উমরাহ সফরে হায়েয চলে আসলে করণীয় কি?

Hajj and Umrah · Hanafi

Question No: 5017
Questioner: Tasnia Zakaria
Question Asked: 05 Sep 2026, 02:44 PM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 03:37 PM
Views: 22
Tokens: 5,340
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমরা মোট ১৪ দিনের জন্য উমরাহ করতে যাব—এর মধ্যে ৬ দিন মক্কায় এবং ৭ দিন মদিনায় থাকব। আমার পিরিয়ড সাধারণত প্রায় ৭ দিন থাকে।
এখন যদি মক্কায় থাকা ৬ দিনের মধ্যেই আমার পিরিয়ড চলতে থাকে, তাহলে আমার কী করণীয়?
১. পিরিয়ডের কারণে যদি আমি উমরাহ করতে না পারি এবং মক্কায় থাকার সময় শেষ হয়ে যায়, তাহলে কি উমরাহ না করেই আমাকে দেশে ফিরে আসতে হবে?
২. পিরিয়ড অবস্থায় কি আমাকে উমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধতে হবে? ইহরাম বাঁধলে কিন্তু উমরাহ করতে না পারলে কী হবে?
৩. পিরিয়ড অবস্থায় কি আমি মসজিদুল হারামে প্রবেশ করতে পারব? সেখানে বসে থাকতে পারব কি?
৪. মদিনায় পিরিয়ড অবস্থায় কি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করা বা সেখানে বসে থাকা যাবে?
৫. যদি মক্কায় থাকা অবস্থায় পিরিয়ড শেষ না হয়, তাহলে পুরো উমরাহর বিষয়টি কীভাবে সম্পন্ন করব?

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। পিরিয়ড (হায়েজ) অবস্থায় উমরাহ ও মসজিদে প্রবেশ সংক্রান্ত বিধান সম্পর্কে জানতে চাওয়ায় আমি আপনাকে কুরআন, হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত জানাচ্ছি। আপনার উদ্বেগ দূর করতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নিচের উত্তরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

উত্তর:

পিরিয়ড (হায়েজ) অবস্থায় একজন নারীর জন্য কিছু কাজ নিষিদ্ধ, যেমন- নামাজ, রোজা, তাওয়াফ এবং মসজিদে অবস্থান। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি উমরাহর সফর থেকে বিরত থাকবেন বা আপনার ইবাদতের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। পবিত্র অবস্থায় আপনি যেসব ইবাদত করতে পারবেন, যেমন- জিকির, দরুদ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত (স্পর্শ না করে) ইত্যাদি, সেগুলো আপনি করতে পারবেন।

আপনার ৫টি প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

১. পিরিয়ডের কারণে উমরাহ না করতে পারলে কি দেশে ফিরে আসতে হবে?

না, পিরিয়ডের কারণে উমরাহ না করতে পারলে আপনাকে দেশে ফিরে আসতে হবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। উমরাহ একটি সুন্নত ইবাদত, যা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যদি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে পিরিয়ড শেষ না হয় এবং আপনি তাওয়াফ করতে না পারেন, তাহলে আপনি উমরাহ না করেই দেশে ফিরে আসতে পারবেন। এতে আপনার উপর কোনো গুনাহ বা কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) নেই। তবে, যদি আপনি ইহরাম বেঁধে থাকেন, তাহলে ইহরামের কারণে কিছু বিধান প্রযোজ্য হবে, যা নিচে আলোচনা করা হলো।

২. পিরিয়ড অবস্থায় কি ইহরাম বাঁধতে হবে? ইহরাম বাঁধলে করণীয় কী?

পিরিয়ড অবস্থায় উমরাহর ইহরাম বাঁধা জায়েজ আছে। তবে, ইহরাম বাঁধার পর তাওয়াফ করা যাবে না। যদি আপনি মিকাত (সীমারেখা) অতিক্রম করার সময় পিরিয়ড অবস্থায় থাকেন, তাহলে আপনি ইহরাম বাঁধতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, ইহরাম বাঁধলে ইহরামের কিছু বিধিনিষেধ (যেমন- সুগন্ধি ব্যবহার, চুল-নখ কাটা, ইত্যাদি) মেনে চলতে হবে। যদি পিরিয়ড শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি তাওয়াফ করতে না পারেন এবং মক্কা ছেড়ে চলে যেতে হয়, তাহলে আপনি ইহরাম অবস্থায়ই থাকবেন এবং তাওয়াফ ও সায়ি সম্পন্ন করার পরই ইহরাম খুলতে পারবেন। যদি কোনো কারণে উমরাহ সম্পন্ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনাকে ইহরাম খোলার জন্য একটি দম (পশু কুরবানি) দিতে হবে অথবা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তিন দিন রোজা রাখতে হবে (যার মধ্যে ৭ম দিনে একটি রোজা এবং ১০ম দিনে তিনটি রোজা)। তবে, আপনি যদি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর তাওয়াফ করতে পারেন, তাহলে উমরাহ সম্পন্ন করা আপনার জন্য উত্তম।

৩. পিরিয়ড অবস্থায় মসজিদুল হারামে প্রবেশ ও অবস্থান করা যাবে কি?

