হানাফি মাযহাবে পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে বৈধ কি না?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি তালাক এর ফাতওয়া নিয়েছিলাম কয়েকবার।কিন্তু হানাফী মাযহাব অনুযায়ী। আমাদের তালাক হয়নি উওর পেয়েছি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী। কিন্তু অন্য মাযহাব অনুযায়ী তালাক হয়েছে কি না আমি জানি না। যদি অন্য মাযহাব মানতে যাই তাহলে তো বাবার অনুমতি ছাড়া আমার বিয়ে শুদ্ধ হবে না। এখন আমি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তালাক হয়নি ধরে নিয়ে সংসার করলে কি আমার গুনাহ হবে?
আমার বাবা মাও এখন চাচ্ছেন আমি যাকে বিয়ে করেছিলাম উনার সাথে পারিবারিক ভাবে বিয়ে দিতে।উনারা আমাদের গোপন বিয়ের কথা জানেন না। আমরা যদি নিজেরা বিয়ে করার কথা গোপন করে পারিবারিকভাবে আবার বিয়ে করি, তাহলে আামাদের গুনাহ হবে? আগে গোপনে বিয়ে করার কারনে মাফ চাইতে হবে বাবা মার কাছে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য হানাফি কিতাবের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. পিতার অনুমতি ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ কি না?
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারী বা পুরুষের জন্য পিতার (অভিভাবকের) অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা বৈধ, তবে এটি মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) বলে গণ্য হয়।
-
কিতাবের দলিল:
- আল-হিদায়াহ ও ফাতাওয়া আলমগীরি-তে উল্লেখ আছে, "হানাফি মাযহাবে, বালেগা নারী নিজের ইচ্ছায় বিবাহ করলে তা শুদ্ধ হয়, তবে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া তা মাকরুহ।" (ফাতাওয়া আলমগীরি, ১ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ বলা হয়েছে, "হানাফিদের নিকট প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজস্ব বিবাহ বৈধ, কারণ অভিভাবকত্বের অধিকার তার নিজের উপরই ন্যস্ত।" (রদ্দুল মুহতার, ৯ম খণ্ড, ১৭৯ পৃষ্ঠা)
-
আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন এবং আপনার বাবা-মা কোন মাযহাব অনুসরণ করেন তা নিশ্চিত নন, তাই আপনার বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ (বৈধ) হয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, এটি মাকরুহ হওয়ায় আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা এবং পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা জরুরি।
২. তালাকের ফাতওয়া এবং মাযহাব পরিবর্তনের জটিলতা
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তালাক হয়নি, কিন্তু অন্য মাযহাব (যেমন: শাফেয়ি, মালেকি বা হাম্বলি) অনুযায়ী তালাক হয়ে গেছে কি না, তা নিয়ে আপনি শঙ্কিত।
-
মূলনীতি: ইসলামি ফিকহে, একজন সাধারণ মুসলমানের জন্য তাকলিদ (একটি মাযহাব অনুসরণ করা) করা জরুরি। তবে, একই মাসআলায় একাধিক মাযহাবের সহজ (সহজলভ্য) মতামত নেওয়া জায়েয নেই, যাকে বলা হয় "তালফিক" (মিশ্রণ), যদি তা কোনো বৈধ কারণে না হয়।
-
আপনার করণীয়: যেহেতু আপনি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন এবং হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার তালাক সংঘটিত হয়নি বলে ফাতওয়া দেওয়া হয়েছে, তাই আপনার জন্য হানাফি মাযহাবের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। অন্য মাযহাবের দিকে ঝুঁকে নিজের বিবাহকে ভেঙে ফেলা বা সন্দেহ পোষণ করা উচিত নয়।
- দলিল: ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে, "যে ব্যক্তি একটি মাযহাবের উপর আমল করে, তার জন্য অন্য মাযহাবের মতামত গ্রহণ করা জায়েয নয়, যদি না সে স্থায়ীভাবে মাযহাব পরিবর্তন করে।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড, ৪৫ পৃষ্ঠা)
-
