দান করার পর মনে ভালো লাগলে কি সদাকাহ বাতিল হবে?
Zakat and Charity · Hanafi
Question
আমার প্রশ্ন হলো, আস-সুন্নাহ বা এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠানে দান-সদাকাহ্ করলে একদম শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যত এরকম যতো সদাকাহ্ করা হয়েছে সেই অ্যামাউন্টটা দেখায়। তো আমি যদি সেই অ্যামাউন্টটা দেখে নিজের মধ্যে ভালোলাগা সৃষ্টি হয় (মানে ভালোলাগার বিষয়টা এমন যে, আমি আল্লাহর রাস্তায় এতো টাকা সদাকাহ্ করতে পেরেছি এটা মনে আসা), তাহলে কি আমার এই সদাকাহ্ শিরকে খফী হিসেবে বিবেচ্য হবে? বা এটা কি বাতিল বলে গণ্য হবে?
জাঝাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। দান-সদাকাহ করার পর নিজের মনে ভালোলাগা সৃষ্টি হওয়া এবং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে পেরেছে বলে আনন্দ অনুভব করা একটি স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি। ইসলামে এই অনুভূতিকে শিরকে খফী (গোপন শিরক) বা সদাকাহ বাতিল হওয়ার কারণ হিসেবে গণ্য করা হয় না, যদি না সেই ভালোলাগা বা আনন্দের মূল উদ্দেশ্য হয় লোক দেখানো (রিয়া) বা নিজের প্রশংসা কামনা করা।
আসুন বিষয়টি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বুঝার চেষ্টা করি।
১. নিয়তের গুরুত্ব
ইসলামে সকল আমলের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে নিয়তের উপর। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করেছে।" (সহিহ বুখারি: ১, সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)
আপনি যখন দান করেছেন, তখন আপনার নিয়ত ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দান করার পর সেই দানের পরিমাণ দেখে মনে মনে খুশি হওয়া বা "আল্লাহ আমাকে এই তাওফিক দিয়েছেন" এই ভাবনা পোষণ করা আপনার মূল নিয়তকে নষ্ট করে না। বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি রূপ হতে পারে।
২. শিরকে খফী (গোপন শিরক) কী?
শিরকে খফী হলো এমন গোপন শিরক যা মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকে, যেমন: রিয়া (লোক দেখানো) বা নিজের আমলকে বড় মনে করে অহংকার করা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রিয়াকে "ছোট শিরক" (শিরকুল আসগার) বলেছেন। (মুসনাদ আহমাদ: ২৩৬৩০)
তবে, দান করার পর মনে মনে আনন্দিত হওয়া এবং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার তাওফিক পেয়েছে বলে খুশি হওয়া রিয়া নয়। রিয়া হলো সেই অবস্থা যখন দানের সময় বা দানের পর মানুষের প্রশংসা কামনা করা হয় বা মানুষকে দেখানোর জন্য দান করা হয়। আপনার বর্ণনায় সেই লক্ষণ নেই।
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী)-এ উল্লেখ আছে যে, ইবাদতের পর আনন্দিত হওয়া বা সন্তুষ্ট হওয়া ইবাদতের সওয়াব নষ্ট করে না, বরং এটি মুমিনের জন্য একটি সুসংবাদ। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
"বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের জন্য তারা যেন আনন্দ করে। এটা তাদের সমস্ত সম্পদ থেকে উত্তম।" (সূরা ইউনুস: ৫৮)
তবে, ফুকাহায়ে কেরাম সতর্ক করেছেন যে, দান করার পর নিজের আমলকে বড় মনে করে অহংকার করা বা অন্যের দানকে ছোট করে দেখার মনোভাব পোষণ করা মারাত্মক গুনাহ। এটি সদাকাহকে নষ্ট করতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, আমলের মধ্যে অহংকার (উজব) প্রবেশ করলে সওয়াব কমে যেতে পারে, তবে দানটি বাতিল হয় না; বরং সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৪. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
আপনি যদি দানের পরিমাণ দেখে শুধুমাত্র এই আনন্দ অনুভব করেন যে, "আল্লাহ তাআলা আমাকে এই তাওফিক দিয়েছেন, আমি তাঁর রাস্তায় এত টাকা খরচ করতে পেরেছি" — এটি একটি প্রশংসনীয় অনুভূতি। এটি আপনার সদাকাহকে বাতিল করবে না এবং শিরকে খফী হিসেবে গণ্য হবে না। বরং এটি আপনার ঈমানের আলামত এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
তবে, যদি সেই ভালোলাগার মধ্যে এই ভাবনা থাকে যে, "আমি অনেক বড় দানশীল, আমি ছাড়া আর কে এত দান করতে পারে" বা "লোকেরা আমাকে দেখে প্রশংসা করুক" — তাহলে সেটি রিয়া বা অহংকারের পর্যায়ে পড়বে এবং সওয়াব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
৫. করণীয়
১. দান করার সময় এবং দানের পর সর্বদা নিয়তকে খালিস (শুদ্ধ) রাখার চেষ্টা করুন। ২. দানের পরিমাণ দেখে আনন্দিত হলে সাথে সাথে বলুন: "আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি বি নি'মাতিহি তাতিম্মুস সালিহাত" (যে নিয়ামতের মাধ্যমে ভালো কাজসমূহ পূর্ণ হয়, সেই আল্লাহরই প্রশংসা)। ৩. নিজের আমলকে বড় মনে না করে বরং আল্লাহর দান মনে করুন। মনে রাখবেন, দান করার সামর্থ্য আল্লাহই দিয়েছেন। ৪. দান গোপন রাখার চেষ্টা করুন, তবে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দান করলে সেটি গোপন থাকে না, কিন্তু নিয়ত শুদ্ধ থাকলে সমস্যা নেই।
উপসংহার
আপনার সদাকাহ সম্পূর্ণ বৈধ এবং গ্রহণযোগ্য। দান করার পর ভালোলাগা অনুভব করা স্বাভাবিক এবং এটি আপনার সদাকাহকে বাতিল করবে না। শুধুমাত্র অহংকার ও লোক দেখানোর নিয়ত থেকে নিজেকে বাঁচান। আল্লাহ তাআলা আপনার সকল নেক আমল কবুল করুন এবং এতে বারাকাহ দিন। আমিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।