সাধারণ গোসলের সময় ওযুর নিয়ত না করলে কি ওযু হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
সাধারণ গোসলের সময় (ফরজ গোসল নয়), যদি ওযুর নিয়ত না করে গোসল করি, তাহলে কি এই গোসলে অজু হবে? নাকি আবার নতুন করে অজু করতে হবে?
পুরো গোসলের কোনো অংশেই আমার নিয়ত করা হয় নি।
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো— সাধারণ গোসলের (যেমন: ঠান্ডা হওয়ার জন্য বা পরিচ্ছন্নতার জন্য) সময় যদি ওযুর নিয়ত না করা হয়, তাহলে কি সেই গোসল দ্বারা ওযু আদায় হয়ে যাবে, নাকি আলাদাভাবে ওযু করতে হবে?
হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, যদি কেউ গোসলের সময় পুরো শরীরে পানি প্রবাহিত করে এবং গোসলের মধ্যে মুখ ও নাকের ভেতরেও পানি পৌঁছে দেয় (কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়া), তাহলে তার ওযু আদায় হয়ে যাবে— এমনকি যদি সে ওযুর নিয়তও না করে থাকে।
তবে শর্ত হলো, গোসলের সময় তাকে অবশ্যই মুখে কুলি করা (মাদমাদা) এবং নাকে পানি দেওয়া (ইস্তিনশাক) করতে হবে। যদি সে এই দুটি কাজ না করে শুধু শরীরে পানি ঢেলে গোসল সেরে ফেলে, তাহলে তার ওযু হবে না এবং নামাজের জন্য আলাদাভাবে ওযু করতে হবে।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
১. হানাফি ফিকহের মূলনীতি: হানাফি মাযহাবে গোসলের মাধ্যমে ওযু আদায় হওয়ার জন্য গোসলের মধ্যে অযুর ফরজ (মুখ ধোয়া, হাত ধোয়া, মাথা মাসেহ, পা ধোয়া) আদায় হয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। নিয়ত শুধু ইবাদতের বৈশিষ্ট্য (সওয়াব) লাভের জন্য শর্ত; পবিত্রতা অর্জনের জন্য নিয়ত শর্ত নয়।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, গোসলের মাধ্যমে ওযু আদায় হয়ে যায় যদি গোসলের মধ্যে অযুর সমস্ত ফরজ কাজ (মুখ, নাক, গোটা শরীর ধোয়া) সম্পন্ন হয়। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, গোসলের সময় ওযুর নিয়ত করা শর্ত। কিন্তু ফতোয়া ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফের মতের উপরই রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩০৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৯)
২. হাদিসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "পবিত্রতা হলো নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১) — কিন্তু এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, নিয়ত ছাড়া পবিত্রতা হয়ই না; বরং এর অর্থ হলো, নিয়তের কারণে ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। পানি দ্বারা শরীর ধোয়ার মাধ্যমে নাপাকি দূর হওয়াটা বাস্তবিক ঘটনা, যা নিয়তের উপর নির্ভরশীল নয়।
৩. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া:
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর ফাতাওয়ায় এসেছে— "যদি কেউ গোসল করে এবং গোসলের মধ্যে কুলি ও নাকে পানি দেওয়া সহকারে সমস্ত শরীর ধুয়ে ফেলে, তাহলে তার ওযু হয়ে যাবে, যদিও সে ওযুর নিয়ত না করে থাকে। কেননা, গোসলের মধ্যে ওযুর ফরজসমূহ আদায় হয়ে যায়। তবে যদি সে কুলি বা নাকে পানি না দেয়, তাহলে ওযু হবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৫০)
- আখিরুল মুফাসসিরিন হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর 'ইমদাদুল ফাতাওয়া' (১/১৪৮)-এ অনুরূপ মত দিয়েছেন।
৪. বিশেষ নোট: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, পুরো গোসলের কোনো অংশেই নিয়ত করেননি। এটি কোনো সমস্যা নয়। কারণ, উপরে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী, আপনি যদি গোসলের সময় কুলি (মুখে পানি নেওয়া) এবং নাকে পানি দেওয়া সম্পন্ন করে থাকেন এবং পুরো শরীরে পানি পৌঁছে থাকেন, তাহলে আপনার ওযু আদায় হয়ে গেছে। আপনাকে পুনরায় নতুন করে ওযু করতে হবে না। আপনার এই গোসলই ওযুর পরিবর্তে যথেষ্ট হবে এবং আপনি এই অবস্থায় নামাজ পড়তে পারবেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- যদি গোসলের সময় কুলি ও নাকে পানি দেওয়া হয়ে থাকে: তাহলে ওযু আদায় হয়ে গেছে, নতুন করে ওযুর প্রয়োজন নেই।
- যদি কুলি ও নাকে পানি না দেওয়া হয়ে থাকে: তাহলে ওযু আদায় হয়নি, নামাজের জন্য আলাদাভাবে ওযু করতে হবে।
উত্তর প্রদানে সহায়ক গ্রন্থসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৩০৫
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৯
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/১৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১৪৮
- বাহিশ্তি জেওয়ার (আশরাফ আলী থানভী), পৃষ্ঠা ৩৮-৩৯