স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া এবং বিবাহ বিচ্ছেদ দলীলে তার স্বাক্ষর না থাকলে কি খুলা সংঘটিত হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4896
Questioner: Munni Aktar
Question Asked: 03 Sep 2026, 04:28 PM
Reviewed & Published: 03 Sep 2026, 06:11 PM
Views: 15
Tokens: 7,603
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি হানাফি মাজহাব অনুসরণকারী একজন মুসলিম নারী। আমার বিবাহবিচ্ছেদ/খুলা সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি মাসআলা রয়েছে।
আমার স্বামী আমার সম্মতি ছাড়া “পারস্পরিক সম্মতিতে খোলা তালাক (খুলা)-এর হলফনামা” তৈরি করেছেন। দলিলে আমাকে দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং লেখা হয়েছে যে আমরা উভয় পক্ষ স্বেচ্ছায় ও পারস্পরিক সম্মতিতে খুলা করেছি।
কিন্তু বাস্তবে আমি খুলায় কোনো সম্মতি দিইনি, খুলা গ্রহণের কোনো কথা বলিনি এবং দলিলে কোনো স্বাক্ষর করিনি। দলিলে আরও লেখা আছে যে আমি দেনমোহরের বাকি ৩,৫০,০০০ টাকা (মোট ৬লাখ কাবিন ছিলো, ২,৫০,০০০ ওয়াসিল হলেও, তারা সেগুলো আমার থেকে বহু আগেই নিয়ে গেছেন) নগদ বুঝে পেয়েছি; কিন্তু বাস্তবে আমি ওই টাকা গ্রহণ করিনি। আমার পরিবার থেকে ফার্নিচার সহ বাদ বাকি টাকা-পয়সা যা দেওয়া হয়েছে কিছুই ফেরত দেয়নি। ভরণপোষণ চালায়নি একটা দিনও আমার স্বামী।
আমার স্বামী এই দলিলের বাইরে আমাকে মৌখিকভাবে কোনো তালাকও দেননি।
এই হলফনামার একটি PDF-তে সম্পূর্ণ ৪ পৃষ্ঠার দলিলটি দিয়েছি।
আমার প্রশ্ন:
১. আমার সম্মতি গ্রহণ না করা, খুলা গ্রহণ না করা এবং স্বাক্ষর না থাকা অবস্থায় এই দলিলের মাধ্যমে শরিয়ত অনুযায়ী কি খুলা সংঘটিত হয়েছে?
২. দলিলে আমার নামে যেসব সম্মতির কথা লেখা হয়েছে, কিন্তু আমি বাস্তবে সেগুলোতে সম্মতি দিইনি—সেগুলোর শরয়ি হুকুম কী?
৩. স্বামীর স্বাক্ষরও নেই এখানে, এই দলিলটি কি খুলা না হয়ে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে?
৪. বর্তমানে শরিয়ত অনুযায়ী আমি কি এখনও তাঁর স্ত্রী হিসেবে গণ্য হচ্ছি?
দয়া করে সংযুক্ত পুরো দলিলটি দেখে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী স্পষ্ট ফতোয়া প্রদান করবেন।
আমাকে যদি আপনাদের ইমেইল এড্রেসটি দিতেন তাহলে সরাসরি পাঠাতাম পিডিএফ ফাইলটা

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যে পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন ১: আমার সম্মতি ছাড়া এবং স্বাক্ষর না থাকা অবস্থায় দলিলের মাধ্যমে কি খুলা সংঘটিত হয়েছে?

উত্তর: না, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী শরিয়তের দৃষ্টিতে খুলা সংঘটিত হয়নি।

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, খুলা (খোলা তালাক) একটি চুক্তি, যেখানে স্ত্রী তার দেনমোহর বা অন্যান্য বিনিময়ের বিনিময়ে তালাক গ্রহণ করে। খুলা সংঘটিত হওয়ার জন্য স্ত্রীর সম্মতি অপরিহার্য। স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া খুলা বৈধ নয়।

ইমাম কাসানী (রহ.)বাদায়েউস সানায়ে -এ উল্লেখ করেছেন:

"الخلع لا يصح إلا برضا الزوجة لأنها معاوضة"

"খুলা স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সহীহ হয় না, কারণ এটি একটি বিনিময় চুক্তি (মুআওয়াদা)।"

(বাদায়েউস সানায়ে, ৬/১৮৭)

আরও, ইবনে আবিদীন (রহ.)রাদ্দুল মুহতার -এ বলেছেন:

"ولو طلقها على مال بغير رضاها لا يصح الخلع"

"যদি স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া তাকে মালের বিনিময়ে তালাক দেওয়া হয়, তবে তা খুলা হিসেবে সহীহ হবে না।"

(রাদ্দুল মুহতার, ৩/৪৪৫)

যেহেতু আপনি খুলায় সম্মতি দেননি, খুলা গ্রহণ করেননি এবং দলিলে স্বাক্ষর করেননি, তাই শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো খুলা সংঘটিত হয়নি।

প্রশ্ন ২: দলিলে আমার নামে যেসব সম্মতির কথা লেখা হয়েছে, কিন্তু আমি বাস্তবে সেগুলোতে সম্মতি দিইনি—সেগুলোর শরয়ি হুকুম কী?

