সুদ (রিবা) দিয়ে স্বর্ণ বন্ধক রেখে ব্যবসা করা জায়েজ কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ব্যবসার কাজে স্বর্ণ বন্ধক(সুদ দেওয়া লাগবে) দিয়ে টাকা নিয়ে ব্যবসার কাজে লাগানো উচিত হবে?(ওনাকে বুঝিয়েছি কিন্তু কোথাও কর্জে হাসানা না পাওয়ার কারণে এটা করছে, বলেছি স্বর্ণ বিক্রি করার জন্য কিন্তু তিনি রাজিনা)।
১.এই ব্যবসা কি জায়েজ/হালাল হবে?
২.এই ব্যবসার টাকা থেকে কিছু গ্রহণ(হাদিয়া-খাবার)করা হালাল হবে?
৩.ওনাকে আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী কিছু হালাল টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি যাতে ঋণ কম নেওয়া লাগে। আমার কি উনাকে সাহায্য করা উচিত হয়েছে? যদি তিনি আমার নিকট রক্তের সম্পর্কের(মাহরাম)হয়।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামে সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি একটি কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদিসে সুদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আপনার আত্মীয় যদি সুদের শর্তে (স্বর্ণ বন্ধক রেখে) ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন, তাহলে সেই লেনদেন শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না।
১. এই ব্যবসা কি জায়েজ/হালাল হবে?
না, এই ব্যবসা জায়েজ বা হালাল হবে না। কারণ, সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"অথচ আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
সুদ একটি কবিরা গুনাহ। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুদখোর, সুদদাতা, এর লেখক ও সাক্ষী সকলের উপর লানত (অভিশাপ) করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৭)
আপনার আত্মীয় যদি সুদের শর্তে টাকা নেন, তাহলে সেই টাকা দিয়ে ব্যবসা করলেও ব্যবসাটি বরকত থেকে বঞ্চিত হবে এবং গুনাহের কাজ হবে। তিনি যদি কর্জে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ) না পান, তাহলে তার উচিত হবে অন্য কোনো বৈধ উপায় খোঁজা, যেমন: স্বর্ণ বিক্রি করে নিজের মূলধন বাড়ানো, অথবা শরীকানা (পার্টনারশিপ) ব্যবসা করা, অথবা কোনো ইসলামী ব্যাংক থেকে সুদমুক্ত লেনদেন করা। তবে সুদী ঋণ নেওয়া কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়।
২. এই ব্যবসার টাকা থেকে কিছু গ্রহণ (হাদিয়া-খাবার) করা হালাল হবে?
না, এই ব্যবসার টাকা থেকে হাদিয়া বা খাবার গ্রহণ করা হালাল হবে না। কারণ, যে টাকা সুদের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে তা নাপাক (হারাম) অর্থ। হারাম অর্থ থেকে কোনো কিছু খাওয়া বা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে এবং তা থেকে দান করে, তার দান কবুল হয় না; আর যদি তা নিজে খায়, তাও হারাম।" (সহিহ বুখারি)
তবে যদি তিনি সুদী লেনদেন থেকে তওবা করেন এবং ভবিষ্যতে এই কাজ থেকে বিরত থাকেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেবেন। কিন্তু ইতিমধ্যে যে হারাম টাকা তিনি উপার্জন করেছেন, তা থেকে নিজে খাওয়া বা অন্যকে খাওয়ানো জায়েজ নয়। তার উচিত হবে সেই হারাম টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দেওয়া (নিজের কোনো উপকার ছাড়া)।
৩. ওনাকে আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী কিছু হালাল টাকা দিয়ে সাহায্য করেছি যাতে ঋণ কম নেওয়া লাগে। আমার কি উনাকে সাহায্য করা উচিত হয়েছে? যদি তিনি আমার নিকট রক্তের সম্পর্কের (মাহরাম) হন?
আপনি তাকে হালাল টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন, এটি একটি সাওয়াবের কাজ। বিশেষ করে যদি তিনি আপনার মাহরাম (রক্তের সম্পর্কের) হন, তাহলে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সাহায্য করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর আত্মীয়-স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দান কর।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৬)
আপনার এই সাহায্যের মাধ্যমে আপনি তাকে সুদী ঋণ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন, এটি একটি উত্তম কাজ। তবে মনে রাখবেন, আপনি তাকে সাহায্য করেছেন, কিন্তু তিনি যদি তবুও সুদী ঋণ নেন, তাহলে তার গুনাহের জন্য আপনি দায়ী হবেন না। আপনি তাকে বুঝিয়েছেন এবং সাহায্য করেছেন, এরপরও যদি সে সুদের পথ বেছে নেয়, তাহলে তার নিজের ইচ্ছার কারণে তা হবে।
আপনার করণীয়:
- আপনি তাকে আরও বুঝানোর চেষ্টা করুন যে সুদ হারাম এবং এর পরিণাম ভয়াবহ।
- তাকে উৎসাহিত করুন যেন তিনি স্বর্ণ বিক্রি করে নিজের মূলধন বাড়ান, অথবা শরীকানা ব্যবসা করেন।
- যদি তিনি সুদী ঋণ নেওয়ার পরও তওবা করেন এবং ভবিষ্যতে এই কাজ থেকে বিরত থাকেন, তাহলে আল্লাহর রহমতের আশা করা যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হারাম থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯
- সহিহ মুসলিম: ১৫৯৭ (সুদখোরের উপর লানত)
- সহিহ বুখারি: ২০৫৯ (হারাম উপার্জন থেকে দান কবুল হয় না)
- রদ্দুল মুহতার: ৪/১৮৫ (সুদের হারাম হওয়া প্রসঙ্গে)
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩০৫ (সুদী লেনদেনের অপরাধ প্রসঙ্গে)