স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে টাকা ধার নেওয়া কি জায়েজ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১.কেউ যদি স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে টাকা ধার দেয় ওই টাকা নেওয়া জায়েজ হবে?(আমি টাকা ধার নিব কিন্তু আমি সুদ দেবনা। যিনি দিতে চাচ্ছেন বুঝ না থাকার কারনে নিজ ইচ্ছাতেই দিতে চাচ্ছে।পরবর্তীতে হালাল টাকা থেকে টাকা ফেরত দিব(সুদ ছাড়া)।
২. ব্যবসার কাজে স্বর্ণ বন্ধক(সুদ দেওয়া লাগবে) দিয়ে টাকা নিয়ে ব্যবসার কাজে লাগানো উচিত হবে?(ওনাকে বুঝিয়েছি কিন্তু কোথাও কর্জে হাসানা না পাওয়ার কারণে এটা করছে, বলেছি স্বর্ণ বিক্রি করার জন্য কিন্তু তিনি রাজিনা)
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। নিম্নে প্রতিটি অংশের বিস্তারিত শর‘ঈ সমাধান প্রদান করা হলো:
১. স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া (সুদ ছাড়া)
আপনি যদি নিশ্চিত থাকেন যে, আপনি সুদ দেবেন না এবং শুধুমাত্র মূল টাকাই ফেরত দেবেন, তাহলে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া জায়েজ। তবে শর্ত হলো, চুক্তিতে কোনো প্রকার সুদ বা অতিরিক্ত অর্থের শর্ত থাকবে না।
কুরআন ও হাদিসে সুদ স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ বাণিজ্যকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
তবে বন্ধক (রাহন) রাখা জায়েজ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই ইহুদিদের নিকট বর্ম বন্ধক রেখে খাদ্য গ্রহণ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ২৫০০)
মূলনীতি: বন্ধক রাখা সম্পদ আমানত হিসেবে গণ্য হবে। বন্ধকদাতা (ঋণগ্রহীতা) যদি বন্ধককৃত স্বর্ণ ব্যবহার করতে চান, তবে তা জায়েজ নয়, কারণ এটি এখন ঋণদাতার কাছে আমানত। তবে ঋণদাতা বন্ধককৃত স্বর্ণ নিজে ব্যবহার করতে পারবেন না, কারণ তা ঋণগ্রহীতার সম্পদ।
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি সুদ দেবেন না এবং শুধু মূল টাকা ফেরত দেবেন, তাই এটি কর্জে হাসানা (সুন্দর ঋণ) হিসেবে গণ্য হবে, যা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ঋণদাতা যদি নিজ ইচ্ছায় সুদ ছাড়া টাকা দিতে চান, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ এবং বৈধ।
২. ব্যবসার কাজে সুদ দিয়ে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নেওয়া
এটি সম্পূর্ণ হারাম ও জায়েজ নয়। কারণ এখানে সুদ দেওয়ার শর্ত রয়েছে, যা স্পষ্টভাবে হারাম। এমনকি ব্যবসার কাজে লাগানোর জন্যও সুদ গ্রহণ বা প্রদান করা জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"সুদ গ্রহণকারী, সুদ প্রদানকারী, এর লেখক এবং এর সাক্ষী — সকলের উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
আপনার করণীয়: আপনি যদি ব্যবসার জন্য টাকার প্রয়োজন অনুভব করেন, তাহলে নিম্নোক্ত বৈধ পন্থাগুলো অবলম্বন করতে পারেন:
১. কর্জে হাসানা: পরিচিতজন বা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে সুদ ছাড়া ঋণ নেওয়া।
২. মুশারাকা (অংশীদারি): কাউকে ব্যবসায় অংশীদার করা, যেখানে লাভ-লোকসান উভয়ই ভাগ হবে।
৩. মুরাবাহা: ইসলামি ব্যাংক থেকে বৈধ পদ্ধতিতে পণ্য ক্রয়ের জন্য অর্থায়ন নেওয়া।
৪. স্বর্ণ বিক্রি: আপনি যদি স্বর্ণ বিক্রি করে টাকা সংগ্রহ করতে পারেন, তবে তা উত্তম। তবে ঋণদাতাকে বলেছেন যে, স্বর্ণ বিক্রি করবেন — কিন্তু তিনি রাজি নন। সেক্ষেত্রে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, সুদ হারাম এবং এর মাধ্যমে ব্যবসায় বরকত আসবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"সুদের অর্থ যদিও (দুনিয়ায়) বৃদ্ধি পায়, কিন্তু (আখিরাতে) তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।" (মুসনাদ আহমাদ: ৩৭০০)
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
| বিষয় | হুকুম | |-------|-------| | সুদ ছাড়া স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া | জায়েজ | | সুদ দিয়ে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে ব্যবসা করা | হারাম ও জায়েজ নয় |
রেফারেন্স:
১. আল-কুরআন: সূরা আল-বাকারা: ২৭৫-২৭৯
২. সহিহ বুখারি: ২৫০০ (বন্ধক সংক্রান্ত)
৩. সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮ (সুদ সংক্রান্ত)
৪. রদ্দুল মুহতার: ৫/১৭৫ (বন্ধক ও সুদের বিধান)
৫. ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৪/৩৩০ (বন্ধক সংক্রান্ত)
৬. ফাতাওয়া উসমানি: ২/৪৫৫ (সুদ ও বন্ধক)
৭. বাহিশতি জেওর: ২/৩২ (সুদের ভয়াবহতা)
উপসংহার: আপনি যদি সুদ ছাড়া টাকা নেন এবং শুধু মূল টাকা ফেরত দেন, তাহলে তা জায়েজ। কিন্তু সুদ দিয়ে টাকা নিয়ে ব্যবসা করা সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুদ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب