দ্বীনদার কোনো মেয়েকে দেখে ভালো না লাগলেও তাকে বিয়ে করা কি বাধ্যতামূলক?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 5022
Questioner: Mohammad Masum
Question Asked: 05 Sep 2026, 03:21 PM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 03:31 PM
Views: 18
Tokens: 5,146
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নারীর সাথে চারটি বিষয়ের কারণে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলাময় হোক।" (বুখারি: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬)

মূল প্রশ্নঃ একটা মেয়ে আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, মেয়েটার ডিভোর্সি। আমি এখনো বিবাহ করিনি।
আমি প্রাথমিক অবস্থায় যতটুকু বুঝেছিলাম যে তার দ্বীনদারিতা ঠিক আছে মোটামুটি, তাই তার দ্বীনদারীতাকে প্রধান্য দিয়ে ডিভোর্সি জানার পরেও দেখতে যাই। কিন্তু দেখার পর তাকে আমার ভালো লাগেনি মানে একজন স্ত্রী হিসেবে তাকে আমি ফিল করতে পারিনি।

এখন হাদিসের মধ্যে যে বলা হয়েছে যে তোমরা যদি দ্বীনদারী তাকে প্রধান্য না দেও তাহলে তোমাদের হাত ধুলোয় ধুসরিত হবে বা তোমরা লাঞ্ছিত হবে।
এখন আমি দ্বীনদারী থেকে প্রধান্য দিয়েই তাকে দেখতে গেছি ডিভোর্সি জানার পরেও। কিন্তু তাকে দেখে আমার ভালো লাগেনি। এখন তাকে যদি আমি বিবাহর না করি তাহলে কি হাদিসের যাদের লাঞ্ছিত হবার কথা বলা হয়েছে তাদের অন্তর্ভুক্ত আমি হব?

Answer

বিবাহ সংক্রান্ত পরামর্শ

প্রশ্নের উত্তর:

আপনি যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, তা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত। হাদীসটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিবাহের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়া। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দ্বীনদার কোনো মেয়েকে দেখে ভালো না লাগলেও তাকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করতেই হবে।

হাদীসটির ব্যাখ্যা:

হাদীসটি একটি পথনির্দেশনা (ইরশাদ), কোনো বাধ্যবাধকতা (ফরজ) নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিবাহের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন—সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীন। এর মধ্যে দ্বীনদারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার উপদেশ দিয়েছেন, কারণ দ্বীনদার নারী স্বামীর জন্য পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় দিক থেকেই কল্যাণকর।

তবে ইসলাম কখনোই জোরপূর্বক বা অপছন্দনীয় সম্পর্কে বাধ্য করে না। বিবাহ একটি পারস্পরিক সম্মতি ও আকর্ষণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা:

১. দ্বীনদারিতা গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র মানদণ্ড নয়: আপনি দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেখতে গিয়েছেন—এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু দেখার পর আপনার মনোযোগ বা আকর্ষণ (ফিলিং) না আসা স্বাভাবিক। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, স্ত্রী নির্বাচনে পারস্পরিক আকর্ষণ ও মানসিক সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ।

২. হাদীসের লাঞ্ছিত হওয়ার অর্থ: হাদীসে যে "লাঞ্ছিত হওয়ার" কথা বলা হয়েছে, তা তাদের জন্য যারা শুধুমাত্র সম্পদ, সৌন্দর্য বা বংশের কারণে বিয়ে করে এবং দ্বীনদারিতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। আপনি তো দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিয়েই দেখতে গিয়েছেন। সুতরাং আপনি সেই লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।

৩. বিয়েতে অস্বীকৃতি জানানো দোষণীয় নয়: আপনি যদি তাকে দেখে ভালো না লাগে, তাহলে তাকে বিয়ে না করা আপনার জন্য বৈধ এবং উত্তম। কারণ বিয়ের পর যদি আপনি তাকে গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে তা উভয়ের জন্য কষ্টকর হবে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

৪. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি: ইসলামি ফিকহে বিবাহের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতি (ইজাব-ও-কবুল) অপরিহার্য। কাউকে জোর করে বিয়ে করানো ইসলাম সমর্থন করে না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মতি ছাড়া বিবাহ সহীহ নয়।

৫. ভালোভাবে না লাগলে প্রত্যাখ্যান করা জায়েয: আপনি যদি সৎভাবে তাকে দেখে থাকেন এবং মনে মনে গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে বিনয়ের সাথে তাকে জানিয়ে দেওয়া উত্তম। এতে কোনো গুনাহ নেই।

ফিকহি নির্দেশনা:

  • বিবাহের পূর্বে দেখা: ইসলামি শরিয়তে বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীকে একে অপরকে দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেখার পর পছন্দ না হলে বিয়ে না করার অধিকার রয়েছে।
  • মিথ্যা আশা না দেওয়া: যদি আপনি তাকে বিয়ে করতে না চান, তাহলে তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে সে অন্য কোথাও বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারে।
  • দ্বীনদারিতা ও আকর্ষণের সমন্বয়: আদর্শ হলো এমন কাউকে খোঁজা, যিনি দ্বীনদার এবং যাকে আপনি পছন্দ করেন। দ্বীনদার কিন্তু অপছন্দনীয় কাউকে বিয়ে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, কারণ তা দাম্পত্য জীবনে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি:

রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বিবাহের ক্ষেত্রে কুফু (সামঞ্জস্যতা) শর্ত। এর মধ্যে ধর্মীয় অবস্থা, সামাজিক মর্যাদা, বংশ ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়। তবে পারস্পরিক সম্মতি ও পছন্দ সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ।

ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া:

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর ফাতাওয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক সম্মতি এবং মানসিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। দ্বীনদারিতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র দ্বীনদারিতার কারণে অপছন্দনীয় কাউকে বিয়ে করা উচিত নয়।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:

আপনি যদি তাকে দেখে ভালো না লাগে এবং মনে মনে গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে তাকে বিয়ে না করাই উত্তম। এতে আপনি হাদীসের লাঞ্ছিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। কারণ:

১. আপনি দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ২. আপনি সৎভাবে দেখতে গিয়েছেন ৩. আপনার মনোযোগ না আসা আপনার নিয়ন্ত্রণে নয় ৪. বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা ভালোবাসা ও সম্মতির ভিত্তিতে হওয়া উচিত

পরামর্শ: আপনি যদি দ্বীনদার নারীকে বিয়ে করতে চান, তাহলে অন্য দ্বীনদার নারীদের খোঁজ করতে পারেন। যেখানে দ্বীনদারিতা ও আপনার পছন্দ—উভয়ই থাকবে। আল্লাহ তাওফিক দিন।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.