নবজাতক শিশুর পায়খানা-প্রস্রাবের কারণে কাপড় নাপাক হলে সালাত আদায়ের সমাধান এবং নিফাস শেষে সহবাসের বিধান।

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 4999
Questioner: Sayeda Yasmin
Question Asked: 05 Sep 2026, 11:52 AM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 12:00 PM
Views: 9
Tokens: 5,838
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার বেবি হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। আমার বেবি যতদিন বাইরের খাবার খাবে না শুধু মাতৃদুগ্ধ পান করবে, তাকে কুলে নিলে দুধ খাওয়াইলে আমার কাপড়ে পায়খানা পস্রাব করবে স্বাভাবিক। এটাতো দিনের বেশিরভাগ সময়ই চলতে থাকে। প্রায়সময়ই এগুলো কাপড়ে লেগে থাকবে।এক্ষেত্রে আমি পবিত্রতা কীভাবে অর্জন করবো? কীভাবে সালাত আদায় করবো?
২) নিফাস ভালো হলেই কী সহবাস করা যাবে? নাকি চল্লিশ দিন ওয়েট করা উত্তম । নরমাল ডেলিভারি, সাইড সিজার।স্বামী যদি মানতে না চান তখন করণীয়?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্ন দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য হানাফি কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


১) শিশুর পায়খানা-প্রস্রাবের কারণে কাপড় নাপাক হলে পবিত্রতা ও সালাতের বিধান

শিশুর পায়খানা প্রসাব নাপাক এর বিধান বড়দের পেশাব পায়খানার মতোই। এক্ষেত্রে শিশু আপনার কাপড়ে পেশাব পায়খানা করে দিলে আপনাকে তা হতে পবিত্র হয়েই নামাজ আদায় করতে হবে।

এক্ষেত্রে সহজ একটি পদ্ধতি হল আপনি নামাজের জন্য একসেট পবিত্র কাপড় আলাদা রাখবেন।

প্রতি ওয়াক্তের নামাজের আগে যদি শরীরের নাপাকি লেগে থাকে সেক্ষেত্রে শরীরের অংশ ধুয়ে পাক করে আপনি নামাজের পোশাকের সেটটি পড়বেন। নামাজ পড়ে আবার কাপড় চেঞ্জ করে আগের কাপড় পড়তে পারেন।

২) নিফাস শেষে সহবাসের বিধান ও চল্লিশ দিন অপেক্ষার মাসআলা

মূলনীতি: নিফাস (সন্তান প্রসবের পর যে রক্তপাত হয়) চলাকালীন সময়ে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা হারাম (নিষিদ্ধ) । পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তারা তোমাকে ঋতুবর্তী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা কষ্টদায়ক। সুতরাং তোমরা ঋতুবস্থায় স্ত্রী-সংগম থেকে বিরত থাক এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২) এই আয়াতে ঋতুবতী (হায়েজ) নারীর কথা বলা হলেও নিফাসও হায়েজের অনুরূপ বিধানযুক্ত। তাই নিফাসের রক্তপাত চলাকালীন সহবাস হারাম।

ক. নিফাসের সর্বোচ্চ ও স্বাভাবিক সময়সীমা (হানাফি মাযহাব):

  • হানাফি মাযহাব মতে, নিফাসের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৪০ দিন
  • স্বাভাবিক সময়সীমা হলো ৪০ দিন। অর্থাৎ, সাধারণত ৪০ দিনের মধ্যে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়।
  • যদি ৪০ দিনের কম সময়ে (যেমন: ২০, ২৫ বা ৩০ দিনে) রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই মুহূর্ত থেকেই নারী পবিত্র হয়ে যাবে এবং তার উপর গোসল ফরজ হবে। এরপর সে সালাত আদায় করবে, রোজা রাখবে এবং স্বামীর সাথে সহবাস করা জায়েয হবে।
  • যদি ৪০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু আবার ৪০ দিনের মধ্যে রক্ত শুরু হয়, তাহলে সে আবার নিফাস অবস্থায় ফিরে যাবে।
  • যদি ৪০ দিনের বেশি রক্তপাত চলতে থাকে, তাহলে ৪০ দিনই নিফাস হিসেবে গণ্য হবে এবং এর পরের রক্তপাত ইস্তিহাযা (রোগজনিত রক্ত) হিসেবে গণ্য হবে। ইস্তিহাযার রক্ত নাপাক, তবে তা সালাত, রোজা বা সহবাসে বাধা সৃষ্টি করে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৮; রদ্দুল মুহতার, ১/২৯৭)

খ. নরমাল ডেলিভারি ও সিজারিয়ান (সাইড সিজার) এর ক্ষেত্রে:

