হিন্দু বন্ধুর পরিবার কে দাওয়াত দেওয়া প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
জানতে চাচ্ছিলাম, হিন্দু কাওকে তার পরিবার সহ বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া জায়েয কিনা? সেখানে মহিলা সদস্য ও আছেন। পুরো বিষয়টির বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহী ও সামাজিক বিষয়। নিম্নে কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সালাফে সালেহীনের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. অমুসলিমকে দাওয়াত দেওয়ার মূল নীতি
ইসলামে অমুসলিমদের সাথে সদাচরণ এবং তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানানো একটি মহান ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ "যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-মুমতাহানা: ৮)
এই আয়াতের ভিত্তিতে, যে অমুসলিম শান্তিপূর্ণ এবং ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না, তাকে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে খানা খাওয়ানো বা দাওয়াত দেওয়া জায়েয। এটি তার প্রতি সদাচরণ এবং ইসলামের সুন্দর চেহারা উপস্থাপনের একটি মাধ্যম হতে পারে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"যে কাফির আমাদের সাথে যুদ্ধ করে না এবং আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে না, তার প্রতি সদাচরণ করা, তাকে উপহার দেওয়া এবং তার সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করা জায়েয।" (মাজমু' ফাতাওয়া)
২. মহিলা সদস্যদের উপস্থিতি সংক্রান্ত বিধান
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো, দাওয়াতে যদি অমুসলিম মহিলারাও উপস্থিত থাকেন, তবে এর বিধান কী?
এখেত্রে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে, যা মানতে হবে:
ক. পর্দা ও গোপনীয়তার বিধান লঙ্ঘন যেন না হয়
যদি দাওয়াতের মজলিসে অমুসলিম মহিলারা উপস্থিত থাকেন, এবং সেখানে মুসলিম পুরুষরাও থাকেন, তাহলে গ airat (আত্মমর্যাদা) ও পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইসলামে অমুসলিম মহিলাদের সামনেও পর্দা করা ফরয, যদি তারা এমন মহিলা হয় যারা ইসলামের পর্দা মানে না এবং তাদেরকে 'গায়রে মাহরাম' হিসেবে গণ্য করা হয়।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: "অমুসলিম মহিলাদের সাথে মুসাফাহা (করমর্দন) করা কি জায়েয?" উত্তরে তিনি বলেন:
"অমুসলিম মহিলাদের সাথে করমর্দন করা জায়েয নয়, কারণ তারা (ইসলামী পর্দা না মানার কারণে) সাধারণ নারীর অন্তর্ভুক্ত, এবং তাদের স্পর্শ করা হারাম।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন)
সুতরাং, যদি দাওয়াতে অমুসলিম মহিলারা থাকেন এবং মুসলিম পুরুষদের সাথে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ, কথা বলা বা করমর্দনের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই দাওয়াত দেওয়া উচিত নয়, কারণ এটি ফিতনার কারণ হতে পারে।
খ. পৃথক ব্যবস্থা থাকলে জায়েয
যদি দাওয়াতের আয়োজন এমনভাবে করা হয় যে, পুরুষদের জন্য আলাদা কক্ষ/ব্যবস্থা এবং মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা থাকে, এবং কোনোভাবেই পর্দা লঙ্ঘন না হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে অমুসলিম পরিবারকে দাওয়াত দেওয়া জায়েয হতে পারে। তবে শর্ত হলো, দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, শুধু সামাজিকতা নয়।
৩. দাওয়াতের আদব ও শর্তাবলী
যদি আপনি অমুসলিম প্রতিবেশী বা বন্ধুকে দাওয়াত দিতে চান, তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখুন:
১. উদ্দেশ্য শুদ্ধ হওয়া: দাওয়াতের মূল লক্ষ্য হবে ইসলামের সুন্দর বার্তা পৌঁছানো এবং সম্পর্ক উন্নয়ন, যাতে পরবর্তীতে দাওয়াত দেওয়া সহজ হয়। আল্লাহ বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ "তোমার রবের পথের দিকে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
২. হারাম জিনিস এড়ানো: খাবারে যেন কোনো হারাম উপাদান (শুকর, মদ, ইত্যাদি) না থাকে। তবে খাবার যদি হালাল হয়, তবে তা পরিবেশন করা যাবে।
৩. পর্দার কঠোর প্রতিপালন: মহিলাদের উপস্থিতি থাকলে অবশ্যই পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কোনো (গায়রে মাহরাম) নারীর সাথে একান্তে দেখা না করে। কারণ, তাদের একান্তে মিলন হলে তৃতীয়জন থাকে শয়তান।" (সহীহ বুখারী: ৩০৫৬, সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)
৪. মহিলাদের অংশগ্রহণ: সাধারণত অমুসলিম মহিলাদের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে, মুসলিম মহিলাদের মাধ্যমেই দাওয়াত পৌঁছানো উত্তম। মুসলিম পুরুষের পক্ষে অমুসলিম মহিলাদেরকে সরাসরি দাওয়াত দেওয়া বা তাদের সাথে আলোচনা করা ফিতনার কারণ হতে পারে।
৪. সালাফদের মতামত
শাইখ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: "অমুসলিম প্রতিবেশীকে খানা খাওয়ানো যাবে কি?" উত্তরে তিনি বলেন:
"যদি তার মধ্যে কল্যাণের আশা থাকে এবং ইসলাম গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে, তবে তাকে খানা খাওয়ানো এবং দাওয়াত দেওয়া জায়েয, বরং এটি দাওয়াতের একটি উত্তম মাধ্যম। তবে শর্ত হলো, পর্দার বিধান যেন লঙ্ঘিত না হয় এবং মহিলাদের সাথে কোনো প্রকার মিশে যাওয়া না হয়।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায)
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"অমুসলিমকে দাওয়াত দেওয়া জায়েয, যদি দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর আশা থাকে। কিন্তু যদি দাওয়াতটি শুধুমাত্র সামাজিকতার জন্য হয় এবং তাতে কোনো শরয়ী লাভ না থাকে, তবে তা পরিত্যাগ করা উত্তম। বিশেষ করে যদি তাতে পর্দা লঙ্ঘনের আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা সম্পূর্ণ হারাম।"
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
-
যদি দাওয়াতে মহিলা সদস্যরা উপস্থিত থাকেন এবং মুসলিম পুরুষদের সাথে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ, কথা বলা বা মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সেই দাওয়াত দেওয়া জায়েয নয়। কারণ এটি পর্দা লঙ্ঘন এবং ফিতনার কারণ।
-
যদি দাওয়াতের আয়োজন এমন হয় যে, মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা আছে, পর্দার কোনো লঙ্ঘন হবে না, এবং দাওয়াতের উদ্দেশ্য ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো, তাহলে সেক্ষেত্রে দাওয়াত দেওয়া জায়েয। তবে মহিলাদের দাওয়াতের দায়িত্ব মুসলিম মহিলাদের উপর অর্পণ করা উত্তম।
-
সাধারণভাবে, অমুসলিম পুরুষকে (মহিলা ছাড়া) দাওয়াত দেওয়া এবং তার সাথে সদাচরণ করা জায়েয, যদি তাতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর আশা থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং সকল কাজে পর্দা ও শরীয়তের সীমারেখা রক্ষা করার তাওফীক দিন। (আমিন)
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- সূরা আল-মুমতাহানা: ৮
- সূরা আন-নাহল: ১২৫
- সহীহ বুখারী: ৩০৫৬
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায
- মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন
- শাইখ সালেহ আল-ফাওযানের ফতোয়া