সন্তানের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা ও পালক পিতার নামে পরিচয় দেওয়ার বিধান কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5083
Questioner: Shahzady kabir Munnie
Question Asked: 07 Sep 2026, 07:43 AM
Reviewed & Published: 07 Sep 2026, 07:57 AM
Views: 31
Tokens: 7,764
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, শায়েখ আমি একটা প্রশ্ন জানতে চাচ্ছিলাম।
আমার মেয়ের বয়স যখন ৪০ দিন তখন আমার স্বামীর সাথে আমার ডির্ভোস হয়।এর পর থেকে সে মেয়ে খরচ দেওয়া তো দূরের কথা কোন দিন খবর ও নে নি।।এমন কি মেয়ের জন্ম নিবন্ধন করার করার জন্য আমি নিজে তার সাথে যোগাযোগ করলেও সে তার ডকুমেন্টস দিতে রাজি হয়নি।সে ডির্ভোসের ২ মাস পর বিয়ে করে এবং তার বাচ্চা ও হয়।আমার মেয়ের বয়স যখন ২ বছর তখন আমার আবার বিয়ে দেওয়া হয়।আমার মেয়ে যেহেতু তার বাবাকে কোন দিন দেখেনি তাই আমার বর্তমান স্বামী কে আমি শর্ত দিয়েছিলাম, যদি আমার মেয়ের পিতা হতে পারে তাহলে যেন আমাকে বিয়ে করে। এখন আমার মেয়ের বয়স ১১ বছর। মেয়ে বাবা হিসেবে ওকেই চিনে এবং জন্ম নিবন্ধনেও আমার স্বামীর নাম।এখন অনেকে আমাকে বলতেছে বিয়ের সময় নিজের বাবার নাম না দিলে নাকি বিয়ে হয়না।বর্তমানে ও সহ আমার ২ সন্তান।আমার মেয়ে যদি জানে তার বাবা অন্য কেও তাহলে সে খুব কষ্ট পাবে এবং ভাইবোনের মাঝে দূরত্ব তৈরি হবে।তাছাড়া মেয়ে পড়ালেখায় খুব ভালো ওর জীবনের এতবড় ধাক্কা ও সামলাতে পারবেনা।এর চেয়ে বড় কথা আমার প্রথম স্বামী কখনো ওর খুঁজ নে নি।আমার বর্তমান স্বামী ওকে খুব ভালবাসে তাই সে আল্লাহ কে বলে তার যেন এ মেয়েটা ছাড়া আর কোন মেয়ে না হয় যদি কখনো তফাৎ তৈরি হয় এ কারণে। আল্লাহ তো রহমানুর রহিম সব কিছু জানেন এবং বুঝেন।প্রশ্ন হলো আমি যদি মেয়েকে বর্তমান পরিচয়ে বড় করি তাহলে কি আমি গুণাহ্গার হব এবং বিয়ের সময় নিজের পিতার নাম না দিলে কী বিয়ে হবে না????তাহলে রাস্তায় খুড়িয়ে পাওয়া ছেলে মেয়েদেরও তো নিজের পিতা মাতার পরিচয় থাকেনা।তাহলে তারা কেন পালক পিতা মাতার পরিচয়ে বড় হয় ও বিয়ে করে?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল। আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ ও মানসিক অবস্থা নিয়ে আপনার উদ্বেগ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে, যা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।

১. সন্তানের পিতৃ-পরিচয় (নসব) সংরক্ষণের গুরুত্ব

ইসলামে সন্তানের বংশপরিচয় (নসব) সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি একটি মৌলিক অধিকার। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন:

ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ ۚ فَإِن لَّمْ تَعْلَمُوا آبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ "তোমরা তাদের (দত্তক সন্তানদের) পিতার নামে ডাকবে। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সংগত। যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই এবং বন্ধু।" (সূরা আল-আহযাব: ৫)

