পবিত্রতা পরিপন্থী। ফুকাহায়ে কেরামের মতে, ইবাদতের জায়গায় দুনিয়াবী অনর্থক কাজ করা এবং শোরগোল করা নিষিদ্ধ, কারণ এতে ইবাদতকারীদের একাগ্রতা বা খুশু-খুযু নষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন যে, গান-বাজনা অন্তরে নেফাক সৃষ্টি করে এবং এটি শয়তানের অপবিত্র কার্যকলাপের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ওই ছাত্রদের কর্মকাণ্ড শরিয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ 'মুনকার' বা নিষিদ্ধ কাজ।
২. ইমাম সাহেবের পদক্ষেপের শরয়ী বিশ্লেষণ
ইমাম সাহেব ওই স্থানের শৃঙ্খলা রক্ষার জিম্মাদার। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, যদি নসিহত বা সাধারণ সতর্কতায় কোনো অন্যায় বন্ধ না হয়, তবে দায়িত্বরত ব্যক্তি তা হাত দিয়ে বা প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে বন্ধ করার অধিকার রাখেন। ইমাম সাহেবের এসির রিমোট সরিয়ে নেওয়া মূলত 'সাদদুয যারাই' (মন্দের পথ বন্ধ করা) এবং 'দাফিউল মুনকার' (পাপাচার নির্মূল)-এর একটি অংশ। ফুকাহায়ে কেরাম শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে প্রয়োজনে আর্থিক দণ্ড বা সুযোগ-সুবিধা সীমিত করার অনুমতি দিয়েছেন। যেহেতু এসি চালানোর মাধ্যমেই তারা সেখানে দীর্ঘ সময় আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তাই পাপাচার রোধে ইমাম সাহেবের এই পদক্ষেপটি মৌলিকভাবে সঠিক এবং শরিয়তসম্মত।
৩. সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কষ্টের বিষয়
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো—সাধারণ বা মুমিন শিক্ষার্থীদের অধিকার। শরিয়তের মূলনীতি হলো: "নিজেদের ক্ষতি করো না এবং অন্যের ক্ষতি করো না"। ইমাম সাহেবের পদক্ষেপের কারণে যারা নিছক ইবাদত বা বিশ্রামের জন্য আসে, তারা কষ্ট পাচ্ছে। তবে ফিকহী মূলনীতি হলো: "যখন হারাম ও মুবাহ (বৈধ) কাজ একত্রে মিশে যায় এবং হারামকে আলাদা করা সম্ভব হয় না, তখন হারাম থেকে বাঁচার জন্য মুবাহকেও বর্জন করার অবকাশ থাকে"। এখানে এসি চালানোটা 'মুবাহ' বা অধিকার হলেও এর দ্বারা যেহেতু বড় ধরনের 'মুনকার' বা গুনাহ সংগঠিত হচ্ছে, তাই বৃহত্তর মন্দের পথ বন্ধ করতে এই পদক্ষেপ জায়েয হবে ।
৪. ভার্সিটির ফি ও চুক্তির বিষয়
আপনারা যেহেতু ফি প্রদান করেছেন, সেহেতু এসি ব্যবহার করা আপনাদের অধিকার। কিন্তু চুক্তির একটি শর্ত থাকে যে, কোনো সুযোগ-সুবিধা নিয়মবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। প্রেয়ার রুম ইবাদতের জন্য নির্ধারিত, আড্ডা বা বিনোদনের জন্য নয়। সুতরাং ফি দেওয়ার অজুহাতে সেখানে গুনাহের কাজ করা চুক্তির লঙ্ঘন।
সারসংক্ষেপ ও সমাধান:
১. ইমাম সাহেবের পদক্ষেপটি অন্যায় কর্মকাণ্ড বন্ধ করার উদ্দেশ্যে হওয়ায় শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি বৈধ এবং সঠিক। ২. যারা ভালো কাজের জন্য আসে তারা কষ্টে থাকলেও, পাপাচার বন্ধের বৃহত্তর স্বার্থে এই সাময়িক কষ্ট 'সবর' বা ধৈর্যের অংশ হিসেবে গণ্য হবে। ৩. ছাত্রদের মোবাইলের মাধ্যমে এসি চালানো শরিয়তের দৃষ্টিতে 'খিয়ানত' এবং অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য হবে, কারণ তারা ওই স্থানের শৃঙ্খলা নষ্ট করছে।
পরামর্শ: ইমাম সাহেবের সাথে কথা বলে একটি বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন: রিমোটটি ইমামের কক্ষে বা দায়িত্বরত কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে রাখা যেতে পারে, যাতে যারা ইবাদত বা পড়াশোনার জন্য আসবে, তারা যেন অনুমতি নিয়ে তা ব্যবহার করতে পারে। এতে পাপাচারীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কষ্টও লাঘব হবে।
আল্লাহই ভালো জানেন।