হায়েজ অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা যাবে নাকি ভেঙে পড়তে হবে
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
হায়েজ অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা যাবে কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হায়েজ (মাসিক) অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা জায়েয আছে। রুকিয়ার জন্য কুরআনের আয়াত পাঠ করা, তা নিজের উপর পড়া বা অন্যকে পড়ে শোনানো—এসব ক্ষেত্রে পবিত্রতা (তাহারাত) শর্ত নয়। তবে শর্ত হলো, কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা যাবে না এবং উচ্চস্বরে তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে কিছু বিস্তারিত রয়েছে।
বিস্তারিত উত্তর
১. রুকিয়া কী?
রুকিয়া হলো কুরআনের আয়াত ও সহীহ দু'আ দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা বা নিরাময়ের চেষ্টা করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় রুকিয়া করতেন এবং সাহাবীদেরকেও এর নির্দেশ দিয়েছেন।
২. হায়েজ অবস্থায় রুকিয়া করার বিধান
হায়েজ অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা জায়েয। কারণ:
ক. কুরআন তিলাওয়াতের বিধান: হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা সম্পর্কে ফকীহগণের মতভেদ রয়েছে। হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহে তাহরীমি। তবে যিকর, দু'আ এবং দরূদ পড়া জায়েয।
খ. রুকিয়ার বিশেষত্ব: রুকিয়া মূলত দু'আ ও যিকরের মাধ্যমে নিরাময়ের একটি পদ্ধতি। কুরআনের আয়াতগুলো যখন দু'আ ও যিকর হিসেবে পড়া হয়, তখন তা তিলাওয়াতের সাধারণ বিধানের আওতায় পড়ে না। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, হায়েজ অবস্থায় কুরআনের আয়াত দ্বারা দু'আ করা জায়েয, যদি তা তিলাওয়াতের নিয়তে না হয় বরং দু'আ ও যিকরের নিয়তে হয়।
গ. হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীগণ হায়েজ অবস্থায় যিকর ও দু'আ করতেন। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ ﷺ ই'তিকাফ করতেন এবং তার মাথা আমার দিকে রাখতেন, আর আমি হায়েজ অবস্থায় তার মাথা ধুয়ে দিতাম।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২০২৯)
৩. হানাফী ফিকহের বিস্তারিত
আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
- হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ (হারাম/মাকরূহে তাহরীমি)।
- তবে যিকর, তাসবীহ, তাহলীল, দু'আ এবং দরূদ পড়া জায়েয।
- কুরআনের আয়াত যদি দু'আর নিয়তে পড়া হয়, যেমন "রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ..." — তাহলে তা জায়েয।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতারে লিখেছেন:
"হায়েজ অবস্থায় কুরআনের আয়াত দ্বারা দু'আ করা জায়েয, যদি তা তিলাওয়াতের নিয়তে না হয়। কেননা দু'আ এবং যিকর হায়েজ অবস্থায় জায়েয।"
৪. রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিসের নিয়ম
রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে:
১. নিয়ত: রুকিয়ার আয়াত পড়ার সময় নিয়ত হবে দু'আ ও নিরাময়ের, তিলাওয়াতের নিয়ত নয়। ২. কুরআন স্পর্শ: হায়েজ অবস্থায় কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা যাবে না। তাই মোবাইল বা অন্য মাধ্যমে দেখে পড়া যাবে, তবে সরাসরি কুরআনের পাতা স্পর্শ করা যাবে না। ৩. উচ্চারণ: রুকিয়ার আয়াতগুলো দু'আ ও যিকরের মতো করে পড়া যাবে। ৪. অন্যকে রুকিয়া করা: হায়েজ অবস্থায় অন্যকে রুকিয়া করা বা ঝাড়ফুঁক করা জায়েয।
৫. রুকিয়ায় প্রসিদ্ধ আয়াতসমূহ
রুকিয়ায় সাধারণত নিম্নোক্ত আয়াত ও সূরাগুলো পড়া হয়:
- সূরা ফাতিহা
- আয়াতুল কুরসী (সূরা বাকারা, ২:২৫৫)
- সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস
- সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত
- সূরা ইউনুসের ৮১-৮২ আয়াত
- সূরা আরাফের ১১৭-১২২ আয়াত
৬. সতর্কতা
১. হায়েজ অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা জায়েয হলেও, সাধারণ কুরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকতে হবে। ২. কুরআন মাজীদ স্পর্শ করা যাবে না। ৩. মসজিদে প্রবেশ করা যাবে না। ৪. রুকিয়ার আয়াতগুলো যদি মুখস্থ থাকে, তাহলে তা পড়া যাবে; আর যদি দেখে পড়তে হয়, তাহলে মোবাইল বা ট্যাব থেকে পড়া যাবে, তবে সরাসরি কুরআনের পাতা স্পর্শ করা যাবে না।
ফতোয়া
দারুল উলূম দেওবন্দ এবং দারুল ইফতা, জামিয়া উসমানীয়া-এর ফতোয়াসমূহে উল্লেখ আছে:
"হায়েজ অবস্থায় রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁকের জন্য কুরআনের আয়াত পাঠ করা জায়েয। কেননা রুকিয়া মূলত দু'আ ও যিকর। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, তা যেন তিলাওয়াতের নিয়তে না হয়, বরং দু'আ ও নিরাময়ের নিয়তে হয়।"
উপসংহার
হায়েজ অবস্থায় রুকিয়ার আয়াত প্র্যাকটিস করা জায়েয এবং বৈধ। এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে নিয়ত দু'আ ও নিরাময়ের হতে হবে, তিলাওয়াতের নিয়তে নয়। কুরআন স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।