পিরিয়ড অবস্থায় মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফের মসজিদ) প্রবেশ করা এবং সেখানে অবস্থান করা নিষিদ্ধ। এটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবে, প্রয়োজনে মসজিদের ভেতরে না গিয়ে বাইরের অংশে (যেখানে মসজিদের সীমানার বাইরে) অবস্থান করা যেতে পারে। মসজিদে প্রবেশের প্রয়োজন হলে, আপনি পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। মসজিদুল হারামের বাইরে থেকে কাবা শরিফ দেখা এবং দোয়া করা যাবে।

৪. মদিনায় পিরিয়ড অবস্থায় মসজিদে নববীতে প্রবেশ ও অবস্থান করা যাবে কি?

মদিনার মসজিদে নববীতেও পিরিয়ড অবস্থায় প্রবেশ করা এবং অবস্থান করা নিষিদ্ধ। তবে, মসজিদে নববীর বাইরে থেকে (যেখানে মসজিদের সীমানার বাইরে) রওজা শরিফ জিয়ারত করা এবং দোয়া করা যাবে। মসজিদে নববীর ভেতরে প্রবেশের প্রয়োজন হলে, পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

৫. মক্কায় থাকা অবস্থায় পিরিয়ড শেষ না হলে উমরাহ কীভাবে সম্পন্ন করব?

যদি মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে পিরিয়ড শেষ না হয়, তাহলে আপনি উমরাহ না করেই দেশে ফিরে আসতে পারেন। তবে, যদি আপনি ইহরাম বেঁধে থাকেন, তাহলে আপনাকে অবশ্যই তাওয়াফ ও সায়ি সম্পন্ন করে ইহরাম খুলতে হবে। যদি পিরিয়ডের কারণে তা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনি পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর তাওয়াফ ও সায়ি সম্পন্ন করবেন। যদি মক্কা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে পিরিয়ড শেষ না হয়, তাহলে আপনি ইহরাম অবস্থায় থাকবেন এবং পরে যখনই পবিত্র হবেন, তখনই তাওয়াফ ও সায়ি সম্পন্ন করবেন। যদি কোনো কারণে তা সম্ভব না হয়, তাহলে ইহরাম খোলার জন্য দম (পশু কুরবানি) দিতে হবে অথবা রোজা রাখতে হবে।

সংক্ষিপ্ত করণীয়:

  • পিরিয়ড অবস্থায় উমরাহ করা ফরজ নয়, তাই না করলে গুনাহ নেই।
  • পিরিয়ড অবস্থায় ইহরাম বাঁধা জায়েজ, তবে তাওয়াফ করা যাবে না।
  • পিরিয়ড অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ।
  • পিরিয়ড অবস্থায় জিকির, দরুদ, দোয়া, কুরআন তিলাওয়াত (স্পর্শ না করে) করা যাবে।
  • মক্কায় অবস্থানকালে পিরিয়ড শেষ হলে উমরাহ সম্পন্ন করবেন। শেষ না হলে, ইহরাম না বাঁধাই উত্তম; তবে বাঁধলে পরবর্তীতে সম্পন্ন করার নিয়ম অনুসরণ করবেন।

দলিল ও রেফারেন্স:

১. কুরআন: সূরা আল-বাকারা (২:২২২)-এ আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস থেকে দূরে থাকবে এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না।" (এটি হায়েজের পবিত্রতা সংক্রান্ত মূলনীতি)।

২. হাদিস: সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, আয়েশা (রা.) বলেন, "আমরা হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ... যখন আমরা মক্কার নিকটবর্তী হলাম, তখন আমার হায়েজ শুরু হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কি হায়েজ শুরু হয়েছে?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'এটি এমন একটি বিষয় যা আল্লাহ আদম কন্যাদের উপর লিখে দিয়েছেন। তুমি হজের সমস্ত কাজ কর, তবে তাওয়াফ করবে না, যতক্ষণ না পবিত্র হও।'" (সহিহ বুখারি: ৩০৫; সহিহ মুসলিম: ১২১১)।

৩. হানাফি ফিকহের কিতাব:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): হায়েজ অবস্থায় নারীর জন্য মসজিদে প্রবেশ, তাওয়াফ, নামাজ ইত্যাদি নিষিদ্ধ হওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): হায়েজ অবস্থায় ইহরাম বাঁধা এবং উমরাহ না করতে পারলে দম বা রোজার বিধান বর্ণিত আছে।
  • বহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী): হায়েজ ও নিফাস সংক্রান্ত মাসয়ালা এবং মসজিদে প্রবেশের বিধান সহজ ভাষায় বর্ণিত আছে।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): আধুনিক যুগের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া আছে, যেখানে হায়েজ অবস্থায় উমরাহ ও মসজিদে প্রবেশের বিধানও আলোচিত হয়েছে।

আপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ: আপনি যদি মক্কায় পৌঁছানোর পর পিরিয়ড শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে আপনি মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধার আগে একজন আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করতে পারেন। তারা আপনাকে সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার উমরাহ সহজ করে দিন এবং আপনার সব ইবাদত কবুল করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.