কসম সম্পর্কিত প্রশ্ন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১. আমার ভাই,বয়স ২৫ বছর। সে রেগে আল্লাহর কসম বলে বলেছে সে কিছু কিনে আনলে আমাকে খাওয়াবে না। এরপর সে ভুল বুঝতে পেরেছে যে বলা ঠিক হয়নি। সে খাবার আনার পর আমি খেয়েছি।এখন এই কসমের কাফফারা কিভাবে আদায় করতে হবে?
২. ১২-১৩ বছরের ছেলে যদি আল্লাহর কসম করে বলে আমি দোকানে যাব না,কিছু এনে দিবো না।পরে আবার যায়,যেতে হবেই কারন ঘরের দরকারী জিনিস আনতে। সেক্ষেত্রে তার জন্যে কি কোনো কাফফারা আছে?
৩. দোয়া শুরু করলে আল্লাহর প্রশংসা ও দুরুদ পড়তে হয়,কিন্তু আমরা যখন উঠতে বসতে রান্না করতে দোয়া করি তখনও কি প্রশংসা, দুরুদ পাঠ করতে হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নগুলোর জন্য ধন্যবাদ। নিচে ক্রমান্বয়ে উত্তর দেওয়া হলো:
১. ভাইয়ের কসম ভঙ্গের কাফফারা
উত্তর: আপনার ভাই (২৫ বছর) রাগের মাথায় আল্লাহর নামে কসম করে বলেছে যে, সে কিছু কিনে আনলে আপনাকে খাওয়াবে না। কিন্তু পরে সে তা ভেঙে ফেলেছে (আপনাকে খাওয়ানোর মাধ্যমে)। যেহেতু সে সচেতনভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কসমটি ভঙ্গ করেছে, তাই তার ওপর কসম ভঙ্গের কাফফারা (শরীয়তসম্মত ক্ষতিপূরণ) আদায় করা ফরজ (অবশ্যকীয়)।
কাফফারার বিধান: কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে:
"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের শপথসমূহের (অর্থহীন) জন্য পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন সেসব শপথের জন্য যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করেছ। সুতরাং এর কাফফারা হলো—তোমরা তোমাদের পরিবার-পরিজনকে যে খাবার দাও, তার মধ্যম মানের (একটি) খাবার দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একটি দাস মুক্ত করা। আর যে (এগুলো) সামর্থ্য রাখে না, তার জন্য তিন দিন সিয়াম (রোজা) পালন করা। এটাই তোমাদের শপথের কাফফারা যদি তোমরা শপথ করো। আর তোমরা তোমাদের শপথসমূহ রক্ষা করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
বিস্তারিত নিয়ম (হানাফি মাযহাব মতে):
- প্রথম বিকল্প: দশজন মিসকিন (গরিব) লোককে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়ানো, অথবা প্রত্যেককে এত পরিমাণ খাদ্যশস্য (গম, চাল ইত্যাদি) দান করা যা দিয়ে সে একদিনের খাবার তৈরি করতে পারে। হানাফি মাযহাবে এই পরিমাণ হলো প্রায় ৩.৬ কেজি (অর্থাৎ সাড়ে তিন কেজির কাছাকাছি) গম বা তার সমমূল্যের চাল/টাকা প্রত্যেক মিসকিনকে দেওয়া।
- দ্বিতীয় বিকল্প: দশজন মিসকিনকে এমন পোশাক দেওয়া যা দিয়ে তারা নামাজ পড়তে পারে (অর্থাৎ শরীরের প্রয়োজনীয় অংশ ঢেকে যায়)।
- তৃতীয় বিকল্প: একটি দাস/দাসী মুক্ত করা (বর্তমান যুগে প্রযোজ্য নয়)।
- চতুর্থ বিকল্প: যদি উপরোক্ত কোনোটি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে টানা ৩ দিন রোজা রাখা। তবে মনে রাখতে হবে, কাফফারা হিসেবে রোজা রাখার অনুমতি তখনই, যখন খাওয়ানো বা বস্ত্র দেওয়ার সামর্থ্য না থাকে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোজা রাখা জায়েজ নেই।
সারকথা: আপনার ভাইয়ের উচিত উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী কাফফারা আদায় করা। যেহেতু সে ২৫ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক, তাই তার জন্য এটি ফরজ।
২. ১২-১৩ বছরের ছেলের কসম ভঙ্গের বিধান
