স্বামী নিখোঁজ এখন উক্ত নারীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ের শরীয়তী বিধান কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একজন নারীর তালাকের বিষয় জানতে চাচ্ছিলাম ।
তার বিয়ে হওয়ার ২ বছর পর স্বামি তাকে রেখে গিয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন সেই স্বামী তালাক না দিয়ে সে চলে যায়,কোনোদিন স্ত্রীর খোঁজ নিয়েছি না,সংসার করবে না বিধায় এক প্রকার কিছু না জানিয়েই চলে যায় ,এবং স্ত্রী তার অনেক খোঁজ করেছেন কিন্তু পায়নি এই ভাবেই সেই নারী ১৪ টা বছর পার করে।
পরবর্তীতে সে নিজের ইচ্ছেয় এক জনের সাথে কোড ম্যারেজ করে বিয়ে করে সেখানে সংসার হয় মাত্র ২ বছর পরবর্তীতে এই নারী সেই স্বামীকে তালাক দিয়ে দেয় কাজী অফিসে গিয়ে কারণ স্বামী অনেক চরিত্রহীন ছিল।
আবার সে ঠিক ২ বছর পর আবার একজনের সাথে বিয়ে হয় সেখানে সংসার হয় মাত্র কয়েকদিন , বিয়ের পরে এই নারী বুঝতে পারে যে তাকে ঠকানো হয়েছে এবং মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করেছে।
এটার এখনও তালাক হয়নি কিন্তু কোনো খোঁজ খবর নেয়া বা সংসার করে না প্রায় ২ বছর হয়ে গেছে
মূলকথা হচ্ছে এরা দুনিয়াবি মানুষ এখন শরীয়ত সম্মত তার এসব বিয়ের মাসআলা কি হবে?
আমরা জেনেছি তার যেই দ্বিতীয় বিয়ে এবং তৃতীয় বিয়ে সেটা বিয়েই না এক প্রকার জিনা কারণ প্রথম স্বামীর থেকে তালাক নেয়নি + তালাক সেও দেয় নি
মূল কথা হচ্ছে তারা দুনিয়াবি মানুষ তাদের
Answer
তালাক মাসআলা সম্পর্কে বিস্তারিত উত্তর
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা ঘটনাটি বিশ্লেষণ করছি:
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
- একজন নারীর বিয়ে হয়, ২ বছর পর স্বামী তালাক না দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যায়
- স্ত্রী ১৪ বছর অপেক্ষা করে, স্বামীর খোঁজ পায়নি
- এরপর সে নিজের ইচ্ছায় আরেকজনের সাথে বিয়ে করে (২য় বিয়ে), ২ বছর পর তালাক দেয়
- আবার ২ বছর পর তৃতীয় বিয়ে করে, কিন্তু প্রতারিত হয়, এখন ২ বছর ধরে স্বামী সংসার করে না
শরীয়তের বিধান:
১. প্রথম স্বামীর ব্যাপারে:
যদি প্রথম স্বামী স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে ১৪ বছর ধরে নিখোঁজ থাকে, তাহলে ইসলামী বিধান অনুযায়ী:
-
মাফকুদুল খবর (নিখোঁজ) স্বামীর বিধান: স্বামী দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে তালাক বা ফাসখ (বিচ্ছেদ) করিয়ে নিতে হবে। নিজে নিজে বিয়ে করার অনুমতি নেই।
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে: স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রী ধৈর্য্য করে অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, বিচারক (কাজী) স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন।
২. দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ের বৈধতা:
যেহেতু প্রথম স্বামী তালাক না দিয়ে চলে গিয়েছিল এবং স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাই দ্বিতীয় বিয়েটি শরীয়তসম্মত বৈধ হয়নি। কারণ:
- প্রথম স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধন তখনও বিদ্যমান ছিল
- স্ত্রীকে প্রথমে আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ নিতে হতো
- বিচ্ছেদ না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করা হারাম ও জিনার শামিল
তৃতীয় বিয়েটিও একই কারণে অবৈধ, কারণ দ্বিতীয় বিয়ে যখন বৈধ হয়নি, তখন তার ভিত্তিতে তৃতীয় বিয়েও বৈধ হবে না।
৩. বর্তমান অবস্থায় করণীয়:
এই নারীর জন্য এখন করণীয় হলো:
১. তওবা-ইস্তিগফার করা - অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ২. আলাদা হওয়া - দ্বিতীয় ও তৃতীয় "স্বামী" থেকে অবিলম্বে আলাদা হয়ে যাওয়া, কারণ এগুলো শরীয়তসম্মত বিয়ে ছিল না ৩. ইদ্দত পালন - তৃতীয় সম্পর্ক থেকে আলাদা হলে ইদ্দত পালন করা (যদি প্রাসঙ্গিক হয়) ৪. আইনি ব্যবস্থা - স্থানীয় ইসলামী আদালত বা কাজীর মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করানো
কুরআন ও হাদীসের দলীল:
কুরআনে বলা হয়েছে:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ "যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে, তবে নিজ স্ত্রী বা মালিকানাধীন দাসীদের ব্যাপারে তারা তিরস্কৃত হবে না।" (সূরা আল-মু'মিনুন: ৫-৬)
হাদীসে এসেছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ" "যে নারী অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল।" (সুনানে আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
ফিকহী গ্রন্থসমূহের উদ্ধৃতি:
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
"إذا غاب الزوج غيبة منقطعة لا يوقف على خبره، ولم يترك نفقة، ترفع المرأة أمرها إلى القاضي، فيفرق بينهما بعد مضي المدة التي يراها القاضي" "যখন স্বামী এমনভাবে নিখোঁজ হয় যে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না এবং ভরণপোষণও দেয় না, তখন স্ত্রী বিচারকের নিকট বিষয়টি পেশ করবে, বিচারক নির্ধারিত সময়ের পর তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাবেন।"
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী):
"المغيب إذا غاب ولم يعلم خبره، إن كان له مال ينفق على امرأته لم تطلق امرأته حتى يثبت موته، وإن لم يكن له مال يفرق بينهما" "নিখোঁজ স্বামীর ব্যাপারে—যদি তার সম্পদ থাকে যা থেকে স্ত্রী ভরণপোষণ পায়, তবে তার মৃত্যু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী তালাক পাবে না। আর যদি সম্পদ না থাকে, তবে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো হবে।"
সারসংক্ষেপ:
| বিবাহ | বৈধতা | কারণ | |--------|--------|------| | প্রথম বিয়ে | বৈধ ছিল | সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল | | দ্বিতীয় বিয়ে | অবৈধ | প্রথম স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়নি | | তৃতীয় বিয়ে | অবৈধ | দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ না হওয়ায় |
মূল কথা: এই নারীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিয়ে শরীয়তসম্মত হয়নি। তাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে এবং বর্তমান সম্পর্ক থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো বৈধ বিয়ে করতে চাইলে প্রথমে আদালতের মাধ্যমে পূর্বের সম্পর্কের নিষ্পত্তি করতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।