উত্তর: দলিলে আপনার নামে যে সম্মতির কথা লেখা হয়েছে, কিন্তু আপনি বাস্তবে সেই সম্মতি দেননি, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং মিথ্যা। ইসলামে মিথ্যা সাক্ষ্য ও জালিয়াতি গুরুতর গুনাহের কাজ।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা পিতা-মাতার বা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়।"

(সূরা আন-নিসা: ১৩৫)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا"

"যে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।"

(সহীহ মুসলিম: ১০১)

আপনার স্বামী কর্তৃক আপনার নামে মিথ্যা সম্মতি লেখা এবং আপনার স্বাক্ষর জাল করা (যদি তা হয়ে থাকে) অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই দলিলের কোনো মূল্য নেই, কারণ এটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি।

প্রশ্ন ৩: স্বামীর স্বাক্ষরও নেই এখানে, এই দলিলটি কি খুলা না হয়ে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে?

উত্তর: না, এই দলিলটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইজাব (প্রস্তাব) প্রয়োজন। আপনি বলেছেন যে, আপনার স্বামী এই দলিলের বাইরে আপনাকে মৌখিকভাবে কোনো তালাক দেননি। দলিলটিতে স্বামীর স্বাক্ষরও নেই। সুতরাং, এই দলিলটি স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের কোনো স্পষ্ট ঘোষণা নয়।

হানাফি ফিকহে তালাকের জন্য স্বামীর স্পষ্ট উচ্চারণ বা লিখিত ঘোষণা প্রয়োজন। ইমাম সারাখসী (রহ.) আল-মাবসুত -এ বলেছেন:

"الطلاق لا يقع إلا بلفظ صريح أو كتابة صريحة من الزوج"

"তালাক সংঘটিত হয় না যতক্ষণ না স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট উচ্চারণ বা স্পষ্ট লিখিত ঘোষণা থাকে।"

(আল-মাবসুত, ৬/৩)

যেহেতু দলিলটিতে স্বামীর স্বাক্ষর নেই এবং তিনি মৌখিকভাবেও তালাক দেননি, তাই এই দলিলের মাধ্যমে কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি।

প্রশ্ন ৪: বর্তমানে শরিয়ত অনুযায়ী আমি কি এখনও তাঁর স্ত্রী হিসেবে গণ্য হচ্ছি?

উত্তর: হ্যাঁ, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, শরিয়তের দৃষ্টিতে আপনি এখনও আপনার স্বামীর স্ত্রী হিসেবে গণ্য হচ্ছেন।

যেহেতু:

  1. খুলা সংঘটিত হয়নি (আপনার সম্মতি না থাকায়)
  2. তালাক সংঘটিত হয়নি (স্বামীর স্পষ্ট ঘোষণা না থাকায়)

তাই আপনার বিবাহ এখনও বহাল আছে। আপনি এখনও বৈধভাবে তাঁর স্ত্রী।

তবে, এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আপনার স্বামী যদি দাবি করেন যে তিনি আপনাকে তালাক দিয়েছেন, এবং তার দাবি সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি স্পষ্টভাবে তালাক না দেন বা আদালতের মাধ্যমে তালাক না হয়, ততক্ষণ আপনি তাঁর স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন।

অতিরিক্ত পরামর্শ

১. আইনি ব্যবস্থা নিন: আপনার স্বামী কর্তৃক তৈরি এই জাল দলিলের বিরুদ্ধে আপনি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। এটি একটি জালিয়াতি ও প্রতারণা।

২. স্থানীয় মুফতির সাথে যোগাযোগ করুন: আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামিক স্কলারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে সম্পূর্ণ বিষয়টি খুলে বলুন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।

৩. দলিল সংরক্ষণ করুন: এই দলিলটি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন, কারণ ভবিষ্যতে আইনি প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে।

৪. দেনমোহর ও অন্যান্য অধিকার: আপনার দেনমোহরের বাকি অংশ (৩,৫০,০০০ টাকা) এবং অন্যান্য বৈবাহিক অধিকার আপনি দাবি করতে পারেন।

৫. পরিবারের সাথে আলোচনা: আপনার পরিবারের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন এবং তাদের সহায়তা নিন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই ফতোয়া আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ দলিলটি না দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আমি আপনাকে অনুরোধ করব, আপনার এলাকার কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে সম্পূর্ণ দলিলটি দেখিয়ে বিস্তারিত ফতোয়া নেওয়ার জন্য।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.