উত্তর: ইসলামি আইনে কসমের বিধান প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ) ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য। ১২-১৩ বছরের ছেলে সাধারণত বালিগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হয়ে থাকে, যদি তার মধ্যে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ (স্বপ্নদোষ, ইত্যাদি) দেখা দিয়ে থাকে। তবে যদি সে এখনো বালিগ না হয়ে থাকে, তাহলে তার কসম কোনো শারীরিক বা আর্থিক কাফফারার দাবি রাখে না।
তবে, যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে "যেতেই হবে কারণ ঘরের দরকারী জিনিস আনতে", তাই এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি নীতি প্রযোজ্য:
জরুরত ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কসম ভঙ্গ করা জায়েজ আছে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে কসম করে, অতঃপর তার বিপরীত কাজ করাকে উত্তম মনে করে, সে যেন কসমের কাফফারা দেয় এবং উত্তম কাজটি করে।" (সহিহ মুসলিম: ১৬৫০)
অর্থাৎ, ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস আনা যদি সত্যিই জরুরি হয়, তাহলে তার জন্য কসম ভঙ্গ করা বৈধ হবে এবং তাকে কাফফারা দিতে হবে।
কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত ছেলেটির বয়স ১২-১৩ বছর। যদি সে এখনো বালিগ না হয়, তাহলে তার ওপর কাফফারা (দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো বা ৩ দিন রোজা) ওয়াজিব নয়। তবে তাকে শাসন করা এবং বোঝানো উচিত যে, আল্লাহর নামে কসম করা খুবই গুরুতর বিষয়, খেলার ছলে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কসম করা উচিত নয়। তাকে বলতে হবে, ভবিষ্যতে প্রয়োজনের কথা চিন্তা করে কসম না করতে।
যদি সে বালিগ হয়ে থাকে, তাহলে তার ওপরও উপরোক্ত নিয়মে (১ নং প্রশ্নের মতো) কাফফারা আদায় করা ফরজ হবে।
সারকথা: ১২-১৩ বছরের ছেলেটি যদি বালিগ না হয়, তার কোনো কাফফারা নেই। তবে তাকে উপদেশ দিতে হবে। আর যদি বালিগ হয়, তাহলে ঘরের জরুরি প্রয়োজনে কসম ভঙ্গ করা জায়েজ আছে, তবে তাকে কাফফারা দিতে হবে।
৩. দোয়ার শুরুতে প্রশংসা ও দুরুদ পাঠের বিধান
উত্তর: সাধারণভাবে দোয়া করার সময় শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা (সানা) ও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং দোয়া কবুলের অন্যতম মাধ্যম। হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"যখন তোমাদের কেউ দোয়া করে, সে যেন প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করে, অতঃপর নবীর প্রতি দরূদ পাঠ করে, এরপর যা ইচ্ছা দোয়া করে।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮১)
তবে, প্রশ্নে উল্লেখিত "উঠতে-বসতে, রান্না করতে দোয়া" বলতে সাধারণত যিকর বা ছোট ছোট দোয়া (যেমন: বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, দুআ ইত্যাদি) বোঝানো হয়। এই ধরনের দৈনন্দিন ছোট ছোট দোয়া বা যিকরের ক্ষেত্রে শুরুতে আলাদাভাবে দরূদ ও প্রশংসা পাঠ করা জরুরি নয়। এগুলো নিজে নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ দোয়া বা যিকর।
সারকথা: আপনি যখন একটি পূর্ণাঙ্গ দোয়া করবেন (যেমন: হাত তুলে দোয়া করা), তখন শুরুতে প্রশংসা ও দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। কিন্তু উঠা-বসা, রান্না করা, খাওয়া-দাওয়ার আগে/পরে ছোট ছোট দোয়া বা যিকর করার সময় আলাদাভাবে প্রশংসা ও দরূদ পাঠ করা জরুরি নয়; সরাসরি সেই দোয়াটি পড়লেই হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।