ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর স্বামীর সেবা, সন্তান লালন-পালন ও শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমতের পরকালীন পুরস্কার সম্পর্কে।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আলহামদুলিল্লাহ। আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। একজন নারীর জন্য তার স্বামীর ঘরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করা এবং পরিবারের সেবা করা অত্যন্ত সম্মানজনক ও মহান কাজ। ইসলামে এর জন্য পরকালে বিশাল পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে উত্তরের সারসংক্ষেপ:
একজন স্ত্রী তার স্বামীর সেবা করা, সন্তানদের লালন-পালন করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা শুধু দায়িত্বই নয়, বরং এটি একটি ইবাদত। যদি সে এই কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে, তবে এর জন্য সে অশেষ সওয়াব পাবে।
দলিলসমূহ:
১. কুরআন থেকে দলিল:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নারীদের মর্যাদা ও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলেছেন। সূরা আন-নিসা (৪:৩৪) তে আল্লাহ বলেন: "পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, কারণ আল্লাহ তাদের একের উপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং কারণ তারা নিজেদের মাল থেকে খরচ করে। সুতরাং সৎকর্মপরায়ণা নারীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা হিফাজত করেছেন তার হিফাজতকারিণী।"
এই আয়াতে "কুনুত" (অনুগতা) শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, স্ত্রী তার স্বামীর অনুগত থাকা এবং তার অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা একটি প্রশংসনীয় গুণ। এই কাজটি আল্লাহর আদেশ পালনের অন্তর্ভুক্ত, তাই এর জন্য সওয়াব রয়েছে।
২. হাদিস থেকে দলিল:
(ক) স্ত্রীর ইবাদত ও সওয়াব প্রসঙ্গে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "যখন স্ত্রী তার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজানের রোজা রাখে, নিজের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তখন তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ কর।" (সুনানে ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৪১৬৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং: ১৬৬৪১)
(খ) সন্তান লালন-পালনের মর্যাদা: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দুইটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করবে যতক্ষণ না তারা বালিগ হয়, কিয়ামতের দিন আমি এবং সে এরকম হবে (এই বলে তিনি তার দুই আঙ্গুল মিলিয়ে দেখালেন)।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৩১)
যদিও এই হাদিসটি পিতা-মাতা উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য, তবে মায়ের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করা এবং তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি শিক্ষায় বড় করা একটি বিশাল সওয়াবের কাজ।
(গ) স্বামীর সেবা ও ঘরকন্নার কাজের ফজিলত: হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি যুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ঘরে কাজ করতাম। তিনি আমার জন্য যে ঘোড়াটি রেখেছিলেন, আমি তার ঘাস কাটতাম এবং তাকে খাওয়াতাম।... তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: 'তুমি যা কিছু খরচ করো, তা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তার জন্য তোমাকে পুরস্কার দেওয়া হবে, এমনকি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্বামীর মুখে তুলে দাও সেটির জন্যও।'" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৩১৫৩)
৩. হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে দলিল:
(ক) রদ্দুল মুহতার (শামি): ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর জন্য স্বামীর সেবা করা এবং ঘরের কাজ করা মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) এবং এর জন্য সে সওয়াব পাবে। যদিও ফিকহের দৃষ্টিতে স্ত্রীর উপর রান্নাবান্না করা ফরজ নয়, তবে তা করা যদি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে, তবে এটি একটি নফল ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং এর বিনিময়ে সে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে।
(খ) ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): এই গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, স্ত্রী যদি স্বামীর সেবা করে এবং তার ঘরের কাজ করে, তবে এটি তার জন্য সদকা (দান) এর সমতুল্য। অর্থাৎ, এটি তার জন্য একটি নেকির কাজ।
(গ) বেহেশতী জেওর: মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তার এই বিখ্যাত বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রী তার স্বামীর সেবা করবে এবং ঘরের কাজ করবে। এই কাজগুলো যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তবে প্রতিটি কাজের জন্য সে সওয়াব পাবে। এমনকি তিনি বলেছেন, "স্ত্রী যদি স্বামীর সেবা করে এবং এতে ক্লান্ত হয়, তবে এই ক্লান্তিও তার জন্য সওয়াবের কারণ হবে।"
৪. ফাতাওয়া উসমানি ও অন্যান্য ফতোয়া:
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)在其 ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন যে, একজন নারী তার স্বামীর সেবা করা, সন্তানদের লালন-পালন করা এবং শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করে, তবে এটি তার জন্য একটি ইবাদত। তিনি বলেন, "একজন নারী তার ঘরে যে কাজগুলো করে, তা যদি সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে, তবে প্রতিটি কাজের জন্য তাকে সওয়াব দেওয়া হবে। এমনকি তার সন্তানদের জন্য যে দুধ পান করায়, তার প্রতিটি ফোঁটার জন্য তাকে সওয়াব দেওয়া হবে।"
মোটকথা:
একজন নারী যে পরের ঘরে (স্বামীর ঘরে) গিয়ে স্বামীর সেবা করে, শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করে এবং সন্তানদের লালন-পালন করে, সে যদি এই কাজগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করে এবং ধৈর্যের সাথে করে, তবে তার জন্য পরকালে অশেষ পুরস্কার রয়েছে। এই কাজগুলোকে সে যদি ইবাদতের নিয়তে করে, তবে তার প্রতিটি কাজ, এমনকি তার ক্লান্তি ও পরিশ্রমও তার জন্য সওয়াবের কারণ হবে। ইসলামে নারীর এই আত্মত্যাগ ও দায়িত্ব পালনকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয় এবং এর জন্য জান্নাতে তার জন্য বিশেষ মর্যাদা সংরক্ষিত আছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং সকল নারীকে এই মহান দায়িত্ব পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।