গুনাহের প্রশ্ন: আপনি হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তালাক হয়নি ধরে নিয়ে সংসার করলে আপনার কোনো গুনাহ হবে না। বরং, এটি আপনার জন্য বৈধ এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ, আপনি একজন হানাফি এবং আপনার উপর হানাফি ফিকহের বিধানই প্রযোজ্য।
৩. পুনরায় পারিবারিকভাবে বিয়ে করার বিধান
আপনার বাবা-মা এখন আপনাকে সেই ব্যক্তির সাথেই পারিবারিকভাবে বিয়ে দিতে চাচ্ছেন, কিন্তু তারা আপনার গোপন বিয়ের কথা জানেন না। আপনি যদি গোপন রেখে আবার পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন, তাহলে:
-
বৈধতা: যেহেতু আপনার প্রথম বিয়ে হানাফি মাযহাবে বৈধ হয়েছে, তাই দ্বিতীয়বার বিয়ে করা জরুরি নয়। তবে, যদি আপনি সামাজিক ও পারিবারিক শান্তির জন্য পুনরায় বিয়ে করেন, তাহলে সেটি বৈধ হবে, তবে শর্ত হলো, প্রথম বিয়ে যদি এখনো বিদ্যমান থাকে (তালাক না হয়ে থাকে), তাহলে দ্বিতীয়বার বিয়ে করা হারাম (নিষিদ্ধ) হবে, কারণ একই সাথে দুই স্বামী রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- কুরআনের দলিল: "আর তোমরা একাধিক স্বামী গ্রহণ করো না।" (সূরা নিসা: ২৪) - এটি নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে, একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখা হারাম।
-
গুনাহের প্রশ্ন: আপনি যদি প্রথম বিয়ে গোপন করে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন, তাহলে সেটি প্রতারণা ও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত হবে, যা গুনাহের কাজ। কারণ, দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার সময় বর বা কাবিনকারীকে জানানো দরকার যে, আপনি ইতিমধ্যে বিবাহিত। এটি না জানালে বিয়ে শুদ্ধ হলেও, চুক্তিটি প্রতারণাপূর্ণ হবে এবং এতে গুনাহ হবে।
- হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি প্রতারণা করল, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১)
-
সঠিক সমাধান: আপনার উচিত, বাবা-মাকে সত্য জানিয়ে তাদের সম্মান ও ভালোবাসার সাথে বোঝানো যে, আপনি ইতিমধ্যে বিয়ে করেছেন এবং সেই বিয়ে বৈধ। তাদের রাগ বা অসন্তুষ্টির ভয়ে মিথ্যা বলা বা গোপন রাখা উচিত নয়। ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে সত্য গোপন করে হারাম কাজ করা (প্রতারণা) জায়েয নয়।
৪. গোপন বিয়ে করার কারণে মাফ চাওয়া
আপনি বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেছেন, যা হানাফি মাযহাবে বৈধ হলেও মাকরুহ। তাই:
- মাফ চাওয়া: আপনার উচিত, আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করা এবং বাবা-মায়ের কাছে নম্রভাবে ক্ষমা চাওয়া যে, আপনি তাদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেছেন। তবে, মনে রাখবেন, বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনার বিয়ে শুদ্ধ হয়নি; বরং এটি তাদের সম্মান ও ভালোবাসা রক্ষার জন্য এবং সম্পর্ক মধুর করার জন্য।
- হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন সম্মানিত অতিথির সৎকার করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮) - পিতা-মাতা আমাদের নিকটতম মানুষ, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ঈমানের অংশ।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও উপদেশ
- আপনার জন্য হানাফি মাযহাবই চূড়ান্ত। অন্য মাযহাবের দিকে ঝুঁকে নিজের বিবাহ ভেঙে ফেলা বা সন্দেহ পোষণ করা সম্পূর্ণ ভুল ও গুনাহের কাজ হবে।
- সংসার চালিয়ে যান আপনার স্বামীর সাথে, ইনশাআল্লাহ এটি বৈধ ও বরকতময় হবে।
- বাবা-মাকে সত্য জানান এবং তাদের সম্মান রক্ষা করে বিষয়টি মীমাংসা করুন। প্রয়োজনে একজন বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে তাদের বোঝান।
- পুনরায় বিয়ে করার প্রয়োজন নেই, কারণ আপনার প্রথম বিয়ে বৈধ।
আল্লাহ তাআলা আপনার বিষয়টি সহজ করে দিন এবং আপনার সংসারে বরকত দান করুন। (আমিন)