  • নরমাল ডেলিভারি: নরমাল ডেলিভারির পর যে রক্তপাত হয় তা নিফাস। রক্তপাত বন্ধ হলেই (৪০ দিনের মধ্যে) নারী পবিত্র হবে এবং সহবাস জায়েয হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়া জরুরি।
  • সিজারিয়ান (সাইড সিজার): সিজারিয়ান অপারেশনের পর যে রক্তপাত হয় তাও নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। রক্তপাত বন্ধ হলে পবিত্রতা অর্জিত হবে। তবে অপারেশনের কারণে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সহবাস থেকে বিরত থাকা চিকিৎসাগত দিক থেকেও জরুরি। কারণ, অপারেশনের ক্ষত স্থান সেরে উঠতে সময় লাগে। তাই রক্তপাত বন্ধ হলেও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অন্তত ৬ সপ্তাহ (৪২ দিন) বা যতদিন ডাক্তার নিষেধ করবেন, ততদিন সহবাস না করাই নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ।

গ. চল্লিশ দিন অপেক্ষা করা কি উত্তম?

  • শরীয়তের দৃষ্টিতে: রক্তপাত বন্ধ হয়ে গেলে (৪০ দিনের মধ্যে) সহবাস করা জায়েয (বৈধ)।
  • চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিতে: সাধারণত চিকিৎসকরা প্রসবের পর ৪০ দিন (৬ সপ্তাহ) পর্যন্ত সহবাস থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। কারণ, এ সময় জরায়ু ও যোনিপথ সম্পূর্ণরূপে সেরে ওঠে। বিশেষ করে সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা মানা অত্যন্ত জরুরি। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হলেও চল্লিশ দিন অপেক্ষা করা উত্তম ও নিরাপদ। এটি স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো এবং শরীয়তের দৃষ্টিতেও প্রশংসনীয়।

ঘ. স্বামী যদি মানতে না চান, তখন করণীয়: ১. নরমাল ডেলিভারি: যদি নরমাল ডেলিভারি হয় এবং রক্তপাত ৪০ দিনের আগেই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে সহবাস জায়েয। তবে আপনি যদি শারীরিকভাবে দুর্বল বোধ করেন বা ডাক্তার নিষেধ করেন, তাহলে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। স্বামীকে বলুন, "শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হলেও চিকিৎসার দৃষ্টিতে এখনও ঝুঁকি আছে, তাই আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা উচিত।" ২. সিজারিয়ান ডেলিভারি: সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে সহবাসের জন্য অপেক্ষা করা চিকিৎসাগতভাবে বাধ্যতামূলক। অপারেশনের ক্ষত স্থান সম্পূর্ণ সেরে না ওঠা পর্যন্ত সহবাস করলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রে আপনি স্বামীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন যে, এটি এখন স্বাস্থ্যগত কারণে সম্ভব নয়। প্রয়োজনে স্বামীকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা শুনলে তিনি বুঝতে পারবেন। ৩. স্বামীকে দ্বীনি দৃষ্টিতে বোঝানো: স্বামীকে বোঝান যে, নিফাস অবস্থায় সহবাস করা হারাম। আর নিফাস শেষ হলেও স্ত্রীর শারীরিক সুস্থতা ইসলামেও গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই স্ত্রীর শারীরিক অসুস্থতা ও কষ্টের সময় ধৈর্য ধরা এবং তার যত্ন নেওয়া স্বামীর কর্তব্য। ৪. যদি স্বামী একান্তই না মানেন: যদি স্বামী চিকিৎসার কথা না শুনে জোরাজুরি করেন, তাহলে আপনি তাকে বলতে পারেন, "আমি এখন শারীরিকভাবে প্রস্তুত নই, এতে আমার মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।" যদি তিনি জোর করেন, তাহলে এতে আপনার ওপর কোনো গুনাহ নেই, কারণ আপনি অপারগ। তবে উত্তম হলো, বিষয়টি পরিবারের বড়দের (যাদের কথা স্বামী শোনে) মাধ্যমে সমাধান করা। প্রয়োজনে একজন বিজ্ঞ আলেমের কাছে গিয়ে স্বামীকে নিয়ে মাসআলা শোনানো যেতে পারে।

সারসংক্ষেপ: নিফাসের রক্তপাত বন্ধ হলেই শরীয়তের দৃষ্টিতে সহবাস জায়েয। তবে শারীরিক ও চিকিৎসাগত নিরাপত্তার জন্য ৪০ দিন অপেক্ষা করা উত্তম। সিজারিয়ান অপারেশনের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অপেক্ষা করা জরুরি। স্বামী না মানলে তাকে ডাক্তারের পরামর্শ ও দ্বীনি দৃষ্টিতে বোঝানোর চেষ্টা করুন।


আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম সন্তান দান করুন এবং ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। আপনার সন্তান যেন আপনার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের কারণ হয়। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.