এই আয়াতের ভিত্তিতে ইসলামী আইনবিদগণ সর্বসম্মতভাবে ঘোষণা করেছেন যে, কোনো সন্তানকে তার প্রকৃত পিতা ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্কিত করা (অর্থাৎ অন্য কাউকে পিতা বলে চালিয়ে দেওয়া) সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ، أَوِ انْتَمَى إِلَى غَيْرِ مَوَالِيهِ، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللهِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ "যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে দাবি করে বা নিজেকে অন্য মনিবের সাথে সম্পর্কিত করে, তার উপর আল্লাহ, ফেরেশতাগণ এবং সকল মানুষের অভিশাপ।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৬০৯, সহীহ বুখারি ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী)

২. আপনার প্রশ্নের জবাব: পালক পিতা-মাতার পরিচয়

আপনি রাস্তায় পাওয়া ছেলে-মেয়েদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো, যদি প্রকৃত পিতা-মাতার পরিচয় না জানা যায়, তাহলে তাদেরকে "পালক পিতা-মাতার" সন্তান বলা যাবে না। বরং তাদেরকে ইসলামী পরিভাষায় বলা হবে "লাকীত" (পরিত্যক্ত সন্তান)। তাদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের নিয়ম হলো, তাদেরকে সমাজের "ধর্মীয় ভাই" বা "আজাদকৃত গোলাম" হিসেবে সম্বোধন করা হবে। তবে তাদের জন্মসূত্রে প্রকৃত পিতা-মাতার পরিচয় না থাকলেও, তাদেরকে কোনো ব্যক্তি "পালক পিতা" হিসেবে লালন-পালন করলে, সেই পালক পিতার নামে তাদেরকে ডাকা বা তাদের বংশ পরিচয় পালক পিতার সাথে যুক্ত করা জায়েয নয়। বরং তাদেরকে বলা হবে অমুকের লালিত-পালিত সন্তান।

আপনার মেয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনার মেয়ের প্রকৃত পিতা একজন জীবিত, পরিচিত ব্যক্তি। তার পরিচয় গোপন করার বা অন্য কাউকে পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। এটি একটি বড় গুনাহ এবং প্রতারণা।

৩. বিবাহের সময় পিতার নামের গুরুত্ব

বিবাহের সময় পাত্র-পাত্রীর পিতৃ-পরিচয় জানা অপরিহার্য। কারণ ইসলামী আইনে বিবাহের বৈধতার জন্য অভিভাবকের (ওয়ালী) সম্মতি অপরিহার্য। পিতাই হলেন কন্যার স্বাভাবিক অভিভাবক।

এখন প্রশ্ন হলো,পিতার নামে ভুল বললে সেক্ষেত্রে বিবাহ শুদ্ধ হবে কিনা?

জবাবঃ- শরীয়তের বিধান হলো,বিবাহের ইজাব কবুলের সময় কাজি সাহেব যদি ছেলে/মেয়ের বাবার নামের ক্ষেত্রে ভুল বলে অর্থাৎ ছেলে/মেয়ের বাবার নামের ক্ষেত্রে অন্য নাম বা সৎ বাবার নাম বলে,এবং তার দিকে ছেলে/মেয়েকে নিসবত করে,তাহলে সেই ছেলে/মেয়ের বিবাহ শুদ্ধ হবেনা।

অবশ্য যদি ছেলে/মেয়ে নিজেই সেই বিবাহের মজলিসে উপস্থিত থাকে,এবং উকিলের পরিবর্তে নিজেই ইজাব কবুল করে বা তার দিকে ইশারা করে ইজাব কবুল করা হয়,তাহলে ছেলে/মেয়ের বাবার নামে ভুল হওয়া সত্ত্বেও উক্ত বিবাহ হয়ে যাবে।

