হাতে নাপাকির গন্ধ থাকলে কি কাপড় নাপাক হবে?
Taharah Purity · Hanafi
Question
১. হাতে নাপাকির চিহ্ন বা রং না থাকলেও গন্ধ ছিল, সেই হাত যদি শুকনো অবস্থায় শরীরের অন্য অংশে বা কাপড়ে লাগে, তাহলে কি শরীর বা কাপড় নাপাক হবে?
২. সেই নাপাক হাত যদি শুকনো না হয়ে স্যাঁতসেঁতে হয়, মানে টপ টপ করে পানি না পড়ে, সেই হাত অন্যান্য কাপড় বা শরীরে লাগলে কি নাপাক হবে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই এর সম্মুখীন হতে হয়। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য হানাফি কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. শুকনো অবস্থায় নাপাক হাত শরীর বা কাপড়ে লাগলে কী হবে?
উত্তর: যদি হাতে নাপাকির কোনো চিহ্ন (রং) বা গন্ধ না থাকে, বরং শুধু গন্ধ ছিল এবং সেই হাত সম্পূর্ণ শুকনো অবস্থায় শরীরের অন্য অংশে বা কাপড়ে লাগে, তবে সেই শরীর বা কাপড় নাপাক হবে না। কারণ, নাপাকি স্থানান্তরিত হওয়ার শর্ত হলো নাপাকির অণু-কণা (আইন) স্থানান্তরিত হওয়া। শুকনো অবস্থায় নাপাকির অণু-কণা অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয় না, শুধু গন্ধ থাকলেই তা নাপাক করে না।
তবে যদি হাতে নাপাকির রং বা গন্ধ উভয়ই থাকে এবং তা শুকনো অবস্থায় লাগে, তাহলেও যদি নাপাকির কোনো কণা (যেমন: রক্তের টুকরো, পেশাবের দানা) অন্য জায়গায় লেগে যায়, তবে তা নাপাক হবে। কিন্তু শুধু গন্ধ থাকলে এবং শুকনো অবস্থায় লাগলে তা পবিত্রই থাকবে।
দলিল ও হানাফি ফিকহের নীতি: হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো, নাপাকি (যেমন: পেশাব, রক্ত) দ্বারা কোনো বস্তু নাপাক হওয়ার জন্য নাপাকির আইন (অর্থাৎ রং, গন্ধ বা স্বাদ) স্থানান্তরিত হওয়া জরুরি। শুধু অনুমান বা ধারণার ভিত্তিতে নাপাকি সাব্যস্ত হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, যদি নাপাক বস্তুটি শুকনো হয় এবং অন্য কোনো শুকনো বস্তুতে লাগে, তবে সেই বস্তুটি নাপাক হবে না, যতক্ষণ না নাপাকির কোনো অংশ (কণা) দৃশ্যমানভাবে স্থানান্তরিত হয়। (বাদায়েউস সানায়ি, ১/৮৫; ফাতাওয়া আলমগীরি, ১/৪৬)
তবে একটি সতর্কতা: প্রশ্নে বলা হয়েছে "গন্ধ ছিল"। গন্ধ যদি খুবই প্রবল হয় এবং নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় যে নাপাকির কণা স্থানান্তরিত হয়েছে, তাহলে সতর্কতা হিসেবে ধুয়ে নেওয়া উত্তম। কিন্তু বিধানগতভাবে তা নাপাক নয়।
২. স্যাঁতসেঁতে (ভেজা) অবস্থায় নাপাক হাত শরীর বা কাপড়ে লাগলে কী হবে?
উত্তর: যদি হাতটি স্যাঁতসেঁতে থাকে, অর্থাৎ এমন ভেজা অবস্থায় থাকে যে হাতটি অন্য কোনো শুকনো বস্তুতে লাগালে সেখানে আর্দ্রতা স্থানান্তরিত হয় (যদিও পানি টপ টপ করে না পড়ে), এবং সেই অবস্থায় হাতটি অন্য কাপড় বা শরীরে লাগে, তাহলে সেই কাপড় বা শরীর নাপাক হয়ে যাবে।
কারণ: স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় নাপাকির অণু-কণা (আইন) আর্দ্রতার সাথে সাথে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হয়। তাই যে স্থানে লাগবে, সেটি নাপাক হয়ে যাবে। তবে যে স্থানটি লাগবে, শুধু সেই স্থানটুকুই নাপাক হবে, পুরো কাপড় বা শরীর নাপাক হবে না। যদি কাপড়ের ভাঁজে বা শরীরের এমন জায়গায় লাগে যেখানে আর্দ্রতা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে যতটুকু জায়গায় আর্দ্রতা পৌঁছেছে, ততটুকুই নাপাক গণ্য হবে।
দলিল ও হানাফি ফিকহের নীতি: হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নাপাক বস্তু যদি ভেজা থাকে এবং অন্য কোনো পবিত্র বস্তুতে লাগে, তবে সেই পবিত্র বস্তুটি নাপাক হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩১৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৬)
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন, "টপ টপ করে পানি না পড়ে"। এটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, হাতটি এতটুকু ভেজা আছে কি না যে, অন্য বস্তুতে লাগালে সেখানে আর্দ্রতার প্রভাব পড়ে। যদি লাগানোর পর অন্য বস্তুটি ভিজে যায় বা স্যাঁতসেঁতে অনুভূত হয়, তাহলে তা নাপাক হবে। আর যদি হাতটি এতটুকু শুকনো থাকে যে লাগালে অন্য বস্তুতে কোনো আর্দ্রতাই স্থানান্তরিত হয় না, তাহলে তা নাপাক হবে না (উপরের ১ নং নিয়ম প্রযোজ্য)।
সংক্ষিপ্ত ফয়সালা (মাসয়ালা):
১. শুকনো হাত: নাপাক হাত শুকনো হলে এবং তাতে নাপাকির রং বা কণা না থাকলে, শুধু গন্ধ থাকা অবস্থায় অন্য কিছু স্পর্শ করলে তা পবিত্র থাকবে। ২. স্যাঁতসেঁতে হাত: নাপাক হাত স্যাঁতসেঁতে (ভেজা) অবস্থায় অন্য কাপড় বা শরীরে লাগলে, যে স্থানে আর্দ্রতা পৌঁছাবে, সে স্থানটি নাপাক হয়ে যাবে। সেটি ধুয়ে ফেলতে হবে।
উত্তম পন্থা: যেকোনো সন্দেহের ক্ষেত্রে এবং নাপাকির গন্ধ বা আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় অন্য কিছু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা এবং স্পর্শ করলে সংশ্লিষ্ট স্থানটি ধুয়ে ফেলাই হলো তাকওয়া ও সতর্কতার পথ। তবে বিধান জানার পর আমল করা জরুরি।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।