কোনো ব্যক্তির দৈনিক খাদ্যাভাস ভালো, পেট পরিষ্কার হয় তবুও দিনে বারবার পায়খানার রাস্তায় বায়ু বের হয়, এটা কি ওয়াসওয়াসা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এটা থেকে পরিত্রাণের উপায় বা আমল কি হতে পারে???
Answer
প্রশ্ন: পায়খানার রাস্তা দিয়ে বারবার বায়ু নির্গত হওয়া এবং নামাযে অস্বস্তি
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নের উত্তর নিম্নরূপ:
১. এটি কি ওয়াসওয়াসা?
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, দৈনিক খাদ্যাভাস ভালো এবং পেট পরিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও দিনে বারবার পায়খানার রাস্তা দিয়ে বায়ু নির্গত হওয়া এবং নামাযে অস্বস্তি আসা—এটি শারীরিক সমস্যা হতে পারে, যা ওয়াসওয়াসা (মনের সন্দেহ বা কুমন্ত্রণা) নয়।
তবে যদি চিকিৎসকের নিকট গিয়ে দেখা যায় যে শারীরিক কোনো সমস্যা নেই, অথবা বারবার অযু করার পরও মনে হয় বায়ু বের হয়েছে (যদিও বাস্তবে বের হয়নি), তাহলে সেটি ওয়াসওয়াসা হিসেবে গণ্য হবে।
২. ফিকহী বিধান
ক. প্রকৃতপক্ষে বায়ু বের হলে: যদি প্রকৃতপক্ষে বায়ু বের হয় (শব্দসহ বা গন্ধসহ), তাহলে অযু ভঙ্গ হবে। নামাযের মধ্যে বায়ু বের হলে নামায ভঙ্গ হয়ে যাবে।
খ. সন্দেহ হলে: যদি কেবল সন্দেহ হয় যে বায়ু বের হয়েছে কিনা, কিন্তু নিশ্চিত না হন, তাহলে মূলনীতি হলো—যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছেন যে বায়ু বের হয়েছে, ততক্ষণ অযু ভঙ্গ হবে না। এটি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি:
"اليقين لا يزول بالشك" "নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূরীভূত হয় না।"
(আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম, পৃষ্ঠা ৬০)
গ. বারবার বায়ু নির্গত হলে (মা'যূর): যদি কোনো ব্যক্তির এমন অবস্থা হয় যে, পুরো নামাযের সময় জুড়ে বা অধিকাংশ সময় বায়ু নির্গত হতে থাকে এবং এক অযু দিয়ে পুরো নামায পড়া সম্ভব না হয়, তাহলে তিনি মা'যূর (ওযরগ্রস্ত) হিসেবে গণ্য হবেন। মা'যূরের বিধান হলো:
- প্রত্যেক নামাযের সময় শুরু হওয়ার পর একবার অযু করবেন।
- সেই অযু দিয়ে ঐ নামাযের ফরয, সুন্নাত, নফল সব পড়তে পারবেন।
- নামাযের মধ্যে বায়ু বের হলেও নামায ভঙ্গ হবে না (যদি ওযরের কারণে হয়)।
(রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪২)
তবে আপনার ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে না যে আপনি সম্পূর্ণ মা'যূর। কারণ আপনি বলেছেন "দিনে বারবার" বায়ু বের হয়, কিন্তু নামাযের সময় নির্দিষ্টভাবে কতটুকু বের হয় তা উল্লেখ করেননি।
৩. পরিত্রাণের উপায় ও আমল
ক. চিকিৎসা গ্রহণ: প্রথমে একজন ভালো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। এটি শারীরিক সমস্যা হতে পারে যেমন:
- ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS)
- হজমজনিত সমস্যা
- অন্ত্রে গ্যাস জমা হওয়া
খ. খাদ্যাভাসে পরিবর্তন:
- অতিরিক্ত গ্যাস সৃষ্টিকারী খাবার (ডাল, বাঁধাকপি, কার্বনেটেড পানীয়) পরিমিত খাওয়া
- খাবার ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাওয়া
- খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটা
গ. নামাযের সময় করণীয়:
- নামায শুরুর আগে টয়লেটে গিয়ে চেষ্টা করুন
- অযু করার পর যদি মনে হয় বায়ু বের হয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত না হন, তাহলে সেটি উপেক্ষা করুন
- শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন
ঘ. আমল:
- দরূদ শরীফ বেশি বেশি পড়ুন
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রাসূলু) প্রতি রাতে পড়ুন
- আয়াতুল কুরসী প্রতিদিন পড়ুন
- সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দেহে ফুঁ দিন
- বেশি বেশি ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়ুন
ঙ. ওয়াসওয়াসা দূর করার দোয়া: রাসূলুল্লাহ (সা.) শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার দোয়া শিখিয়েছেন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" (অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
৪. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. নামাযে দাঁড়ানোর সময় এই বিষয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করা। ২. যদি নামাযের মধ্যে সন্দেহ হয়, কিন্তু নিশ্চিত না হন, তাহলে নামায চালিয়ে যান। ৩. নামাযের পর যদি নিশ্চিত হন যে বায়ু বের হয়েছে, তাহলে ঐ নামায পুনরায় পড়তে হবে না (যদি সন্দেহের ভিত্তিতে হয়)। ৪. শয়তান মানুষকে নামাযে অস্থির করার জন্য এমন ওয়াসওয়াসা দেয়। তাই দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছেন, ততক্ষণ অযু ভঙ্গ হয়নি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ওয়াসওয়াসা থেকে হিফাযত করুন এবং নামাযে খুশু-খুযু দান করুন। আমীন।