الدر المختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار) (3/ 26) '' (غلط وكيلها بالنكاح في اسم أبيها بغير حضورها لم يصح)؛ للجهالة وكذا لو غلط في اسم بنته إلا إذا كانت حاضرةً وأشار إليها فيصح۔ (قوله: لم يصح)؛ لأن الغائبة يشترط ذكر اسمها واسم أبيها وجدها، وتقدم أنه إذا عرفها الشهود يكفي ذكر اسمها فقط خلافاً لابن الفضل، وعند الخصاف يكفي مطلقاً، والظاهر أنه في مسألتنا لا يصح عند الكل؛ لأن ذكر الاسم وحده لا يصرفها عن المراد إلى غيره، بخلاف ذكر الاسم منسوباً إلى أب آخر، فإن فاطمة بنت أحمد لا تصدق على فاطمة بنت محمد، تأمل، وكذا يقال فيما لو غلط في اسمها، (قوله: إلا إذا كانت حاضرةً إلخ) راجع إلى المسألتين: أي فإنها لو كانت مشاراً إليها وغلط في اسم أبيها أو اسمها لا يضر؛ لأن تعريف الإشارة الحسية أقوى من التسمية، لما في التسمية من الاشتراك لعارض فتلغو التسمية عندها، كما لو قال: اقتديت بزيد هذا، فإذا هو عمرو، فإنه يصح'' সারমর্মঃ- যদি উকিল মেয়ের অনুপস্থিতিতে মেয়ের বাবার নামে ভুল করে,তাহলে উক্ত বিবাহ শুদ্ধ হবেনা। হ্যাঁ যদি মেয়ে সেই মজলিসে উপস্থিত থাকে,এবং তার দিকে ইশারা করা হয়,সেক্ষেত্রে উক্ত বিবাহ হয়ে যাবে।

৪. আপনার করণীয়

১. সত্য প্রকাশ করা ফরজ: আপনার মেয়ের প্রকৃত পিতার পরিচয় গোপন করা এবং আপনার বর্তমান স্বামীকে তার পিতা হিসেবে পরিচয় দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। আপনাকে অবশ্যই এই গুনাহ থেকে তওবা করতে হবে। আপনার মেয়ের বয়স এখন ১১ বছর। এখনই তাকে সত্য জানানো আপনার জন্য আবশ্যক। আপনি যত দেরি করবেন, সত্য জানার পর তার জন্য ধাক্কাটা তত বেশি কষ্টকর হবে।

২. জন্ম নিবন্ধন সংশোধন: আপনার মেয়ের জন্ম নিবন্ধনে আপনার প্রথম স্বামীর নাম (প্রকৃত পিতা) উল্লেখ করা আবশ্যক। বর্তমানে আপনার দ্বিতীয় স্বামীর নাম থাকা সম্পূর্ণ বেআইনি ও গুনাহের কাজ। আপনাকে অবশ্যই এটি সংশোধন করতে হবে।

৩. সন্তানকে বোঝানো: আপনার মেয়েকে ধীরে ধীরে এবং কোমলভাবে সত্য জানান। তাকে বোঝান যে, তার প্রকৃত পিতা আপনার প্রথম স্বামী, যিনি আপনাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তবে তার বর্তমান "বাবা" (আপনার দ্বিতীয় স্বামী) তাকে ভালোবাসেন এবং লালন-পালন করেছেন, তিনি তার "পালক পিতা" বা "চাচা" হিসেবে থাকবেন। ইসলামে পালক পিতার সম্মান ও মর্যাদা অনেক। তাকে বোঝান যে, তার বর্তমান বাবা তাকে ভালোবাসেন, কিন্তু শরীয়তের বিধানে তার প্রকৃত পিতার নামই বলতে হবে।

৪. পারিবারিক সম্পর্ক: আপনার বর্তমান স্বামী ও তার সন্তানদের সাথে আপনার মেয়ের সম্পর্ক নষ্ট হবে না, যদি আপনি তাকে সঠিকভাবে বোঝাতে পারেন। তাকে বোঝান যে, তার বর্তমান বাবা তাকে ভালোবাসেন এবং তার ভাইবোনেরা তার আপন ভাইবোন। শুধুমাত্র বংশ পরিচয়ের ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান মানতে হবে।

৫. গুনাহের প্রসঙ্গ

আপনি যদি জেনেশুনে আপনার মেয়েকে আপনার বর্তমান স্বামীর সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন এবং জন্ম নিবন্ধনে তার নাম রাখেন, তবে আপনি গুনাহগার হবেন। এটি একটি কবিরা গুনাহ। আপনাকে অবশ্যই এই কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ইতিমধ্যে হয়ে থাকলে তা সংশোধন করতে হবে।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.